ঢাকা শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় যাবে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী

বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় যাবে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী

দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার কর্মী সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগ দিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মতি দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। নতুন এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় কমানো ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পথ তৈরি হবে বলে আশা করছে সরকার।

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষা, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল), ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি।

এজেন্সিগুলো নিজেদের উদ্যোগে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তা খুঁজে বের করতে পারবে, চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ করতে পারবে এবং বাংলাদেশ থেকে কর্মী নির্বাচন করে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। এর ফলে আরও বেশি যোগ্য প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। তবে কর্মী নিয়োগ ও বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের অনুমোদন এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুসরণ করতে হবে।

১০ হাজার কর্মী যাবেন বিনা খরচে : মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগের একটি হলো অভিবাসন ব্যয়। বিদেশে চাকরি পাওয়ার আশায় অনেক কর্মীকে ঋণ করে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। এ ব্যয়ের কারণে বিদেশে গিয়ে উপার্জন শুরু করার আগেই অনেককে আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয়। এ পরিস্থিতিতে ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়ার নীতিগত সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে সরকার। মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া এ বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। তবে বিনা খরচে নিয়োগের আওতায় কোন কোন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে, কর্মী নির্বাচন কীভাবে হবে এবং নিয়োগ কার্যক্রম কবে শুরু হবে— এসব বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ফলে বাস্তবায়নের পর্যায়ে ব্যয়ের পরিধি, কর্মী নির্বাচনের পদ্ধতি ও অন্যান্য শর্ত স্পষ্ট হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের লক্ষ্য, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি কর্মীদের অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা থেকে সুরক্ষা দেওয়া। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে দেশের আইন মেনে এবং কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা করে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী এজেন্সি নির্বাচন : বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন ও তালিকাভুক্ত করার বিধান রয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এজেন্সিগুলোর যোগ্যতা যাচাই শুরু হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মালয়েশিয়ার সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চালানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম সরকারি বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নেন। ওই সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয় বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

নিয়োগপ্রক্রিয়া যেভাবে চলবে : মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ করবে এবং কর্মী নির্বাচন করবে। এরপর কলিং ভিসা, ই-ভিসাসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বোয়েসেল ও তালিকাভুক্ত ২৫টি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি সহায়তা করবে। মালয়েশিয়ায় নিয়োগের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হলে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করবে। প্রতিটি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি নিজস্ব লাইসেন্সের অধীনে কর্মীদের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে বোয়েসেল ও ২৫টি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দিতে পারবে। নতুন ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তার চাহিদাপত্র সংগ্রহ থেকে শুরু করে কর্মী নির্বাচন, ভিসা ও বিএমইটির ছাড়পত্র নেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিয়ম মেনে চলা জরুরি। বিশেষ করে চাকরির শর্ত, বেতন, কর্মঘণ্টা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে কর্মীদের আগেই স্পষ্ট ধারণা দেওয়া এবং নির্ধারিত ব্যয়ের বাইরে অর্থ আদায় বন্ধ করা গেলে কর্মীদের হয়রানি কমানো সম্ভব হবে।

মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা চূড়ান্ত করবে দুই দেশ : মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা চূড়ান্ত করার কাজও চলছে। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, এ তালিকা চূড়ান্ত করার দায়িত্ব বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া উভয় দেশের। শ্রমবাজার দ্রুত চালুর স্বার্থে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে সরেজমিনে পরিদর্শনের পর নতুন তালিকার চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগায় আপাতত মালয়েশিয়া সরকারের অনুমোদিত বিদ্যমান তালিকা থেকে বিতর্কিত ও অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল সেন্টারগুলো বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সেন্টারগুলোর মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে নতুন নীতিমালার আলোকে মেডিক্যাল সেন্টারগুলো যাচাই-বাছাই করবে। পর্যায়ক্রমে নতুন সেন্টার তালিকাভুক্ত করা হবে এবং সংশোধিত তালিকা সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত মেডিক্যাল সেন্টারগুলো বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত যাচাই করবে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো একটি নির্দিষ্ট মেডিক্যাল সেন্টারকে এককভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না।

স্বচ্ছ নিয়োগই বড় চ্যালেঞ্জ : মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন। তবে কর্মী নিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়া, নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং অভিবাসন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের কারণে দেশটিতে যেতে আগ্রহীদের মধ্যে অপেক্ষা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় ৩৩৮টি এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু এজেন্সির সংখ্যা বাড়ালেই কর্মীদের হয়রানি ও অতিরিক্ত ব্যয় বন্ধ হবে না। নিয়োগকর্তার চাহিদাপত্র যাচাই, চাকরির শর্তের স্বচ্ছতা, নির্ধারিত ব্যয়ের বাইরে অর্থ আদায় প্রতিরোধ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিশেষ করে ১০ হাজার কর্মীকে বিনা খরচে নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কারা সুযোগ পাবেন, কীভাবে তাঁদের নির্বাচন করা হবে এবং কোন কোন খরচ নিয়োগকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বহন করবে— এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। পাশাপাশি কর্মীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে প্রতারণার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারের লক্ষ্য শুধু মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নয়; বরং কর্মসংস্থান বাড়ানো, বৈধ ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নিয়োগপ্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করা এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা। এ উদ্যোগ সফল করতে সরকার, রিক্রুটিং এজেন্সি ও কর্মীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সরকারের আশা, নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের শ্রম সহযোগিতা আরও জোরদার হবে এবং বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, সুশৃঙ্খল ও টেকসই শ্রমবাজার গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তবে এ উদ্যোগের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে বিনা খরচে কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত