ঢাকা রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সিলেট টেস্ট

তাওহীদের হৃদয়জুড়ানো ডাবল সেঞ্চুরি

তাওহীদের হৃদয়জুড়ানো ডাবল সেঞ্চুরি

মিরপুর টেস্টে বাজে শটে আউট হয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তাওহীদ হৃদয়। এমনকি টেস্টে তার জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সিলেট টেস্টে সে সমালোচনার জবাব দিয়েছেন তিনি নিজের ব্যাটে। দলের কঠিন সময়ে একাই দাঁড়িয়ে খেলেছেন এক মহাকাব্যিক ইনিংস। সতীর্থরা যখন আসা-যাওয়ার মিছিলে ব্যস্ত, তখন ব্যাট হাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের সমস্ত পরিকল্পনা একের পর এক ভেস্তে দিচ্ছিলেন তাওহীদ হৃদয়। তার ব্যাটে রচিত হলো এমন এক ইনিংস, যা বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে শুধু নতুন অধ্যায়ই যোগ করেনি, পাল্টে দিয়েছে রেকর্ড বইয়ের অনেক হিসাবও। প্রথম টেস্টের হতাশা ও সমালোচনার জবাব দিলেন ২৪২ রানের অপরাজিত মহাকাব্যে! গতকাল শনিবার সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে হৃদয়ের ব্যাট থেকে এসেছে ২৪২ রান। ৩৫৯ বলের ইনিংসটি সাজিয়েছেন ২২টি চার ও ১১টি ছক্কায়। তার এই অতিমানবীয় ব্যাটিংয়ে ৩৫৬ রানে থেমে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩৮৬ রান সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ। পেয়েছে ৩০ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের মালিক এখন হৃদয়। এত দিন এই রেকর্ডটি ছিল মুশফিকুর রহিমের দখলে। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মিরপুরে অপরাজিত ২১৯ রানের ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। আট বছর ধরে অক্ষত থাকা সেই রেকর্ড এবার নিজের করে নিলেন হৃদয়। ২৪২ রানের ইনিংসে ছাড়িয়ে গেলেন দেশের অভিজ্ঞতম ব্যাটারকেও।

তবে হৃদয়ের কীর্তি শুধু সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড ভাঙার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে ডাবল সেঞ্চুরি করা চতুর্থ ব্যাটার তিনি। এর আগে এই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। মুশফিকের রয়েছে তিনটি ডাবল সেঞ্চুরি, বাকি দুজনের একটি করে। এবার সেই অভিজাত তালিকায় জায়গা করে নিলেন হৃদয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে পরিণত করেছেন তিনি। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এর আগে কোনো ব্যাটার এমন কীর্তি গড়তে পারেননি। প্রথম সেঞ্চুরিতে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটি ছিল মুমিনুল হকের। ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৮১ রান করেছিলেন তিনি। হৃদয় সেই সীমাও ছাড়িয়ে গেলেন বহুদূর।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের এটিই প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি। একই সঙ্গে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ ইনিংসও এখন হৃদয়ের। এর আগে এই মাঠে সর্বোচ্চ ১৭১ রান করেছিলেন মাহমুদুল হাসান জয়। হৃদয়ের ২৪২ রানে সেই রেকর্ডও নতুন করে লিখতে হয়েছে।

ব্যাট হাতে দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি আগ্রাসনের যে অসাধারণ সমন্বয় দেখিয়েছেন হৃদয়, তার প্রমাণ তার ছক্কার সংখ্যা। এক ইনিংসে ১১টি ছক্কা মেরে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছেন তিনি। এর আগে সর্বোচ্চ সাতটি ছক্কা ছিল তামিম ইকবালের। আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এক ইনিংসে ১১ ছক্কার কীর্তি গড়া ব্যাটারদের বিরল তালিকাতেও এখন জায়গা করে নিয়েছেন হৃদয়। এই তালিকায় সর্বোচ্চ ১২টি ছক্কার রেকর্ড ওয়াসিম আকরাম ও যশস্বী জয়সওয়ালের! শুধু ছক্কা নয়, বাউন্ডারির হিসাবেও অনন্য হৃদয়। ২২ চার ও ১১ ছক্কায় বাউন্ডারি থেকে এসেছে তার ১৫৪ রান। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টের এক ইনিংসে বাউন্ডারি থেকে সর্বোচ্চ রানের নতুন রেকর্ড এটি। তার ইনিংসে যেমন ছিল ধৈর্য, তেমনি ছিল সুযোগ বুঝে প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হওয়ার মানসিকতা।

এক দিনের ব্যাটিংয়ের হিসাবেও হৃদয় ছাপিয়ে গেছেন দেশের সব ব্যাটারকে। ২৯ রান নিয়ে দিনের খেলা শুরু করে এক দিনেই যোগ করেছেন ২১৩ রান। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এক দিনে কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ রান এটি। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাকিব আল হাসানের করা ২১২ রানের রেকর্ডও পেছনে পড়ে গেছে। হৃদয়ের এই অসাধারণ ইনিংসের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয় বাংলাদেশের মোট রানের হিসাব দেখলে। ৩৮৬ রানের মধ্যে একাই করেছেন ২৪২। দলের মোট সংগ্রহের ৬২.৬৯ শতাংশ এসেছে তার ব্যাট থেকে। একটি পূর্ণাঙ্গ টেস্ট ইনিংসে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ অবদান এটি। সতীর্থদের ব্যর্থতার দিনে কার্যত একাই দলকে টেনে তুলেছেন তিনি। তবে একার লড়াই বললেও সতীর্থদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জুটির অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে শেষ দিকে তাইজুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদের সঙ্গে হৃদয়ের জুটিগুলোই বাংলাদেশের ইনিংসকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। ১৮৪ রানে সপ্তম উইকেট হারানোর পর তাইজুলকে নিয়ে অষ্টম উইকেটে ১১৭ রান যোগ করেন তিনি। সিলেটের মাঠে অষ্টম উইকেটে এটিই বাংলাদেশের প্রথম শতরানের জুটি।

তাইজুল ৫৬ বলে ২২ রান করে ফিরলেও হৃদয়ের সঙ্গে তার লড়াই বাংলাদেশের ইনিংসে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। এরপর তাসকিন আহমেদকে নিয়ে নবম উইকেটে যোগ করেন আরও ৮৫ রান। এই মাঠে নবম উইকেটে এটিই সর্বোচ্চ জুটি। শেষ তিন উইকেটে বাংলাদেশের ২০২ রান সংগ্রহও নতুন রেকর্ড। এর আগে এই জায়গায় সর্বোচ্চ ১৯৮ রান ছিল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০২১ সালের ম্যাচে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ইনিংসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান এসেছে মুশফিকের ব্যাট থেকে, ৩৪। তাইজুল করেছেন ২২, নাজমুল হোসেন শান্ত ১৮ এবং মিরাজ ও তানজিদ হাসান ১৬ রান করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে জোমেল ওয়ারিকান ১০৪ রান দিয়ে চার উইকেট নিয়েছেন। কিন্তু হৃদয়ের ব্যাটিংয়ের সামনে ক্যারিবীয় বোলারদের সব প্রচেষ্টাই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। হৃদয়ের ব্যাটে বাংলাদেশ ৩০ রানের লিড পেলেও ম্যাচের লড়াই এখনও বাকি। দ্বিতীয় ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ তৃতীয় দিনের শেষ চার ওভারে কোনো উইকেট না হারিয়ে তুলেছে সাত রান। ব্র্যান্ডন কিং পাঁচ ও জশুয়া দ্য সিলভা দুই রানে অপরাজিত আছেন। এখনও ২৩ রানে পিছিয়ে সফরকারীরা। সিলেট টেস্টের তৃতীয় দিনটি তাই বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, অন্যদিকে হৃদয়ের জন্য নিজের সামর্থ্য প্রমাণের মঞ্চ। প্রথম টেস্টের হতাশা পেছনে ফেলে তিনি এখন রেকর্ড বইয়ের নতুন নাম। ২৪২ রানের ইনিংসে মুশফিককে ছাড়িয়ে দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহের মালিক হয়েছেন, প্রথম সেঞ্চুরিতেই ডাবল সেঞ্চুরির ইতিহাস গড়েছেন, আবার দলকেও এনে দিয়েছেন লিড।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত