
চলছে সরকার ঘোষিত নজরুল বর্ষ। নিঃসন্দেহে নজরুল প্রেমীদের জন্যে এ এক পরম পাওয়া। নজরুলকে পূর্ণভাবে জানার সুবর্ণ সুযোগ এর চেয়ে আর হয় না। রহস্যে ভরা নজরুলের (২৪ মে ১৮৯৯-২৯ আগস্ট ১৯৭৬) জীবনে তিনটি রহস্যের সুরাহা পরিষ্কারভাবে কেউ এখনও করতে পারেনি। করা যাবে বলেও মনে হয় না আর। প্রথমত মায়ের সঙ্গে তার এমন কী হয়েছিল যে, মাকে ছেড়ে পথে পথে ঘুরে অন্যের মাকে মা ডেকে তাদের মন ভরাতে হবে। অথচ নিজের মা-ই বিরাট কষ্ট নিয়ে হুগলীর জেলে এসে পুত্রের দেখা না পেয়ে ফিরে যান এবং বিপুল অতৃপ্তিতে পৃথিবী ত্যাগ করেন।
দ্বিতীয়ত এমন কী ঘটেছিল যা কবিকে বাধ্য করেছিল সৈয়দা খাতুনকে নার্গিস আসার খানম নাম দিয়ে বিয়ে করেও বিয়ের রাতেই বাসর ছেড়ে কুমিল্লায় ফিরে আসতে। তৃতীয়ত কবি কী এমন রোগে ভুগেছিলেন যা তাকে পঁয়ত্রিশ বছর নির্বাক করে রেখে দিল। তিনটি কারণ বিভিন্ন মানুষ বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করলেও কবি ও তার মা, পত্নী এবং চিকিৎসকের ভাষ্য না মেলাতে পারলে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের প্রয়াস অন্ধের হাতি স্পর্শ করার মতোই বাগধারায় পরিণত হয়ে থাকবে।
‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি’- এ জিজ্ঞাসাকে অমরত্ব দিয়ে নজরুল কেনো নির্বাক তা আজও এক দুর্জ্ঞেয় রহস্য। এ রহস্যের ভেদ করতে গিয়ে ব্যর্থ মানুষ অধিক কৌতূহলে খোঁজে বিবিধ কারণ। হেতু খুঁজতে গিয়ে কেউ কেউ অহেতুক নজরুলের চরিত্রে লেপন করে কালিমা এবং নজরুলের উচ্ছ্বাসধর্মী জীবন সেই ধারণাকে উস্কেও দেয়। কোনো কোনো আকাট মুর্খের দল আবার আঙুল তোলে রবীন্দ্রনাথের দিকেও। নির্বাক নজরুলের মৌন চাহনিকে স্মরণ করে আজ তাই নজরুলের অসুখের সুলুক সন্ধানে আমাদের যাত্রা।
কী রোগে আক্রান্ত নজরুল : যৌবনের কবি, বিদ্রোহের কবি নজরুল তার বাঁধভাঙ্গা উদ্দাম গতির জীবনে ১৯৪১ সালের দিকে হঠাৎ করে এক বেতার অনুষ্ঠানে গাইতে গিয়ে মাঝপথে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই অসুস্থতার পর হতেই নজরুল বাকহারা। ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই থেকে তিনি সম্পূর্ণ বাকশক্তিরহিত হয়ে পড়েন। ফ্যাল্ ফ্যাল্ উদাস শূন্য দৃষ্টি মেলে নজরুল চেয়ে থাকেন শুধু। মুখে বাণী নেই, কণ্ঠে সুর নেই। এমনকি ইশারা ইঙ্গিতের অভিব্যক্তিও নেই। নজরুলের হঠাৎ এ অসুখ কোনো চিকিৎসাতেই যেনো সারে না। কেউ জানতে পারেনি এতোদিন নজরুলের অসুখখানা কী? অবশেষে শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বদৌলতে নজরুল ১৯৬০ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় যান ডা. হ্যানসের নিকট। এখানে এসে ধরা পড়ে তার রোগ। জানা যায়, নজরুল অতি বিরল পিক’স ডিজিজে ভুগছেন।
পিক’স ডিজিজ কী : পিক’স ডিজিজ একটি বিরল স্নায়ু বিধ্বংসী রোগ যা মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে ধ্বংস করে ফেলে। এ রোগে স্মৃতিশক্তির বিলোপন হয়। ১৮৯২ সালে চেক প্রজাতন্ত্রের নিউরোলজিস্ট ডা. আর্নল্ড পিক এ বিরল রোগটি সনাক্ত করেন।
এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির স্নায়ুকোষে ট্যউপ্রোটিন নামের পদার্থ তৈরি হয় যা ‘পিক-বডি’ নামক রূপোলি গোলাকার কণিকাণ্ডদলার মধ্যে বিস্তৃত থাকে। পিক’স ডিজিজ মূলত কতিপয় উপসর্গ গোষ্ঠীর সমন্বিত রূপ, যাকে সিনড্রোম বলা যায়। এতে মানব-মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল ও টেমপোরাল লোব কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফলে।
রোগের উপসর্গস : কথা বলতে অসুবিধা বা বাকহীনতা, চিন্তা করবার শক্তি বিলোপ, আচরণগত পরিবর্তন, সামাজিক আচরণের নিয়ন্ত্রণে বিঘ্ন ঘটা, জড়বিবশতা তৈরি, অতিরিক্ত ক্রিয়াশীলতা, শ্রবণশক্তি বিলোপ ইত্যাদি।
পিক’স ডিজিজের কারণ : মূলত মস্তিষ্কের সামনের ও কানের দিককার অংশের অসাড়তার কারণে পিক’স ডিজিজ দেখা দেয়। তবে এ রোগের সঙ্গে বংশগতি বা পারিবারিক ইতিহাস সংশ্লিষ্ট নয়।
রোগের ইতিহাস : প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮৯২ সালে আর্নল্ড পিক নামে একজন মনোরোগের অধ্যাপনা করতেন। তিনিই প্রথম এ রোগটি আবিষ্কার। ১৯১১ সালে তার নামানুসারে এর নামকরণ হয়।
পিক’স ডিজিজের চিকিৎসা : এ রোগের কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।
নজরুলের রোগ নিরূপণ : নজরুলের এ রোগ যে স্নায়বিক বিভ্রাট তা প্রথম মন্তব্য করেন কিংবদন্তি চিকিৎসক ডা. বিধান রায়। এরপর নিউরোলজিস্ট ডা. অশোক বাগচী নজরুলের এ রোগের বিষয়ে ডা. বিধান চন্দ্র রায়ের মতামতকে সমর্থন করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, কোনো চশমাধারী ব্যক্তি নজরুলের সামনে এলেই তিনি অসহিষ্ণু হয়ে উঠতেন। কিন্তু নজরুলের চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড এ মতামতকে গুরুত্ব দেয়নি।