প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬
ভুলে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, চিন্তা করতে সময় লাগা বা কথা বলতে গিয়ে সঠিক শব্দ মনে না পড়াকে অনেক সময় 'ব্রেইন ফগ' বা মস্তিষ্কের ধোঁয়াশা বলা হয়। বিশেষ করে মধ্যবয়সী নারীদের মধ্যে এ ধরনের সমস্যা বেশ পরিচিত। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মেনোপজের পরিবর্তনের সময় প্রায় ৬০ শতাংশ নারী কোনো না কোনো ধরনের জ্ঞানীয় সমস্যার কথা জানান।
তবে ব্রেইন ফগ সবসময় বয়স বাড়ার স্বাভাবিক অংশ নয়। এর পেছনে ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, হরমোনের পরিবর্তন, থাইরয়েডের সমস্যা, পুষ্টির ঘাটতি বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত কারণ থাকতে পারে।
পেরিমেনোপজ ও হরমোনের পরিবর্তন : মেনোপজের আগের সময়কে পেরিমেনোপজ বলা হয়। এ সময় ইস্ট্রোজেনসহ বিভিন্ন হরমোনের মাত্রায় ওঠানামা হতে পারে। এর প্রভাবে কিছু নারীর মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাভাবনায় সাময়িক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ : দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের সঙ্গে ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ ও মানসিক ক্লান্তিও যুক্ত হতে পারে, যা ব্রেইন ফগের অনুভূতি বাড়িয়ে দিতে পারে।
থাইরয়েডের সমস্যা : থাইরয়েড হরমোন মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হাইপোথাইরয়েডিজমে ক্লান্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং স্মৃতিশক্তির সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে এসব উপসর্গ থাকলে থাইরয়েডের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন হতে পারে।
খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির ঘাটতি : অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার পরিবর্তে শাকসবজি, ফল, গোটা শস্য, ডাল, মাছ, ডিম, বাদাম ও বীজের মতো পুষ্টিকর খাবার খাওয়া ভালো।
ভিটামিন বি১২, আয়রন, ফোলেট ও ভিটামিন ডির ঘাটতিও ক্লান্তি ও মনোযোগের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে বি১২-এর ঘাটতি হলে স্নায়ু ও মস্তিষ্কের কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ঘুমের অভাব : পর্যাপ্ত ঘুম না হলে পরের দিন মনোযোগ, স্মৃতি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের ঘাটতি মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ব্যাহত করতে পারে। তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্ত্রের সমস্যা : অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ রয়েছে, যাকে 'গাট-ব্রেইন অ্যাক্সিস' বলা হয়। অন্ত্রের স্বাস্থ্য, প্রদাহ ও জীবাণুর ভারসাম্যের পরিবর্তন মস্তিষ্কের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে 'লিকি গাট' বা নির্দিষ্ট অন্ত্রের সমস্যাকে ব্রেইন ফগের নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেখানোর মতো শক্ত প্রমাণ সব ক্ষেত্রে নেই।
খাদ্য সংবেদনশীলতা : সিলিয়াক রোগে গ্লুটেন গ্রহণের পর বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে এবং কিছু রোগীর ক্ষেত্রে মনোযোগ বা চিন্তাভাবনার সমস্যাও হতে পারে। তবে নিজে থেকে দীর্ঘদিন কোনো খাবার বাদ দেওয়ার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লং কোভিড : কোভিড-১৯-এর পর কিছু মানুষের দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, মনোযোগের সমস্যা ও স্মৃতির দুর্বলতার মতো উপসর্গ থাকতে পারে। গবেষণায় লং কোভিডে 'ব্রেইন ফগ' বা জ্ঞানীয় সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কিছু ওষুধের প্রভাব : কিছু ওষুধ ঘুমঘুম ভাব, মনোযোগ কমে যাওয়া বা বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে। তাই নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার পর এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসককে জানানো উচিত। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো প্রয়োজনীয় ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।
চিকিৎসকের পরামর্শ : সাময়িকভাবে মনোযোগ কমে যাওয়া বা কিছু ভুলে যাওয়া মানেই আলঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়া নয়। কিন্তু সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে, ক্রমে বাড়তে থাকলে বা দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে তিনি থাইরয়েড, ভিটামিন বি১২, আয়রনসহ অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
লেখক : পুষ্টিবিদ