
বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরির একমাত্র চাবিকাঠি হলো ডাচ কোম্পানি এএসএমএলের (অঝগখ) তৈরি ইইউভি লিথোগ্রাফি মেশিন। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীনের দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বর্তমানে ওয়াশিংটনের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র আশঙ্কা, বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য বদলে দিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই ডাচ প্রযুক্তি এরই মধ্যে গোপনে চীনের হাতে পৌঁছে গেছে।
এআই চিপ তৈরির ক্ষেত্রে চীনের এই সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত উত্থান নিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। লুটনিকের দাবি, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে কোনো একটি উপায়ে এই অত্যাধুনিক চিপ তৈরির মেশিন বা এর অতি সংবেদনশীল যন্ত্রাংশ চীনের ল্যাবে স্থানান্তরিত হয়েছে। এই মার্কিন অভিযোগ ডাচ চিপ নির্মাতা জায়ান্ট এএসএমএল-কে বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব ও তীব্র সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তবে এএসএমএল মার্কিন প্রশাসনের এই দাবিকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপের সবচেয়ে মূল্যবান এই প্রযুক্তি কোম্পানিটি মার্কিন কর্মকর্তাদের স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তাদের তৈরি করা মোট ৩৪০টি ইইউভি মেশিনের প্রতিটির নিখুঁত অবস্থান অনলাইনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয় ও এর একটিও চীনে নেই।
কোম্পানিটি এক বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলেছে, তারা কখনোই চীনে কোনো ইইউভি মেশিন বা এর জন্য বিশেষভাবে তৈরি কোনো উপাদান সরবরাহ করেনি।
অন্যদিকে, ডাচ বাণিজ্যমন্ত্রী সজোয়ার্ড সজোয়ার্ডসমা ওয়াশিংটন সফরকালে ডাচ সরকারের কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেছেন ও স্পষ্ট করেছেন যে, পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে তারা এই মার্কিন অভিযোগের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত চালাচ্ছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আস্ত একটি ইইউভি মেশিন গোপনে চীনে পাচার করা প্রায় অসম্ভব হলেও, এএসএমএল-এর নিজস্ব সরবরাহকারী বা কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এর জটিল যন্ত্রাংশ চীনে পৌঁছানোর সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাছাড়া, চীনের কাছে এএসএমএলের পুরোনো ডিপ-আাল্ট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি মেশিন ও যন্ত্রাংশ বিক্রির বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে এএসএমএলের মোট রাজস্বের এক-তৃতীয়াংশই এসেছে চীনের বাজারে এই ডিইউভি প্রযুক্তি ও সেবা বিক্রির মাধ্যমে। তিনদিক থেকে পরমাণু হামলার প্রস্তুতি চীনের, ঘনিয়ে আসছে নতুন যুদ্ধ? এই বিতর্কের গভীরে রয়েছে চীনের নিজস্ব প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জন ঠেকানোর জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর মরিয়া চেষ্টা।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এএসএমএলের কয়েকজন সাবেক প্রকৌশলীর একটি দল ২০২৫ সালেই চীনে একটি প্রোটোটাইপ ইইউভি মেশিন তৈরি সম্পন্ন করেছে ও শেনজেনের একটি উচ্চণ্ডনিরাপত্তা ল্যাবে এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। যদিও ২০২৮ সালের মধ্যে এর মাধ্যমে সচল চিপ তৈরির লক্ষ্যমাত্রাকে পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা কিছুটা অবাস্তব মনে করছেন, তবুও চীনের এই অপ্রত্যাশিত ও দ্রুত অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রকে আমেরিকাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। একই সঙ্গে, চীনা চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসএমআইসি ও হুয়াওয়ে মাল্টি-প্যাটার্নিং প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরোনো ডিইউভি মেশিন ব্যবহার করেই ৭ ন্যানোমিটারের চেয়েও ছোট লজিক চিপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা আগে শুধু ইইউভি মেশিন দিয়েই সম্ভব হতো।
যুক্তরাষ্ট্র চীনের এই প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে ‘প্যাক্স সিলিকা’ (চধী ঝরষরপধ) নামক ২৪টি দেশের একটি নতুন জোট গঠন করেছে, যেখানে নেদারল্যান্ডসও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘ম্যাচ অ্যাক্ট’ (গঅঞঈঐ অপঃ) নিয়ে ডাচদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
এই আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র শুধু নতুন ডিইউভি মেশিন বিক্রি বন্ধ করতে চায় না, বরং চীনে এরই মধ্যে থাকা শত শত মেশিনের খুচরা যন্ত্রাংশ ও সফটওয়্যার সাপোর্ট বন্ধ করারও দাবি জানাচ্ছে। যদি ডাচরা ১৫০ দিনের মধ্যে এই আইনের সঙ্গে একাত্ম না হয়, তবে ‘ফরেন ডাইরেক্ট প্রোডাক্ট রুল’ প্রয়োগ করে ডাচ কোম্পানির ওপর বিশাল জরিমানা আরোপের হুমকি দেওয়া হয়েছে। ডাচ বাণিজ্যমন্ত্রী সজোয়ার্ডসমা যুক্তরাজ্যের এই একতরফা আইন বহির্ভূত প্রভাব খাটানোর চেষ্টার তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব প্রযুক্তির ভাগ্য নির্ধারণের স্বাধীনতা থাকা উচিত। তাছাড়া, মার্কিন প্রশাসন যেখানে এনভিডিয়ার এইচ২০০ এআই চিপ চীনে রপ্তানির অনুমতি দিচ্ছে, সেখানে ডাচদের পুরোনো প্রযুক্তি বিক্রিতে বাধা দেওয়াকে ডাচ সরকার একটি দ্বিচারিতা হিসেবে দেখছে।
বেইজিং সফরকালেও সজোয়ার্ডসমাকে চীনা চাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে, কারণ চীন এরই মধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মান্যকারী বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার আইন পাস করেছে। ফলে, বিশ্বব্যাপী এআই প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে ডাচ প্রযুক্তি ও এএসএমএল যে দীর্ঘ মেয়াদে ভূ-রাজনৈতিক ক্রসফায়ারে আটকা পড়েছে, তা বলাই বাহুল্য।