
তীব্র জ্বালানি সংকট ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে ইরান সরকার। এ লক্ষ্যে সরকারি কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সীমিত সময় অফিসে উপস্থিতি, দূরবর্তীভাবে কাজ (রিমোট ওয়ার্ক) এবং গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া। খবর আল জাজিরার।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি ইরানি বছরের শেষ পর্যন্ত (মার্চ ২০২৭-এর শেষ ভাগ) সরকারি অফিসে উপস্থিতির সময় সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বাকি কর্মঘণ্টা দূরবর্তীভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সপ্তাহে অন্তত একদিন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গণপরিবহনে যাতায়াত নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এরইমধ্যে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী মেট্রো ব্যবহার করে কর্মস্থলে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশ করেছেন। মানুষকে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দিতে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত মেট্রো ও বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) সেবা বিনামূল্যে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি পুরনো সরকারি যানবাহনের পরিবর্তে ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক, গ্যাসচালিত বা হাইব্রিড যানবাহন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ধাপে ধাপে খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিছু ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার সিদ্ধান্তও বিবেচনায় রয়েছে।
সরকারি দপ্তরগুলোকে অফিস শেষে হিটার ও বৈদ্যুতিক বাতি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও জরুরি সেবার জন্য পৃথক ব্যবস্থা পরে ঘোষণা করা হবে। গত ১২ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান একটি নির্দেশনায় সরকারি সংস্থাগুলোকে উপযুক্ত কর্মীদের জন্য রিমোট ওয়ার্কের সুযোগ বাড়াতে বলেন। তার ভাষ্য, এতে পেট্রোল, বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের খরচ কমানো সম্ভব হবে।
পেজেশকিয়ান বলেন, 'আমরা সরকারের মধ্য থেকেই জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ শুরু করেছি।' সরকারের মতে, এই পদক্ষেপগুলো দেশের সামগ্রিক জ্বালানি সাশ্রয় কর্মসূচির অংশ। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অব্যবস্থাপনা ও পুরোনো অবকাঠামোর কারণে অতীতেও একাধিকবার জ্বালানি সংকটে পড়েছে ইরান। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান সংঘাত পরিস্থিতি সংকটকে আরও গভীর করেছে। চলতি মাসের শুরুতে সরকার জ্বালানির তৃতীয় স্তরের কোটার দাম এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার বাড়িয়েছে। ফলে মাসে ১১০ লিটারের বেশি পেট্রোল ব্যবহার করলে গ্রাহকদের দ্বিগুণ মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি ইরানি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে প্রতিদিন গড়ে ১২২ মিলিয়ন লিটার পেট্রোল উৎপাদিত হলেও চাহিদা ছিল ১৩২ মিলিয়ন লিটার। অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ১০ মিলিয়ন লিটারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। জুলাই থেকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ জারি থাকায় জ্বালানি আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানিতেও বাধা সৃষ্টি হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে চাপ বেড়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় তেল ও গ্যাস স্থাপনা, পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা এবং জ্বালানি সংরক্ষণাগারের ক্ষতি হয়েছে। যদিও তেলমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ জানিয়েছেন, উৎপাদন সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অংশ এরইমধ্যে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং কাজ চলমান রয়েছে।
ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে জুনের মধ্যে দেশটির প্রকৃত জিডিপি ১০ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে তেল ও গ্যাস উত্তোলন কমেছে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। শিল্প ও খনি খাতের উৎপাদন কমেছে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, নির্মাণ খাত ৬ দশমিক ৪ শতাংশ, সেবা খাত ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পরিবহন, গুদামজাতকরণ ও যোগাযোগ খাত ১৭ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। এদিকে সরকারি রিমোট ওয়ার্ক নীতির আওতায় কতজন কর্মী আসবেন বা এতে উৎপাদনশীলতার কী প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করেনি সরকার।
সরকারি হিসাবে, বর্তমানে ইরানের সরকারি বেতনভুক্ত কর্মীর সংখ্যা ২৪ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। স্থানীয় সরকার, দমকল, সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের যুক্ত করলে এ সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পদক্ষেপগুলো তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় কিছুটা সহায়তা করতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।