প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬
রাষ্ট্র মানুষের সামাজিক জীবনের একটি অপরিহার্য বাস্তবতা। মানুষের জানমাল, বিশ্বাস, মর্যাদা ও অধিকার সংরক্ষণের জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কিন্তু ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনেক রাষ্ট্রব্যবস্থাই শক্তি, ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মুখ্য করে তুললেও ন্যায়বিচার, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণকে উপেক্ষা করেছে। ফলে আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরেই দারিদ্র, বৈষম্য, শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় ও মানবাধিকার সংকট ক্রমশ গভীরতর হয়েছে। আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা সামাজিক নিরাপত্তা ও নাগরিক সুবিধার কথা বললেও তা নৈতিক ভিত্তিহীন ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোয় আবদ্ধ থাকায় বহু ক্ষেত্রে মানুষের মৌলিক সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে ধর্মকে রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার ফলে রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রায়ই স্বেচ্ছাচার, নৈতিক অবক্ষয় ও মানবিক দায়িত্বহীনতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ বাস্তবতায় এমন এক রাষ্ট্রচিন্তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, যা ন্যায়, নৈতিকতা ও কল্যাণকে শুধু নীতিগত স্লোগান নয়, বরং বাধ্যতামূলক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এ প্রেক্ষাপটে ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিকল্প রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্ব লাভ করে। ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবকল্যাণকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করে। এখানে রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার উপকরণ নয়; বরং তা একটি আমানত, যার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজে ইনসাফ, ভারসাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকট : আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মূলত সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ ও পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রকে একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে তা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তিহীন ক্ষমতাণ্ডকাঠামোয় পরিণত হয়েছে। ফলে আইন, সংবিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সামষ্টিক কল্যাণ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককে শুধু আইনি ও নাগরিক চুক্তিতে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। ফলে নৈতিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক দায়িত্ববোধ রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রায় অনুপস্থিত। এ রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হলো ‘অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণ’। পুঁজিকেন্দ্রিক অর্থনীতি ধনী ও ক্ষমতাবানদের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত করেছে। আর বৃহৎ জনগোষ্ঠী দারিদ্র, বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। রাষ্ট্র কল্যাণের কথা বললেও বাস্তবে তা করপোরেট স্বার্থ ও রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির সেবকে পরিণত হয়েছে। ফলে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। আরেকটি গভীর সংকট হলো ‘নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়’। স্বাধীনতার নামে সীমাহীন ভোগবাদ, পারিবারিক বন্ধনের ভাঙন, মাদকাসক্তি, সহিংসতা ও যৌন অবক্ষয় আধুনিক রাষ্ট্রের সামাজিক বাস্তবতায় স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র আইন প্রয়োগে সক্রিয় হলেও নৈতিক পুনর্গঠনে প্রায় নীরব। ফলে অপরাধ দমন সাময়িক হলেও অপরাধের উৎস নির্মূল হয় না। এছাড়া ‘ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহিতার অভাব’ আধুনিক রাষ্ট্রের আরেকটি বড় সংকট। নির্বাচন ও গণতন্ত্র থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রক্ষমতা প্রায়ই শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার উপকরণে পরিণত হয়। জনগণ রাষ্ট্রের মালিক না হয়ে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত বস্তুতে রূপ নেয়। এভাবেই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আইন, প্রশাসন ও উন্নয়নের বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে এক গভীর মানবিক ও নৈতিক সংকটে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে।
আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র ধারণার উদ্ভব : উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের সূচনালগ্নে রেনেসাঁ তথা শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী ইউরোপে যে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়, তার প্রেক্ষিতেই ‘কল্যাণ রাষ্ট্র’ ধারণার উদ্ভব। শিল্পায়নের ফলে গ্রামভিত্তিক সমাজ কাঠামো ভেঙে পড়ে, নগরকেন্দ্রিক শ্রমজীবী শ্রেণি গড়ে ওঠে এবং সীমাহীন শ্রমশোষণ, দারিদ্র?্য, বেকারত্ব ও আবাসন সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র তখন পর্যন্ত নিজেকে শুধু আইনশৃঙ্খলা ও সীমিত প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে আবদ্ধ রেখেছিল। ফলে এসব সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়নি। এ বাস্তবতা রাষ্ট্রচিন্তায় একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়।
ধীরে ধীরে এ ধারণা জোরালো হয়, রাষ্ট্র শুধু শাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না; বরং নাগরিকদের ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করাও তার দায়িত্ব। এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ও দারিদ্র বিমোচনে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের দাবি ওঠে। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় সামাজিক নিরাপত্তা আইন, শ্রমিক অধিকার, পেনশন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ঘটে; যা আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। তবে এ কল্যাণ রাষ্ট্র ধারণার ভিত্তি ছিল মূলত মানবিক ও সামাজিক প্রয়োজনবোধ, ধর্মীয় বা নৈতিক দায়বদ্ধতা নয়। ফলে এটি নাগরিকের কল্যাণকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও দায়িত্ব ও নৈতিকতার সঙ্গে তা গভীরভাবে যুক্ত করতে পারেনি। আর্থিক সক্ষমতার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল এ ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ঋণ, প্রশাসনিক জটিলতা ও নাগরিক নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করেছে। এভাবেই ‘আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র ধারণা’ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি সংশোধনী মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তা মানুষের সামগ্রিক নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়।
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে কল্যাণ ও কল্যাণ রাষ্ট্রের সংজ্ঞা : আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে কল্যাণ বলতে বোঝায়, ‘রাষ্ট্রের সেই কার্যক্রম ও নীতি, যা নাগরিকদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক কল্যাণ নিশ্চিত করে।’ এটি শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং নাগরিকদের জীবনমান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা, সামাজিক সমতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গে যুক্ত। আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো ‘সামাজিক ন্যায় ও দারিদ্র বিমোচন’। টি.এইচ মার্শাল বলেন, ‘কল্যাণ রাষ্ট্র হলো সেই রাষ্ট্র, যা নাগরিকদের নাগরিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করে এবং দারিদ্র, অসাম্য ও সামাজিক অসুবিধা দূর করার জন্য নীতি গ্রহণ করে।’ রিচার্ড টিটমাস বলেন, ‘কল্যাণ রাষ্ট্র হলো এমন রাষ্ট্র, যা জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রদান করে, বিশেষ করে, দুর্বল ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য।’ আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের মূল উপাদানগুলো হলো- ১. অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তথা বেকারত্ব, অসহায়তা ও দারিদ্র দূর করা। ২. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা তথা নাগরিকদের মৌলিক শিক্ষার সুযোগ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। ৩. সমাজসেবা তথা প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করা। ৪. ন্যায়বিচার ও সামাজিক সমতা তথা বৈষম্য হ্রাস ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান করা।
ইসলামে ‘কল্যাণ’ তত্ত্ব : ইসলামে ‘কল্যাণ’ ধারণা বোঝানোর জন্য কোরআন-সুন্নাহ এবং উসুলের গ্রন্থে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ফালাহ’, ‘ফাউয’ ও ‘মাসলাহা’। পবিত্র কোরআনে ‘ফালাহ’ শব্দটি ৪০ বার, ‘ফাউয’ শব্দটি ২৯ বার ব্যবহৃত হয়েছে। উসুলবিদগণ মাকাসিদুশ শরিয়ার আলোকে ‘মাসলাহা’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। এসব শব্দের মূল অর্থ হলো ‘কল্যাণ’; যা ইসলামের মানবকল্যাণমুখী দর্শনের মূলভিত্তি। ইমাম শাতিবি (রহ.) বলেছেন, ‘ইসলামি শরিয়া প্রবর্তনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, ইহ ও পরকালে মানুষের যাবতীয় কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং অকল্যাণসমূহ দূর করা।’ ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, ‘শরিয়ার উদ্দেশ্য হলো মানুষের পাঁচটি মৌলিক বিষয় তথা- দীন, জীবন, বিবেক-বুদ্ধি, বংশধারা ও সম্পদ সংরক্ষণ করা। যেকোনো কাজ বা বিধান যা এ পাঁচটি বিষয়কে সংরক্ষণ করে, তা ইসলামের দৃষ্টিতে ‘কল্যাণ বা মাসলাহা’। আর যা এ বিষয়গুলোর ক্ষতি করে, তা ‘অকল্যাণ বা মাফসাদা’ হিসেবে গণ্য হবে। অতএব, ইসলামের কল্যাণতত্ত্বের মূল লক্ষ্য হলো ‘মানবজাতির মৌলিক অধিকার রক্ষা ও জীবনের বিভিন্ন দিককে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করা’। এ দর্শন শুধু মানুষের পার্থিব কল্যাণই নিশ্চিত করে না, বরং দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জীবনের ভারসাম্যপূর্ণ কল্যাণ নিশ্চিত করে। ইসলামের কল্যাণতত্ত্ব এমন একটি সমন্বিত জীবনদর্শন, যা ব্যক্তিগত নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, অর্থনৈতিক নীতি ও রাজনৈতিক কাঠামোতে সমন্বয় সাধন করে।
লেখক : পরিচালক, মাকাসিদ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ আমির, পয়ামে ইনসানিয়াত বাংলাদেশ