প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৭ মে, ২০২৬
প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ইবরাহিম (আ.) প্রিয়তম বস্তু (ছেলে ইসমাইল)-কে কোরবানি করতে স্বপ্নাদিষ্ট হয়েছিলেন। তিনি রাব্বুল ভভআলামিনের সন্তুষ্টির জন্য ছেলেকে কোরবানি দিতে উদ্যত হলে তারই ইচ্ছায় ইসমাইলের পরিবর্তে একটি জান্নাতি দুম্বা কোরবানি হয়। সেই সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমাকে তুলে ধরাই ঈদুল আজহায় পশু কোরবানির প্রধান মর্মবাণী। কোরবানির ঈদ আমাদের কাছে আত্মশুদ্ধি, আত্মতৃপ্তি ও আত্মত্যাগের এক সুমহান বার্তা নিয়ে প্রতিবছর হাজির হয়।
ঈদুল আজহার শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে আমরা সব পাপ, বঞ্চনা, সামাজিক অনাচার ও রিপুর তাড়না বা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হই।
তাই ঈদুল আজহায় পশু কোরবানির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিরাজমান পশুশক্তি, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রিপুকেই মূলত কোরবানি দিতে হয়। হালাল অর্থে অর্জিত পশু কোরবানির মাধ্যমেই এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সব অনিশ্চয়তাণ্ডশঙ্কা দূর করে হিংসা, হানাহানি ও বিদ্বেষ ভুলে এক কাতারে দাঁড় করানো এবং সাম্য ও সহমর্মিতার মনোভাব জাগিয়ে তোলাই ঈদুল আজহার মাহাত্ম।
আত্মনিবেদন ও আত্মত্যাগের নাম কোরবানি : কোরবানি আসলে আত্মনিবেদন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে জীবনকে পরিশীলিত করার নাম; জবাই করা পশুর রক্ত-মাংস এর দৃশ্যত অবদান। কোরবানির সেই দিন আজও আমাদের সামনে নিয়মিত সমাগত। যাদের পশু কেনার ক্ষমতা আছে, তারা পশু কোরবানি করি। কিন্তু সেই কোরবানিতে কতটা আছে ত্যাগের উপলব্ধি আর মানবতাকে মহিমান্বিত করার তাৎপর্যবোধ? তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
বড় বড় পশু জবাই করে নিজেদের অর্থবিত্তের প্রভাব-প্রতিপত্তি জাহির করি। কোরবানির মাংস দিয়ে ফ্রিজ ভর্তি করি; দেশের অগণিত দরিদ্র মানুষকে দেখিয়ে ভূরিভোজ করি। অথচ মহান রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘কোরবানির পশুর রক্ত-মাংস তাঁর কাছে পৌঁছে না, তিনি দেখতে চান মানুষের মন।’ (সুরা হজ : ৩৭)।
সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধনে কোরবানি : আমরা জানি না, আমাদের মনের ভেতর কী দেখেন মহান রাব্বুল আলামিন! কোরবানির ফজিলত হাসিল করতে হলে আবেগ, অনুভূতি, প্রেম-ভালোবাসা ও ঐকান্তিকতা দরকার; যা নিয়ে কোরবানি করেছিলেন সর্বপ্রথম কোরবানিদাতা ইবরাহিম (আ.)। শুধু গোশত ও রক্তের নাম কোরবানি নয়; বরং আল্লাহর পথে নিজের সম্পদের একটি অংশ বিলিয়ে দেওয়ার এক দৃপ্ত শপথের নামই কোরবানি। তাকওয়া অর্জনই কোরবানির মূখ্য উদ্দেশ্য; তাকওয়ার মাধ্যমেই আত্মশুদ্ধি হয়।
ঈদুল আজহা আমাদেরকে লৌকিকতা ভুলে আল্লাহপ্রেমে পূর্ণ তাকওয়া (আল্লাহভীতি ও মনের একাগ্রতা) নিয়ে কোরবানি করতে শেখায়। জিলহজ মাসের দশ থেকে বারো তারিখ পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র এ কোরবানির উৎসব পালিত হয় প্রতীকী অনুষ্ঠান হিসেবে নয়; বরং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাকওয়া নিয়ে প্রিয় বস্তু তাঁরই নামে উৎসর্গ করার মানসে। সে কথাই অগ্নিবীণায় তুলে ধরেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কোরবানিকাব্যে- ‘কোরবানি-দিন আজ না ওই?/ বাজ্না কই? সাজ্না কই?/ কাজ না আজিকে জানমাল দিয়ে মুক্তির উর্দ্ধরণ?/ বল্- যুঝবো জান্ ভি পণ!/ ওই খুনের খুঁটিতে কল্যাণ-কেতু, লক্ষ্য ওই তোরণ,/ আজ আল্লাহর নামে জান কোরবানে ঈদের পূত বোধন।/ ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!’