ঢাকা রোববার, ১৭ মে ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কোরবানির পশু যেমন হতে হবে

আবু তাকরিম
কোরবানির পশু যেমন হতে হবে

যে পশুটি কোরবানি করা হবে, তার ওপর কোরবানিদাতার পূর্ণ মালিকানা থাকতে হবে। বন্ধকি পশু, কর্জ করা পশু বা পথে পাওয়া পশু দ্বারা কোরবানি আদায় হবে না।

গৃহপালিত সব ধরনের পশু তথা- ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, গরু, মহিষ এবং উট দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু (যেমন- হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি) দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ নয়।

তেমনিভাবে হাঁস-মুরগি বা কোনো পাখি দ্বারাও কোরবানি জায়েজ নয়। (ফতোয়ায়ে কাজিখান : ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২০৫)।

পশুর বয়সসীমা : গরু ও মহিষ দুই বছর এবং উট পাঁচ বছর পূর্ণ হলে তা দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ। ছাগল, দুম্বা ও ভেড়া এক বছর পূর্ণ হতে হবে। দুম্বা ও ভেড়া যদি এক বছর পূর্ণ না হয়, বরং বছরের বেশি অংশ অতিবাহিত হয় এবং দেখতে স্বাস্থ্যগতভাবে এক বছরের বাচ্চার মতো মনে হয়, তাহলে সেরূপ দুম্বা ও ভেড়া দিয়েও কোরবানি করা জায়েজ।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) কোরবানি এবং হজ-উমরার পশুর ক্ষেত্রে উটের মধ্যে পাঁচ বছর বয়স অতিক্রমকারী, গরু-মহিষের ক্ষেত্রে দুই বছর অতিক্রমকারী এবং বকরি ও ভেড়ার ক্ষেত্রে এক বছর অতিক্রমকারী পশুর কথা বলতেন। (মুয়াত্তায়ে মালেক : ৭৫৪)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা মুসিন্নাহ ছাড়া জবাই কর না। (মুসিন্নাহ হলো- ৫ বছর বয়সী উট, ২ বছরের গরু ও ছাগলের ক্ষেত্রে ১ বছর)। যদি সম্ভব না হয়, তাহলে ছয় মাস বয়সী ভেড়া বা দুম্বা।’ (মুসলিম : ১৯৬৩)।

পশুর গঠন-আকৃতি : কোরবানির পশু মোটা-তাজা ও নিখুঁত হওয়া উত্তম। (মুসনাদে আহমদ : ৬/১৩৬, ফতোয়ায়ে আলমগিরি : ৫/৩০০)। আবুল আশাদ্দ সুলামি তার পিতার সূত্রে, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন; তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে সাত ব্যক্তির সপ্তমজন ছিলাম।

এমতাবস্থায় রাসুল (সা.) আমাদের প্রত্যেককে এক দিরহাম করে জমা করার জন্য বললেন। আমরা জমাকৃত সাত দিরহাম দিয়ে একটি কোরবানির পশু ক্রয় করে বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমরা এটি বহু দামে কিনেছি।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘উত্তম কোরবানি তা, যা অধিক মূল্যবান ও মোটা-তাজা হয়ে থাকে।’ (মুসনাদে আহমদ : ১৫৫৩৩)।

নর-মাদির বিধান : যেসব পশু কোরবানি করা জায়েজ, সেগুলোর নর-মাদা দুটোই কোরবানি করা যায়। (ফতোয়ায়ে কাজিখান : ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২০৫)।

খাসিকৃত পশু দিয়ে কোরবানি : খাসিকৃত পশু দিয়ে কোরবানি করা উত্তম। রাসুল (সা.) যখন কোরবানি করার ইচ্ছে করতেন, তখন দুটি বড় মোটা-তাজা শিং ও সুন্দর রঙবিশিষ্ট মেষ কিনতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩১১৩)। আবু রাফে (রহ.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুল (সা.) দুটি মোটা-তাজা খাসিকৃত ভেড়ার কোরবানি করেছেন।’ (মুসনাদে আহমদ : ২৬৬৪৯)।

গর্ভবতী পশুর কোরবানি : গর্ভবতী পশু কোরবানি করা জায়েজ। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে সে পশু কোরবানি করা মাকরুহ। জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায়, তাহলে সেটাও জবাই করতে হবে এবং কেউ চাইলে এর গোশতও খেতে পারবে। (ফতোয়ায়ে কাজিখান : ৩/৩৫০)।

বন্ধ্যা ও পাগল পশুর কোরবানি : বন্ধ্যা পশুর কোরবানি জায়েজ। (রদ্দুল মুহতার : ৬/৩২৫)। হাসান (রা.) বলেন, ‘পাগল পশুর কোরবানি জায়েজ। তবে যদি এমন পাগল হয়, যে ঘাস পানি দিলে খায় না এবং মাঠেও চরে না, তাহলে তার কোরবানি জায়েজ হবে না। (আন নিহায়া ফি গরিবিল হাদিস : ১/২৩০, বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২১৬)।

জিহ্বাহীন পশুর কোরবানি : জিহ্বা নেই, এমন গরু দ্বারা কোরবানি করলে সহিহ হবে না। তবে জিহ্বাহীন ছাগল দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। তবে না করা ভালো। (শামি : ৫/২২৯; আলমগিরি : ৫/২৯৮)।

শিং নেই বা ভাঙা পশুর বিধান : যে পশুর জন্মগত শিং নেই বা মধ্যখানে ভেঙে গেছে, তা দিয়েও কোরবানি জায়েজ। আলী (রা.)-সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন, ‘একটি গাভি সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করা যায়।’ (বর্ণনাকারী বলেন) বললাম, ‘যদি গাভি বাচ্চা দেয়, তাহলে কী করবো?’ বললেন, ‘বাচ্চাকেও গাভির সঙ্গে জবাই করে দাও।’

বললাম, ‘খোঁড়া পশু!’ বললেন, ‘যদি কোরবানির স্থানে হেঁটে যেতে পারে, তাহলে কোরবানি করবে।’

বললাম, ‘শিংভাঙা পশু!’ বললেন, ‘এমন পশু দিয়ে কোরবানি করতে কোনো সমস্যা নেই। তবে আমাদেরকে রাসুল (সা.) কোরবানির পশুর চোখণ্ডকান ভালোভাবে দেখে নেবার আদেশ করেছেন।’ (তিরমিজি : ১৪২৩)।

নাপাক খাওয়া পশুর কোরবানি : যে পশু শুধু নাপাক খেয়েই জীবিকা নির্বাহ করে, তা দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ নেই। তবে সে পশুটি উট হলে ৪০ দিন, গরু-মহিষ হলে ২০ দিন, ছাগল-ভেড়া-দুম্বা হলে ১০ দিন বেঁধে রাখার পর কোরবানি করলে বৈধ হবে। আর যে পশু মাঝেমধ্যে নাপাক খায়, তা দ্বারা কোরবানি করতে কোনো নিষেধ নেই। (ফতোয়ায়ে শামি : ৫/২২৯, ফতোয়ায়ে আলমগিরি : ৫/২৯৮)।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত