প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
হিজরি বর্ষের রবিউল আউয়াল মাস মুসলমানদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ মাসে মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাই এ মাসে বিশেষত তার সিরাত-গবেষণায় থাকে বাড়তি আমেজ। ইতিহাসজুড়ে অসংখ্য আলেম-ডওলামা, মনীষী ও লেখক নবীজীবন নিয়ে অনেক বই লিখেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) রচনা করেন ‘সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া’। বইটি বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য সহজ ভাষায় অনুবাদ করেছেন তরুণ লেখক ও অনুবাদক- মাওলানা ইলিয়াস মশহুদ
বইটি প্রকাশের পর অল্প সময়েই বেশ পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে। দাওয়াহ সংস্করণ এরই মধ্যে প্রায় দেড় লাখ পাঠকের হাতে পৌঁছেছে। সিরাত গবেষণা ও তার এ বিপুল জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন আলোকিত বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ
প্রশ্ন : অনেক বিষয় থাকতে সিরাতুন্নবী (সা.) কেন আপনার এত পছন্দ?
উত্তর : পৃথিবীতে একমাত্র মানব নবীজি (সা.), যার জীবনচর্চার কাজ অতুলনীয়। এটি তার বিশেষত্ব। একই লেখক যদি একাধিক সিরাত লিখেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এমন অনেক মনীষী গত হয়েছেন, যারা একাই একাধিক ভাষা-ভঙ্গি ও পদ্ধতিতে নবীজি (সা.)-এর জীবন চিত্রায়ন করেছেন। মনের মাধুরী মিশিয়ে বর্তমানেও নানাজন ও প্রতিষ্ঠান নানা দিক থেকে তার একাধিক সিরাত লিখে চলছেন। আমার এ কাজও অনুরূপ।
প্রশ্ন : অনুবাদে প্রেরণা পেলেন কীভাবে?
উত্তর : নবীজি (সা.)-এর জীবনই আমার আদর্শ। বাংলাভাষী সাধারণ পাঠকদের জন্য এমন একটি সংক্ষিপ্ত অথচ নির্ভরযোগ্য সিরাতগ্রন্থ খুব কম ছিল। তাই কাজটি করার প্রেরণা পেয়েছি।
প্রশ্ন : অনুবাদের গল্প বলুন।
উত্তর : ২০২১ সালের কথা। সিলেটের কোনো এক লাইব্রেরিতে বই কিনতে গেলাম। তাকে তাকে সাজানো বইগুলো দেখি আর ভাবি, চাইলে আমিও তো এভাবে কয়েকটি বই লিখতে পারি। কিন্তু লেখালেখির জগতে দেড় যুগ পার করলেও এখনও তেমন কিছু করতে পারিনি। সেই ভাবনা থেকেই চিন্তায় এলো, এবার অন্তত কিছু একটা করি। এরপর আসে বরকতময় রবিউল আউয়াল মাস। অবসরে সেই ভাবনাটা আবার জেগে উঠল। কাজ যখন শুরু করবই, তখন পুণ্যময় একটি বিষয় দিয়েই শুরু করি। সেদিন লাইব্রেরি থেকে নিয়ে আসা মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া (সা.) নামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটির অনুবাদের কাজ শুরু করি। বিষয়বস্তু কঠিন হলেও পরিচিত এবং ছাত্রজীবনে বইটি বারবার পড়েছি বলে সাহস পাই।
প্রশ্ন : বড? চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
উত্তর : মুফতি শফি (রহ.)-এর লেখনী অত্যন্ত গভীর ও সাহিত্যপূর্ণ। সেটিকে সহজ ও সাবলীল বাংলায় রূপান্তর করা কঠিন। আবার ভাবের প্রতি বিশ্বস্ত থাকাও জরুরি ছিল।
প্রশ্ন : অনুবাদে কোন দিকটি গুরুত্ব দিয়েছেন?
উত্তর : পাঠক যেন নবীজি (সা.)-এর সিরাত সহজভাবে বুঝতে পারেন এবং দাওয়াহর কাজে ব্যবহার করতে পারেন, এটি ছিল আমার প্রধান লক্ষ্য। এজন্য ভাষা সহজ করেছি। তবে বক্তব্যের মৌলিকতা নষ্ট করিনি। পাঠকের সুবিধার্থে নতুন অধ্যায় বিভাজন, কিছু শিরোনামণ্ডউপশিরোনাম সংযোজন, টীকা এবং অনুশীলনীমূলক প্রশ্নও যোগ করেছি।
প্রশ্ন : বর্তমানে বাজারে অনেক সিরাতগ্রন্থ আছে; সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া কেন আলাদা?
উত্তর : এ বইয়ের বৈশিষ্ট্য হলো, এর সংক্ষিপ্ততা ও গভীরতা। ছোট পরিসরে বিশাল বিষয়কে ধারণ করা হয়েছে। তাই ছাত্র-শিক্ষক, তরুণ-তরুণী সবার জন্য এটি সহজপাঠ্য। তা ছাড়া বইটির কয়েকটি অনুবাদ বাজারে আছে। এরপরও কেন নতুন করে অনুবাদ করতে গেলাম, পাঠক বইটি পড়লেই এর উত্তর পেয়ে যাবেন। তা ছাড়া এটি কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যতালিকায়ও রয়েছে; সে হিসেবে বিভিন্ন দিক থেকে শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হবেন।
প্রশ্ন : বইটির পাঠকশ্রেণি কারা বলে মনে করেন?
উত্তর : আসলে নির্দিষ্ট কোনো পাঠকশ্রেণি নেই; সব শ্রেণির মানুষই এ বইয়ের পাঠক। যেহেতু এটি বিভিন্ন মাদ্রাসা বোর্ডের সিলেবাসভুক্ত, তাই কিশোর, তরুণ ও সাধারণ পাঠককে মাথায? রেখে সহজ ভাষা ব্যবহার করেছি। এর বাইরে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন সংগঠন তাদের সিরাত প্রতিযোগিতায় পছন্দের শীর্ষে রাখছে।
প্রশ্ন : অনুবাদের সময় আপনার ব্যক্তিগত কোনো উপলব্ধি বা পরিবর্তন হয়েছে?
উত্তর : অবশ্যই। নবীজি (সা.)-এর প্রতিটি ঘটনা অনুবাদ করতে গিয়ে মনে হয়েছে, তিনি আজও আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এবং শিক্ষা দিচ্ছেন। নিজের জীবনেও পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি।
প্রশ্ন : দাওয়াহ সংস্করণ হিসেবে এত বিপুল পরিমাণ বিতরণ সম্ভব হলো কীভাবে?
উত্তর : এর পেছনে আল্লাহর সাহায্য সবচেয়ে বড় কারণ। এতে আমার ব্যক্তিগত কোনো ফায়দা নেই যদিও, তবু লাখো পাঠকের হাতে কোনো বই পৌঁছে যাওয়া বেশ গর্বের ব্যাপার। এরপর ছিল কিছু দীনদার প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির আন্তরিক সহযোগিতা। তাদের জন্যই এত পাঠকের হাতে বইটি পৌঁছেছে।
প্রশ্ন : পাঠকের বিপুল সাড়া পাওয়ায় অনুভূতি কেমন?
উত্তর : এটি আমার ব্যক্তিগত নয়, দাওয়াহর সাফল্য। নবীজি (সা.)-এর জীবনী যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, সমাজে তত পরিবর্তন আসবে। অনেকেই বলেছেন, বইটি তাদের জীবনে পরিবর্তন এনেছে। বিশেষত নবীজি (সা.)-এর দাওয়াহর পদ্ধতি, ধৈর্য ও ত্যাগ তাদের নতুন করে অনুপ্রাণিত করছে। অনুবাদক হিসেবে এটি আমার জীবনের পরম আনন্দ ও পাওয়া।
প্রশ্ন : আপনার দৃষ্টিতে বইটির গুরুত্বপূর্ণ বার্তা কী?
উত্তর : নবীজি (সা.)-এর জীবন হলো পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। যে কোনো যুগের মানুষ তার সিরাত থেকে পথনির্দেশ নিতে পারে। বইটির গুরুত্ব বুঝতে বা বোঝাতে এ তথ্যটি জানা থাকাই যথেষ্ট যে, এটি দীর্ঘদিন থেকে উপমহাদেশের দীনি প্রায় সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সিলেবাসভুক্ত হয়ে আছে। লেখক মুফতি শফি (রহ.) সাধারণ পাঠকের প্রতি লক্ষ্য রেখেই এটি রচনা করেছেন। নবীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় প্রায় সব বিষয়ই সংক্ষেপে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেছেন। ফলে বইটি ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের হাজার হাজার মাদ্রাসার পাঠ্যতালিকায় কয়েক যুগ ধরে পঠিত হয়ে আসছে।
প্রশ্ন : আগামীতে কী কী লেখার পরিকল্পনা?
উত্তর : ছোটদের জন্য সহজ সিরাতগ্রন্থ ও কিছু দাওয়াহভিত্তিক কাজ করছি। আগামী প্রজন্মের হাতে নির্ভরযোগ্য ও সহজ ভাষায় ইসলামি সাহিত্য পৌঁছাতে চাই। সিরাত নিয়ে প্রচুর কাজ করছি। এরই মধ্যে ‘নবীজির হাসি’ ও ‘নবীজির কান্না’ নামে দুটি মৌলিক বই প্রকাশ পেয়েছে। সেগুলোও পাঠক সাদরে গ্রহণ করছেন। এ ছাড়া খোলাফায়ে রাশেদাসহ সাহাবিদের জীবনী নিয়ে কাজ করছি। ভবিষ্যতেও সিরাতচর্চার এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাই।