ঢাকা শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

জুমার দিনে ঈমানি ডাক

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ
জুমার দিনে ঈমানি ডাক

সপ্তাহের সেরা দিন শুক্রবার তথা জুমার দিন। এটি পৃথিবীর অন্যতম তাৎপর্যবহ দিবস। ‘জুমা’ নামে পবিত্র কোরআনে একটি সুরা রয়েছে। এ দিনে আল্লাহতায়ালা জগৎ সৃষ্টির পূর্ণতা দান করেছেন। আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-কে এ দিনেই জান্নাতে একত্র করেছিলেন। এ দিনে মুসলিম উম্মাহ একটি বিশেষ ইবাদত উপলক্ষে মসজিদে একত্রিত হয়। তাই দিনটিকে ‘ইয়াওমুল জুমা বা জুমার দিন’ বলা হয়।

সাপ্তাহিক ঈদের দিন : জুমা মুসলমানের সাপ্তাহিক ঈদের দিন। এ দিনের অনেক ফজিলত ও গুরুত্বের কথা হাদিসে এসেছে। রয়েছে অনেক মাহাত্ম্যও। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এটা শুক্রবার, যে দিনের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা আমাদের পূর্ববর্তী জাতি থেকে পৃথক করেছেন। ইহুদিদের জন্য বিশেষ ইবাদতের দিন ছিল শনিবার, খ্রিষ্টানদের জন্য ছিল রোববার। যখন আল্লাহতায়ালা আমাদের পাঠালেন, তখন শুক্রবারকে জুমার দিন হিসেবে পালন করতে নির্দেশ দিলেন।’ (মুসলিম : ১৭৯৭)।

জোহরের পরিবর্তে জুমা ফরজ : শুক্রবার জোহরের পরিবর্তে জুমার দু’রাকাত নামাজ ফরজ। এটিকে জোহরের চার রাকাত ফরজ নামাজের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। তারিক ইবনে শিহাব (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ক্রীতদাস, নারী, অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তি ছাড়া সকল মুসলমানের ওপর জুমার নামাজ জামাতে আদায় করা অপরিহার্য।’ (সুনানে আবি দাউদ : ১০৬৭; মুসতাদরাকে হাকিম : ১০৬২; আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি : ৫৫৮৭)।

জুমার প্রস্তুতি গ্রহণ : সালমান (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে ভালোভাবে গোসল করবে, তেল ব্যবহার করবে এবং সুগন্ধি নেবে, তারপর মসজিদে যাবে, দুই মুসল্লির মাঝে জোর করে জায়গা নেবে না, ইমামের সঙ্গে নামাজ আদায় করবে এবং ইমাম যখন খুতবা দেবে, চুপ করে মনোযোগসহ শুনবে, দুই জুমার মৃধ্যবর্তী সময়কার তার সব গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (সুনানে আবি দাউদ : ৪৭৯)।

সুরা কাহফ পাঠ করা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ পাঠ করবে, একটি নুর তার পা থেকে আসমান পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। হাশরের দিনে এ নুর তার জন্য আলো হবে। এক জুমা থেকে অপর জুমা পর্যন্ত তার গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (মুসতাদরাকে হাকিম : ২১২৫)।

আজান হতেই কাজকর্ম না করা : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মোমিনগণ! জুমার দিনে যখন (জুমার) নামাজের আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ছুটে যাও এবং বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা অনুধাবন কর।’ (সুরা জুমা : ৯)।

আগে আগে মসজিদে যাওয়া : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জুমার দিনে যে ব্যক্তি গোসল করে জুমার নামাজের জন্য যায় এবং সামর্থ্যানুযায়ী নামাজ আদায় করে, এরপর ইমাম খুতবা শেষ করা পর্যন্ত নীরব থাকে, তারপর ইমামের সঙ্গে নামাজ আদায় করে, তার এ জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত এবং অতিরিক্ত আরও তিন দিনের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (মুসলিম : ২০২৪)।

আগে গেলে বেশি সওয়াব : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শুক্রবার দিন মসজিদের প্রতিটি দরজায় ফেরেশতারা অবস্থান করে এবং (জুমার নামাজে) আগমনকারীদের নাম ক্রমানুসারে লিখতে থাকে। এরপর ইমাম যখন (মিম্বরে) বসে, তারা লেখাগুলো গুটিয়ে নেয় এবং খুতবা শোনার জন্য চলে আসে। মসজিদে যে আগে আসে, তার উদাহরণ সে ব্যক্তির মতো, যে একটি উটনী কোরবানি করেছে।

তার পরবর্তীজনের দৃষ্টান্ত তার মতো, যে একটি গাভি কোরবানি করেছে। তার পরবর্তীজনের দৃষ্টান্ত তার মতো, যে একটি ভেড়া কোরবানি করেছে এবং তার পরবর্তীজনের দৃষ্টান্ত তার মতো, যে একটি মুরগি দান করেছে। পরবর্তীজনের দৃষ্টান্ত তার মতো, যে একটি ডিম দান করেছে।’ (মুসলিম : ২০২১)।

প্রতি কদমে সওয়াব : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে সকাল সকাল গোসল করল এবং করাল, তারপর ইমামের কাছে বসে চুপ করে মনোযোগসহ খুতবা শুনল, প্রত্যেক কদমের বিনিময়ে সে এক বছরের নফল রোজা ও নামাজের সওয়াব পাবে।’ (তিরমিজি : ৪৯৮)।

খুতবায় অমনোযোগী না হওয়া : জুমার খুতবার সময় যে অমনোযোগী থাকল বা নিজেকে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখল, সে নিশ্চয় মন্দ কাজ করল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সে জুমার কোনো প্রতিদান পাবে না।’ (মুসনাদে আহমদ : ৭১৯)।

খুতবার সময় বারণ করাও মানা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি খুতবার সময় অপরকে কথা না বলতে বা নীরব থাকতে বলল, সেও জুমায় কোনো প্রতিদান পাবে না।’ (মুসনাদে আহমদ : ২০৩৩)।

ফরজের পরবর্তী সুন্নতের গুরুত্ব : জুমার ফরজের পরবর্তী সুন্নত অনেকে ছেড়ে দেয়। অথচ আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মাঝে যে জুমার নামাজে শরিক হলো, সে যেন জুমার নামাজ (দু’রাকাত) শেষে চার রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করে।’ (মুসলিম : ২০৩৩)।

জুমার দিনে দোয়া কবুল হয় : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, যখন কোনো মোমিন বান্দা আল্লাহর কাছে ভালো কিছু প্রার্থনা করলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে তা দান করেন।’ (মুসলিম : ৮৫২; মুসনাদে আহমদ : ৭১৫১; আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি : ১০২৩৪)।

যে সময় দোয়া কবুল হয় : জুমার দিনে দোয়া কবুল হওয়ার সময়ের ব্যাপারে ৪৫টি মতামত পাওয়া যায়। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মত হলো, আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত দোয়া কবুল হয়। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জুমার দিনের কাঙ্ক্ষিত সময় হলো আসরের পর থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত।’ (মুসনাদে ইবনে আবি শাইবা : ৫৪৬০; তিরমিজি : ৪৮৯)।

জুমা পরিহার করা কাম্য নয় : জুমার নামাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময়। এ সত্ত্বেও অনেকেই জুমার নামাজকে অবহেলা করে থাকে। অযথা ও বিনা কারণে কখনও জুমার নামাজ পরিত্যাগ করা যায় না। এ ব্যাপারে শরিয়তে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত পরপর তিন জুমা পরিত্যাগ করে, আল্লাহতায়ালা তার অন্তরে মহর এঁটে দেন।’ (বোখারি : ১০৫২; তিরমিজি : ৫০২; মুসলিম : ১৯৯৯)।

জুমা বর্জনকারীর ব্যাপারে ধমকি : যারা জুমার নামাজ আদায় করে না, তাদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমার ইচ্ছে হয়, আমি কাউকে নামাজ পড়ানোর আদেশ করি, সে নামাজ পড়াক। অতঃপর যেসব লোক জুমার নামাজ পড়তে আসেনি, আমি তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিই।’ (মুসলিম : ৬৫২; মুসনাদে আহমদ : ৩৮১৬, মুসনাদে ইবনে আবি শাইবা : ৫৫৩৯; আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি : ৪৯৩৫)।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত