ঢাকা শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ইসলামে খেলাধুলার বিধান

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ
ইসলামে খেলাধুলার বিধান

ইসলাম একটি সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলাম সত্য ও ন্যায়ের জীবনযাপনের পাশাপাশি বিনোদন ও সংস্কৃতি চর্চায় উৎসাহ দেয়। বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম খেলাধুলা। সুস্থ শরীর ও সুন্দর মন পরস্পর পরিপূরক। তাই ইসলাম এ বিষয়টির প্রতিও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এ ছাড়াও ইসলাম নিথর-নির্জীব জীবনবোধের বদলে ইবাদতের মাধুর্যে শরীর-স্বাস্থ্যের বিকাশকে উৎসাহ দেয়। খেলাধুলা ও বিনোদনমূলক বিষয়াবলিকে ইসলামধর্মে খুব সর্তকতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়েছে। খেলা যখন খেলায় এবং বিনোদন যখন বিনোদনে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন ইসলাম এমন খেলা ও বিনোদনে বাঁধা দেয় না। কারণ, খেলাধুলা পৃথিবীর আদিকাল থেকে শিশু-কিশোরদের মজ্জাগত স্বভাব ছিল এবং আছে। এটা সর্বজনস্বীকৃত বিষয়। কিন্তু যখন এটাকে ব্যবসায়িক রূপ দেওয়া হয়, যুবক-যুবতীরা খেলার নামে অশ্লীলতা ছড়ায়, কিছু মানুষ এতে আসক্ত হয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট করে, তখন তাতে নিষেধাজ্ঞা চলে আসে।

হাদিসের আলোকে খেলাধুলা : স্বাস্থ্য সুরক্ষা, রণ নৈপুণ্যের প্রয়োজনে তীর নিক্ষেপ, বর্শা চালনা, দৌড় প্রতিযোগিতা ইত্যাদিকে ইসলাম সমর্থন করে। প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘ঘোড়া অথবা তীর নিক্ষেপ কিংবা উটের প্রতিযোগিতা ছাড়া ইসলামে অন্য প্রতিযোগিতা নেই।’ (তিরমিজি : ৫৬৪)। তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি তীর চালনা শেখার পর তা ছেড়ে দেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম : ৭৬৬৮)। অন্য হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমাদের জন্য তীর নিক্ষেপ শিক্ষা করা কর্তব্য। কেননা, এটা তোমাদের জন্য একটি উত্তম খেলা।’ (ফিকহুস সুন্নাহ : ২/৬০)। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত; রাসুল (সা.) হাফইয়া থেকে সানিয়াতুল বিদা পর্যন্ত সীমানার মধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘোড়াসমূহের দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান করেছেন। স্থানদুটির দূরত্ব ছিল ছয় মাইল। (বোখারি : ৩৬৫৭)।

যেসব শর্তসাপেক্ষে খেলাধুলা বৈধ : ইসলাম নির্দিষ্ট কোনো খেলাধুলাকে জায়েজ বা নাজায়েজ বলেনি; বরং ছয়টি শর্তের সঙ্গে জায়েজ-নাজায়েজের সম্পর্ক। তা হলো-

১. ধর্মীয় জরুরি কর্তব্য পালন থেকে উদাসীন না করা : এমন কোনো খেলা বৈধ নয়, যা আল্লাহর কোনো ফরজ বিধান পালনের কথা দিব্যি ভুলিয়ে দেয়। যেমন- কোনো ফরজ নামাজের সময় খেলাধুলা করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কিছু লোক রয়েছে, যারা অজ্ঞতাবশত বাজে কথা খরিদ করে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য এবং সত্য পথকে তারা বিদ্রুপ করে। তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।’ (সুরা লোকমান : ৬)। আলোচ্য আয়াতটি খেলাধুলা ও অনর্থক কাজের নিন্দায় সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য। (তাফসিরে রুহুল মাআনি : ৫৬৪৪)।

২. শরিয়তের মহৎ লক্ষ্যের প্রতি খেয়াল রাখা : পৃথিবীতে আমাদের জীবন লক্ষ্যহীন নয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি জিন ও মানবজাতিকে শুধু ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা জারিয়াত : ৫৬)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন- তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে কে উত্তম।’ (সুরা মুলক : ২)। তাই যে খেলার কারণে মোমিনের ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটে, তা জায়েজ।

৩. সতর আবৃত থাকা এবং যৌন সুড়সুড়িদায়ক না হওয়া : সতর ঢাকা ওয়াজিব। অথচ অনেক খেলায় পুরুষের সতর খোলা থাকে। সাঁতার খেলা, সার্ফ ইত্যাদি খেলায় প্রায় উলঙ্গ হতে হয়। অথচ আলী (রা.) সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুমি নিজের উরু খুলো না। কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির উরুর দিকে দৃষ্টি দিও না।’ (সুনানে আবি দাউদ : ৪০১৭)।

৪. জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ না হওয়া : খেলার জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলা বা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার অনুমতি ইসলামে নেই। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।’ (সুরা বাকারা : ১৯৫)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ইসলামে কারোর ক্ষতি করা নেই, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও নেই।’ (মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক : ২৭৫৬; সুনানে দারা কুতনি : ৪৫৯৫)।

৫. হারাম উপার্জনমুক্ত হওয়া : খেলাধুলায় জুয়া ও বাজি ধরা হলে তা বৈধ নয়। কিন্তু আজকাল আন্তর্জাতিক খেলাধুলায় জুয়া ও বাজিকে কেন্দ্র করে নানা অনভিপ্রেত ঘটনার উদ্ভব প্রায়ই ঘটতে দেখা যায়। অথচ আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মোমিনগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরগুলো তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর। যেন সফলকাম হও। শয়তান শুধু মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায়। আর চায় আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে তোমাদেরকে বাঁধা দিতে। তাই তোমরা কি বিরত হবে না?’ (সুরা মায়িদা : ৯০-৯১)।

৬. প্রতিযোগিতার জয়-পরাজয়ে শত্রুতাণ্ডমিত্রতা সৃষ্টি না হওয়া : ভালো খেলার কারণে অতি ভক্তি বা খারাপ খেলার কারণে অতি অভক্তি কোনোটাই ইসলামে কাম্য নয়। ইসলামে শত্রুতাণ্ডমিত্রতার মাপকাঠি শুধু আল্লাহর ভালোবাসা। আবু উমামা (রা.) সূত্রে বর্ণিত আছে; রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে কাউকে আল্লাহর জন্যই ভালোবাসে ও আল্লাহর জন্যই ঘৃণা করে এবং কাউকে কিছু দিয়ে থাকে আল্লাহর জন্যই ও কাউকে কিছু দেওয়া থেকে বিরত থাকেও আল্লাহরই জন্য, তাহলে তার ঈমান পরিপূর্ণ হলো।’ (সুনানে আবি দাউদ : ৪৬৮১)।

আধুনিক খেলাধুলা ও ইসলাম : এসব শর্তে খেলাধুলার বৈধতা দেওয়া হলেও বর্তমানে প্রচলিত খেলাধুলায় ইসলামি মূল্যবোধের প্রতিফলন প্রায়ই পরিলক্ষিত হয় না। এসব খেলার মধ্যে জীবনের ঝুঁকি, নামাজের প্রতি অবহেলা, অন্য ধর্মের অনুসরণ, সময় ও অর্থের অপচয়, জুয়া-বাজি ধরা, রঙখেলা, গ্যালারিতে উদ্দাম নৃত্য-গান, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, উল্কি আঁকা ইত্যাদির বাহুল্য থাকে। তাই এসব খেলাধুলা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম। কারণ, আধুনিককালে খেলাধুলার নানা শাখা-প্রশাখার বিস্তৃতি ঘটেছে। খেলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আনুষঙ্গিক বহু বিষয়। খেলার বৈধতাণ্ডঅবৈধতার ক্ষেত্রে এসব বিষয়ও বিবেচ্য। যেমন- এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব খেলার প্রাণ দর্শক-শ্রোতা। দর্শকরাই খেলাধুলার মাধ্যমে আয়ের প্রধান উৎস। এসব দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম খেলার বল্গাহীন স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। তবে সুস্থ সুন্দর ও শরিয়তের সীমায় থেকে খেলাধুলায় উদ্বুদ্ধ করেছে ইসলাম।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক, প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যমকর্মী

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত