ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

‘হাসিনার গুম ছিল ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখার রাষ্ট্রীয় কৌশল’

‘হাসিনার গুম ছিল ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখার রাষ্ট্রীয় কৌশল’

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছত্রছায়ায় পরিচালিত গুম-ব্যবস্থা জনসমাজে একটি বার্তা ছড়িয়ে দেয়, রাষ্ট্র চাইলে কাউকে সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য করে দিতে পারে। শেখ হাসিনার রাষ্ট্রকল্পে গুমের কৌশল মানুষকে শুধু দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়নি; অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর নির্যাতনের মাধ্যমে শরীরকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু বা চিরতরে অক্ষম করে দিয়েছে। গুম ছিল ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখার রাষ্ট্রীয় কৌশল।

গত বুধবার আওয়ামী লীগের শাসনামলে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সূচনা বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এমন মন্তব্য করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুমের ক্ষেত্রে কয়েকটি নিরাপত্তা বাহিনীর একদল সদস্য মার্সেনারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তাজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, বিরোধী চিন্তার মানুষদের গুম করে তিলে তিলে অক্ষম করে দেওয়ার মাধ্যমে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকল্পের উগ্র বাসনা বাস্তবায়িত হয়েছে। এতে খোদ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যেই যে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা নজিরবিহীন।

এ মামলায় আসামি করা হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে।

ওইদিন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেলে তিনি এসব কথা বলেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এর আগে গত ২২ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়।

তাজুল ইসলাম বলেন, মানুষ হিসেবে মানুষের যে ন্যূনতম মর্যাদা থাকে, বলপূর্বক গুম সেই মর্যাদাকে সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ করে দেয়। এ কারণেই আন্তর্জাতিক আইনে বলপূর্বক গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কারণ এটি একযোগে জীবনের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার এবং সর্বোপরি মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি ও মর্যাদা পাওয়ার অধিকার হরণ করে।

তিনি বলেন, আজ আমরা গুমের যে মামলার বিচার শুরু করছি, সেগুলো শুধু কিছু ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ছিল না। এগুলো ছিল নির্মম আওয়ামী ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রীয় শাসন পদ্ধতির কৌশলের সাক্ষ্য। যে কৌশল স্রেফ গোপনে হত্যা করে লাশ গোপন করেনি, বরং জ্যান্ত লাশ বানিয়ে অক্ষম করে রেখেছিল বিরোধী মতের হাজার হাজার মানুষকে।

‘নীরব, আলো-বাতাসহীন অন্ধকার কুঠরিতে হাত-পা বেঁধে মাসের পর মাস বিনা বিচারে বন্দিদের আটকে রাখার এই কৌশল সমাজে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছিল। এই ক্ষত শুধু রাজনৈতিক জনপরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং জনগণের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসমূহ বিদ্যমান ছিল, সেই বাহিনীগুলোর কাঠামোর মধ্যেও গভীরভাবে প্রবেশ করেছিল।’

গুমের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাসের কোনো পর্বেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বলপূর্বক গুমের মতো নৃশংস অপরাধের সঙ্গে পরিচিত ছিল না। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার শাসনকালেই জনগণ এই নিষ্ঠুর, পরিকল্পিত শাসনপ্রযুক্তির মুখোমুখি হয়।

তিনি জানান, এই অপরাধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি শুধু ভুক্তভোগীকেই নয়, পুরো সমাজকে শাস্তি দেয়। একজন মানুষ গুম হলে, তার পরিবার প্রতিদিন বিচারহীনতার কারাগারে বন্দি থাকে। বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন এমনকি প্রতিবেশীরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকতে শেখে। এই অনিশ্চয়তাই গুমের রাজনৈতিক কার্যকারিতা। এটি ভয় উৎপাদন করে, নীরবতা সৃষ্টি করে এবং প্রতিরোধকে ভেঙে দেয়। এর মধ্য দিয়েই টিকে থাকে ফ্যাসিবাদী শাসন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত