
চীন সফর শেষে ইরান ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় শুক্রবার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে দেশে ফেরেন ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙতে ট্রাম্প যদি সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বিমান হামলা শুরু করার পরিকল্পনা করছেন তার শীর্ষ উপদেষ্টারা।
এদিকে, বিভিন্ন দেশ কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগে ট্রাম্প একটি রাজনৈতিক সাফল্য দাবি করতে পারেন। তবে এ বিষয়ে ট্রাম্প এখনো কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।
বেইজিং সফর শেষে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমি প্রস্তাবটি দেখেছি। প্রথম বাক্যটাই যদি আমার পছন্দ না হয়, তাহলে আমি সেটি সরাসরি ফেলে দিই।’ তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বুধবার চীন সফরে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তিনি দুদিনে দুই দফার বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন দুই বিশ্ব নেতা।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবৈধ’ দাবির বিরুদ্ধে দুনিয়াকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান ইরান প্রেসিডেন্টের: যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবৈধ’ ও অন্যায্য দাবিগুলোর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। পোপ লিও চতুর্দশের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি এই আহ্বান জানান।
চিঠিতে পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেন, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের ফলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি, বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্ব এবং ৩ হাজার ৪৬৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডকে ‘স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।
পোপের কাছে পাঠানো চিঠিতে অহংকার ও দম্ভের নিন্দা জানিয়ে পবিত্র কুরআন এবং বাইবেলের বাণী উদ্ধৃত করেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। মিথ্যা অজুহাতে আলোচনা চলাকালীন এই হামলার বিষয়ে পোপের ‘নৈতিক, যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত’ অবস্থানের প্রশংসাও করেন তিনি। পেজেশকিয়ান বলেন, ‘ইরানের ঐতিহাসিক সভ্যতাকে ধ্বংস করার’ যে ঘোষণা মার্কিন প্রেসিডেন্ট দিয়েছেন, তা আসলে তাদের একচ্ছত্র ক্ষমতার মোহ ও দৃষ্টিভ্রমেরই বহিঃপ্রকাশ।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে আসছে এবং ইরান কখনো তার প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়নি। তবে পারস্য উপসাগরীয় উপকূলীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। ফলে আত্মরক্ষার বৈধ অধিকার থেকেই ইরানি বাহিনী সেখানে আগ্রাসনকারীদের স্বার্থের ওপর পাল্টা আঘাত হানতে বাধ্য হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, সেখানকার চলমান নিরাপত্তাহীনতার মূল কারণ মার্কিন অবৈধ হামলা এবং নৌ-অবরোধ। এই নিরাপত্তাহীনতা দূর হলেই আন্তর্জাতিক আইন মেনে স্বাভাবিক নৌযান চলাচল আবার শুরু হবে।
যুক্তরাষ্ট্র বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করা সত্ত্বেও ইরান এখনো কূটনীতি এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে পুনর্ব্যক্ত করেন পেজেশকিয়ান। তিনি লেখেন, মার্কিন সরকারের অবৈধ দাবির বিরুদ্ধে ইরানের অবস্থান আসলে আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষারই শামিল। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বিষয়ে বাস্তবসম্মত ও ন্যায়সংগত সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানান। বিবাদের শান্তিপূর্ণ, আইনি ও নৈতিক সমাধানের প্রতি ইরানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে চিঠি শেষ করেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান।
হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানি দ্বিগুণ করতে পাইপলাইন নির্মাণ করছে আমিরাত:
হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে তেল রপ্তানি ক্ষমতা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০২৭ সালের মধ্যে নতুন এই পাইপলাইনটি চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
গত শুক্রবার দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি এডনক এক বিবৃতিতে জানায়, গালফ অব ওমানের ফুজাইরাহ বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত একটি পাইপলাইন দ্রুতগতিতে নির্মাণ করা হচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এক বৈঠকে এ প্রকল্পের ঘোষণা দেন। নতুন পাইপলাইনটি আগে থেকেই নির্মাণাধীন রয়েছে।
বর্তমানে ইউএইর হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ১.৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব। নতুন পাইপলাইন যুক্ত হলে দেশটির রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউএই আগে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে দৈনিক প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করত। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এই পথ এড়িয়ে বিকল্প রুট ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে দেশটি।
নতুন পাইপলাইন চালু হলে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার না করেও প্রায় পুরো আগের সক্ষমতা অনুযায়ী তেল রপ্তানি করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউএই ২০২৭ সালের মধ্যে দৈনিক প্রায় ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
ইরান–গালফ অঞ্চলের উত্তেজনার কারণে এই পাইপলাইন প্রকল্পকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অতীতে সংঘাতের সময় ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়েছে এবং কিছু স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরি করা মধ্যপ্রাচ্যের তেল বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একই ধরনের কৌশল ইতোমধ্যে সৌদি আরবও গ্রহণ করেছে, যার মাধ্যমে তারা রেড সি রুট ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি করছে।