
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি (এএ) ও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর আয়েয়ারওয়াদি অঞ্চলের দিকে অগ্রযাত্রাকে ঘিরে নতুন করে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। ইয়েগি ও থাবাউং টাউনশিপের সীমান্তে, রাখাইন ইয়োমা পর্বতমালার পাদদেশে প্রতিরক্ষাব্যূহ গড়ে তুলছে জান্তা বাহিনী। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সেখানে প্রতিদিনই তীব্র যুদ্ধ চলছে এবং উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।
থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতীর খবরে বলা হয়েছে, ইয়েগির একটি সূত্র জানিয়েছে- প্রতিদিন সংঘর্ষ হচ্ছে এবং প্রতিটি সংঘর্ষই অত্যন্ত তীব্র। তার ভাষ্য, সামরিক বাহিনী ধারাবাহিকভাবে অতিরিক্ত সেনা পাঠাচ্ছে। কিছু এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়ে সেখানে কামান মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েগি-থাবাউং সীমান্তসংলগ্ন কয়েকটি গ্রামের চারপাশে সেনাবাহিনী নতুন করে প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে তুলেছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে আর্টিলারি বসানো হয়েছে। শক্তিবৃদ্ধির অংশ হিসেবে পাতেইনভিত্তিক ওয়েস্টার্ন কমান্ড এবং কিয়োনপিয়াওভিত্তিক ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন-৩৬ থেকে সৈন্য ও সামরিক যান পাঠানো হচ্ছে।
থাবাউংয়ের এক বাসিন্দা বলেন, সেনাবাহিনী লাগাতার অতিরিক্ত বাহিনী পাঠাচ্ছে। সৈন্য ও অস্ত্রবোঝাই ট্রাক নিয়মিত যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দিনে ১০টি পর্যন্ত ট্রাক যেতে দেখা গেছে।
২০ জুন এএ ওয়ারহতাউকউইন এলাকার একটি পাহাড়চূড়ার সামরিক ঘাঁটি দখল করার পর সেনাবাহিনী ওই অঞ্চলে পিছু হটে নতুন প্রতিরক্ষা অবস্থান নেয়। এএ-ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দাবি করেছে, ওই ঘাঁটি দখলের সময় এক ডজনের বেশি জান্তা সেনা নিহত হয়। একই সঙ্গে অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম, জেনারেটর এবং স্টারলিংক ডিভাইসও জব্দ করা হয়েছে।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে ইয়েগি টাউনশিপে সামরিক বাহিনীর আর্টিলারি ব্যাটালিয়ন-৩৪৪-এর আশপাশের একাধিক সামরিক চৌকি দখলের পর থেকেই আয়েয়ারওয়াদিতে এএর অভিযান আরও গতি পেয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাটালিয়ন-৩৪৪-এর চারপাশের ঘাঁটিগুলো একে একে ছেড়ে দেয় জান্তা বাহিনী। পরে তারা ইয়েগি-থাবাউং সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান পুনর্গঠন করে। পাহাড়চূড়ার ঘাঁটি হারানোর পর থেকে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়েছে। স্থানীয় প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর দাবি, আয়েয়ারওয়াদি অঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনী মূলত সদ্য মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষ করা বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের পাঠাচ্ছে।
মে মাস থেকে এএ নেতৃত্বাধীন বাহিনী আর্টিলারি ব্যাটালিয়ন-৩৪৪-এর আশপাশে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত তারা অন্তত ছয়টি সামরিক চৌকি দখল করেছে। একই সঙ্গে গ্যারিসন থেকে দুই কিলোমিটারের ভেতরে থাকা অবস্থানগুলোতেও হামলা অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে পাতেইন নদীপথে সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে জান্তা বাহিনী নৌযান মোতায়েন করেছে। একই সময়ে যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। লেমিয়েথনার এক বাসিন্দা বলেন, আগে নদীতে কয়েকটি নৌযান দেখা যেত, কিন্তু এখন পুরো নদীপথজুড়ে সামরিক নৌযান অবস্থান করছে।
বর্তমানে এএ রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী চিন রাজ্যের পালেতওয়া এলাকাও তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। একই সঙ্গে তারা রাখাইনের রাজধানী সিত্তে এবং বন্দরনগরী কিয়াউকফিউ ঘিরে রেখেছে। কিয়াউকফিউ চীনের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকেন্দ্রগুলোর একটি।
একই সময়ে স্থানীয় পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসের (পিডিএফ) সঙ্গে সমন্বয় করে এএ পূর্ব দিকে আয়েয়ারওয়াদি, মাগওয়ে ও বাগো অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে রাখাইনে পাল্টা সামরিক অভিযান চালানোর সুযোগ থেকে জান্তা বাহিনীকে দূরে রাখা।
অন্যদিকে জান্তা বাহিনী রাখাইনে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নির্বিচার বিমান হামলা বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে। আয়েয়ারওয়াদিতে বর্তমানে লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে লেমিয়েথনা, ইয়েগি ও থাবাউং টাউনশিপ। রাখাইন সীমান্তঘেঁষা এসব এলাকায় গত বছর থেকে হাজারো বেসামরিক মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে।