
ইরান যুদ্ধ নিয়ে নিজের রিপাবলিকান দলের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই বৈঠকের পরপরই যুদ্ধের খরচ মেটাতে কংগ্রেসের কাছে আরও কয়েক হাজার কোটি ডলার দাবি করেছে তার প্রশাসন। রয়টার্স জানিয়েছে, গত বুধবার ওয়াশিংটনে এই উত্তপ্ত বাদানুবাদের ঘটনা ঘটে।
বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্য জানান, সেনেটর বিল ক্যাসিডির সঙ্গে ট্রাম্পের তীব্র চেঁচামেচি ও বাগবিতণ্ডা হয়।
ক্যাসিডি বলেন, গত সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে ট্রাম্প যে রূপরেখা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, তা নিয়ে প্রশাসনের ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। কারণ এই চুক্তিতে ইরানকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
ক্যাসিডি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের যা জানানো হচ্ছে, মার্কিন জনগণের তার চেয়ে বেশি কিছু জানা দরকার। আমাদের যা বলা হয়েছিল, যুদ্ধ যেভাবে চলার কথা, পরিস্থিতি সেভাবে চলছে বলে মনে হচ্ছে না।’
পরবর্তীতে প্রেসিডেন্টকে সন্তুষ্ট করার প্রচেষ্টায় রিপাবলিকান সেনেট নেতারা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের একটি প্রস্তাব আটকে দিতে গভীর রাতে ভোটাভুটির আয়োজন করেন। মে মাসে পাস হওয়া যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত ওই প্রস্তাবটি ৫০-৪৭ ভোটে আটকে দেয় সেনেট।
ভোটের পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেন, ‘এই ভোট ইরানকে সতর্ক বার্তা দিল।’ তবে এই ভোট আগের সিদ্ধান্তের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। আগামী নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের ওপর বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও জরিপ সংস্থা ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন সর্বনিম্ন স্তরে রয়েছে আর মাত্র ২৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন এই যুদ্ধের পেছনে হওয়া ব্যয় যুক্তিযুক্ত ছিল।
এই উত্তপ্ত বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কাছে যুদ্ধের খরচ বাবদ অতিরিক্ত ৭ হাজার কোটি ডলার দাবি করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ৮৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের সামরিক বাজেটকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
ওয়াশিংটনে রিপাবলিকান দলের সিনেটের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে সেনেটর বিল ক্যাসিডির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র চেঁচামেচি ও বাগবিতণ্ডা হয়। বুধবার রাতের ভোটাভুটিতে ক্যাসিডি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন। অন্যদিকে কেনটাকির রিপাবলিকান সেনেটর র্যান্ড পল ভোটদানে বিরত থাকেন।
মেইন প্রদেশের সুসান কলিন্স এবং আলাস্কার লিসা মুরকোভস্কি নামের দুই রিপাবলিকান সেনেটর ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেন। পেনসিলভানিয়ার জন ফেটারম্যান ছিলেন একমাত্র ডেমোক্র্যাট, যিনি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন। মিচ ম্যাককনেল এবং মাইকেল বেনেট ভোট দেননি।
পরবর্তীতে বুধবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে ক্যাসিডি জানান, বিকালে ইরান ইস্যুতে বিস্তারিত ব্রিফিংয়ের জন্য তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউজের এই দ্রুত সাড়া দেওয়াকে তিনি স্বাগত জানান।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রাথমিক চুক্তির পর হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে ইরানের অবরোধ উঠে যাওয়ায় তেলের দাম যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে।
তবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে তেহরানের নির্ধারিত রুট মেনে চলার জন্য সতর্ক করেছে। ইরানকে না জানিয়ে ওমানের তৈরি করা নতুন নৌপথকে তারা ‘অগ্রহণযোগ্য ও বিপজ্জনক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আইআরজিসি সামুদ্রিক চ্যানেল ১৬-এর মাধ্যমে তাদের নৌবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে জাহাজগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে এবং নিয়ম লঙ্ঘন করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধের আগে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিবাহিত হতো।
সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে থেকে মুসলিম দেশগুলোর শিক্ষা নেওয়া উচিত : আজারবাইজানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সাহেবে গাফারোভা ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য অনিবার্য বলে উল্লেখ করে ইরানের সংসদের স্পিকার বলেছেন: সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে মুসলিম দেশগুলোর শিক্ষা নেওয়া উচিত।
ইরনাকে উদ্ধৃত করে পার্সটুডে জানিয়েছে, মুসলিম দেশগুলোর সংসদীয় ইউনিয়নের (পিইউআইসি) ২০তম অধিবেশনের অবকাশে আজারবাইজানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সাহেবে গাফারোভা ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
এই বৈঠকে কলিবফ মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য অনিবার্য বলে উল্লেখ করে আরও বলেন: সৌভাগ্যবশত, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে এবং আমি আশা করি এই ধারা আরও জোরদার হতে থাকবে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের কিছু দেশের ভূমি ও আকাশসীমা ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন: এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এখন সবার চোখের সামনে এবং সবারই তা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।
সংসদীয় অঙ্গনে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে কলিবফ ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার সংসদীয় পরিষদ ইউনিয়নের (পিইউআইসি) সম্মেলন আয়োজনে আজারবাইজান প্রজাতন্ত্রের সাফল্য কামনা করেন।
আজারবাইজান প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংসদের স্পিকার সাহেব গাফারোভা এই বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন এবং সংসদীয় সম্পর্ক বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমরা আজারবাইজান প্রজাতন্ত্রের ভূমিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর, বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেব না।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহযোগিতা করার জন্য ন্যাটোকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে : ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধে যেকোনো ধরনের সহযোগিতার জন্য ন্যাটো এবং এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে, যার মধ্যে ইতালি ও রোমানিয়াও রয়েছে, অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। ন্যাটোর মহাসচিব ইরানের বিরুদ্ধে অবৈধ ও অপরাধমূলক হামলা চালানোর ক্ষেত্রে এই দেশগুলোর ভূমিকার কথা স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে পার্সটুডে জানিয়েছে; ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের দুটি দেশের ভূমিকা থাকার ব্যাপারে ন্যাটোর মহাসচিবের স্বীকারোক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। ইসমাইল বাকায়ি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে ব্যাপকভাবে অবদান রাখা দুটি দেশ হিসেবে ইতালি ও রোমানিয়ার নাম উল্লেখ করার কথা উল্লেখ করে এক্স নেটওয়ার্কে লিখেছেন : ‘ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী হামলা চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে ন্যাটোর মহাসচিবের এই সুস্পষ্ট স্বীকারোক্তি হলো জাতিসংঘের সদস্য একটি স্বাধীন দেশের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন চালানোর ক্ষেত্রে এই সংস্থার সক্রিয় সহযোগিতারই প্রমাণ। এই আগ্রাসন ছিল আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিমালার চরম লঙ্ঘন।’
তিনি আরও বলেন, ন্যাটো এবং এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণকারী এর প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে এই আগ্রাসী যুদ্ধের সমস্ত পরিণতির জন্য অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
ইসমাইল বাকায়ি বলেন: ন্যাটোর মহাসচিব স্পষ্টভাবে ইতালি এবং রোমানিয়াকে সেই দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন যারা ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক আগ্রাসনে সহযোগিতা করেছে। এই দুটি দেশ এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনে সহায়তাকারী অন্য প্রতিটি ইউরোপীয় দেশকে তাদের জনমত এবং সমগ্র বিশ্বের কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে যে, কেন তারা ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকারীদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং কেন তারা ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে জঘন্য ও ব্যাপক অপরাধ সংঘটনে অংশ নিয়েছিল।