
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নতুন এক চাপের মুখে পড়েছে। গত ৩ বছরে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছে গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। একই সঙ্গে আরও অনেক কারখানা ঝুঁকিতে রয়েছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, অর্ডার কমে যাওয়া, জ্বালানি সংকট, অর্থায়ন ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারের চাপ- সব মিলিয়ে রপ্তানিমুখী এই শিল্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই খাত দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি যোগান দেয়। ফলে কারখানা বন্ধ হওয়া শুধু মালিকদের ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়; এটি কর্মসংস্থান, ব্যাংক ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
বিজিএমইএ’র বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও দেশীয় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চলতি অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে গড় ইউনিট প্রাইস কমেছে ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং কাঁচামাল আমদানির ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা কমেছে ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সংগঠনটির মতে, এই চাপের ফলেই গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যা এক জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিক মজুরি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়েছে; কিন্তু বিদেশি ক্রেতারা সেই অনুপাতে উৎপাদন খরচ বা সিএম বাড়াচ্ছে না। সরকারি গেজেট অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নতুন কাঠামোয় পোশাক খাতের এন্ট্রি-লেভেল শ্রমিকের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের কাঠামোর তুলনায় বড় বৃদ্ধি। ফলে শ্রম ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু ক্রেতার দামে সেই চাপ পুরোপুরি প্রতিফলিত হচ্ছে না।
এর সঙ্গে জ্বালানি সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজিএমইএ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু কারখানার খরচ বাড়ে না; সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পারলে ক্রেতার আস্থা কমে, ডিসকাউন্ট দিতে হয়, কখনও আকাশপথে পণ্য পাঠিয়ে বাড়তি খরচ বহন করতে হয়।
লোডশেডিংও খাতটির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছে, কিছু এলাকায় লোডশেডিং ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত যাচ্ছে। এতে উৎপাদন সময়সূচি ভেঙে পড়ছে এবং রপ্তানি পণ্য সময়মতো পাঠানো কঠিন হচ্ছে। কারখানা বন্ধের প্রভাব সবচেয়ে সরাসরি পড়ে শ্রমিকদের ওপর। একটি কারখানা বন্ধ মানে শুধু একটি ব্যবসা থেমে যাওয়া নয়; অনেক পরিবারের মাসিক আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে ব্যাংকের ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। কোনো কারখানা যদি ঋণ নিয়ে উৎপাদনে থাকে, কিন্তু অর্ডার সংকট, জ্বালানি ঘাটতি বা লোকসানের কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সেই ঋণ ব্যাংকিং খাতের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে বিজিএমইএ কারখানা বন্ধ হওয়াকে পুরোপুরি অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছে না। সংগঠনটির বক্তব্য, আর্থিক অক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা অদক্ষতা, বৈশ্বিক বাজারের চাপ, অভ্যন্তরীণ ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং সুবিধা কমে যাওয়া এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি—সব মিলিয়ে কিছু কারখানা স্বাভাবিকভাবেই বাজার থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু একই সময়ে প্রায় ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া খাতের সামগ্রিক চাপের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। এই সংকট সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বন্ধ কারখানা ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য রাখা হয়েছে। প্যাকেজটিতে রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে শুধু ঋণ সহায়তা দিলেই পোশাক খাতের সংকট কাটবে না। উদ্যোক্তারা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, ব্যাংক ঋণের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে আনা, কাস্টমস ও শিপমেন্ট প্রক্রিয়া সহজ করা, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী করা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট জরুরি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত একসময় কম খরচে উৎপাদনের সুবিধায় বড় হয়েছে। কিন্তু এখন প্রতিযোগিতা বদলেছে। শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে বাজার ধরে রাখা কঠিন। সময়মতো শিপমেন্ট, জ্বালানির নিশ্চয়তা, উৎপাদন দক্ষতা, ক্রেতার আস্থা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা- এসবই এখন টিকে থাকার শর্ত।