
প্রাচীনকাল থেকেই যে আম দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জকে চেনা যায়, সেই আমের রাজধানী চাঁপাইনবাগঞ্জের ‘আম অর্থনীতি’ এখন বেশ চাঙা। বছরজুড়েই আমকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চললেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাণিজ্য চলবে আরও দেড় মাস। চলতি মৌসুমের শুরুতে গাছে গাছে ব্যাপক মুকুল থেকে এখন বাম্পার ফলন হওয়ায় গোটা চাঁপাইনবাবগঞ্জই আম নিয়ে সরগরম অবস্থা বিরাজ করছে। ফলে এখন মহাব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন, এখানকার আম চাষী থেকে শুরু করে আম ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা।
হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থানসহ ব্যাবসায়ী ও পর্যটকদের পদচারণায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলছে আমের মহোৎসব। চলতি মৌসুমে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার আমের ব্যবসা হবে আশা করা হচ্ছে।
মাটি, আবহাওয়া ও প্রকৃতিগত কারণেই ভালো সুস্বাদু ও রসালো আম উৎপাদনের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের খ্যাতি সেই প্রাচীনকাল থেকেই। দেশ বিভাগের আগে এই খ্যাতি ভারতের মালদহ জেলার থাকলে পরে তা চলে আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঘরে। সুস্বাদু জাতের আম উৎপাদন করে ভালো লাভ হওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষকরাও দিন দিন আম চাষে আগ্রহী হয়ে বাড়াতে শুরু করেন আম বাগানের পরিমাণ। তবে, গত ২ বছর ১০০ হেক্টরের বেশি আম বাগানের পরিমাণ কমলেও বিগত ১ দশকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম বাগান বৃদ্ধি পেয়েছে রেকর্ড পরিমানে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০০৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম বাগানের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৬৫০ হেক্টর । ২০০৬ সালে ১০০ হেক্টর বৃদ্ধি পেয়ে বাগানের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৭৫০ হেক্টর। আর এখন (২০২৬ সালে) আম বাগানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর। অর্থাৎ ১০ বছরে বাগানের পরিমাণ বেড়েছে ২০ হাজার ৭৩৭ হেক্টর। চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৯২ লাখ আম গাছ থেকে আম উৎপাদিত হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রকৃতিগতভাবেই আমের উৎপাদনের বছর দু’ভাগে ভাগ হয়ে আসছে সুদীর্ঘকাল থেকে। এক বছর বেশি ফলন হলে পরের বছর কম ফলন হয় প্রাকৃতিকভাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছর গুলোতে এই ধারা দেখা যায় না। প্রতি বছরেই কম বেশি ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বেশ কয়েকটি পক্ষ। মৌসুম শুরুর ২-৩ মাস আগে থেকেই আরাম্ভ হয় বাগান কেনাবেচা। কেউ কেউ মুকুল আসার আগেই বাগান কিনে থাকেন। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয়ে থাকে পাতায় বাগান কেনা। পরে কেনাবেচার স্তরগুলো থাকে মুকুল আসাবস্থায়, আমের গুটি ধরা ও বড় হওয়ার সময়। সম্প্রতিক বছর গুলোয় আম ব্যবসায়ীরা বাগান কেনার ধরন পরিবর্তন করেছেন। ১ বছরের জন্য বাগান কিনে লোকসানের ঝুঁকি থাকায় তারা এখন একই বাগান একই মালিক ৩ বছর থেকে শুরু করে ৫-৬ বছর পর্যন্ত কিনে নিচ্ছেন।
আম বেচাকেনার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪টি প্রধান বাজার রয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলায় সড়কের ধরে ও হাটে আমের বেচাকেনা হয়। ৪টি বড় বাজারে মধ্যে দেশের বড় আমের বাজারটি বসে কানসাটে। বহুকাল আগেই গড়ে উঠেছে এ বাজারটি। জেলা সদর থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়কের কানসাট গোপালনগর মোড় থেকে কলবাড়ী পর্যন্ত সড়কের দু’ধারে প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকায় প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে আমের পাইকারী ও খুচরা কেনা বেচা। কানসাট আম বাজার এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৩ শতাধিক আমের আড়ৎ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের আমের বড় বাজারটি বসে পুরাতন বাজারে। মহানন্দা নদীর তীরে গড়ে উঠা প্রাচীন এই আমের বাজার এখন রমরমা। সদর উপজেলার গোবরাতলা, মহিপুর, বালিয়াডাঙ্গা, বারোঘরিয়া, মাহরাজপুর, কালিনগরসহ শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা আমই এ বাজারের মূল যোগানদাতা। এছাড়াও জেলা সদর থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরের গোমস্তাপুরের রহনপুরে বসে আরেক আমের বাজার। মহানন্দা আর পুর্নভবা নদী পথকে ঘিরে অর্ধ শতাব্দি আগে গড়ে উঠা রহনপুর আম বাজার এখন রমরমাভাব পেয়েছে বাজারকে ঘিরে সড়ক পথ যোগ হওয়ায়। রহনপুর রেল স্টেশনের সামনে এই আমের বাজার বসে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী উপজেলার ভোলাহাটেও বসছে আমের বাজার। এই আম বাজারের আড়ৎগুলো থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা আম কিনে নিয়ে যান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের ধারণা অনুযায়ী চলতি মৌসুমে আমের বাণিজ্য হবে প্রায় ৬-৭ হাজার কোটি টাকা। ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমি থেকে এবছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯০০ মে.টন নির্ধারণ করা হলেও, মাঠের পরিস্থিতি বিবেচনা করে কৃষি বিভাগ আশা করছে এবার উৎপাদন তার বেশি হবে।
আমের কৃষক মুল্যই দাঁড়ায় ৩ হাজার কোটি টাকা। এরসঙ্গে শ্রমিক খরচসহ পরিবহন, ঝুড়ির বাণিজ্য ধরে আশা করা হচ্ছে এবার ৬-৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি ‘আম বাণিজ্য’ হবে। তবে, সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমকে ঘিরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাণিজ্য যুক্ত করা গেলে টাকা অংক বড়াবে কয়েকগুণ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক বলেন, ‘বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ আম চাঁপাইনবাবগঞ্জেই উৎপাদিত হয়। ভোক্তাদের কাছে বিক্রিই বলি, আর রপ্তানিই বলি। আমরা শুধু ফ্রেস আমটাকেই বুঝে থাকি। এর বাইরে ঝড়ে পড়া এবং ঝরে পড়া আমও ব্যাপক। অথচ আমরা জানি, পুরো পৃথিবীতেই আম একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পণ্য। আমকে আমরা শিল্পপণ্য হিসেবে নিতে পারিনি। আমরা আম প্রকিয়াকরণ করছি না। প্রক্রিয়াকরণ করা হলে এখন যে বাজার মূল্য বলা হচ্ছে তা ৩ গুন বেড়ে যাবে। কর্মসংস্থান হবে, কৃষিপণ্যের অন্যান্য ব্যবহারগুলো বাড়বে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতি বড় হবে এবং জিডিপিতে অবদান রাখতে পারব’।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, গত বছর জেলায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হয়েছিল। বর্তমানে বাজারে আমের দাম বেশ ভালোই; তাই সামগ্রিক বেচাকেনা গত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। মৌসুমের আবহাওয়া এখন পর্যন্ত আমের অনুকূলে রয়েছে। বাণিজ্যের এই চাঙা ভাব এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববাজারেও ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছর চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানি হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলতি মৌসুমেও বিদেশে আম পাঠানো শুরু হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।