ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

তিন বছরে তিন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা

তিন বছরে তিন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা

জ্বালানি খাতে তীব্র সংকট চলছে। আমদানিনির্ভর এলএনজি ও গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর গ্যাস সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা জনজীবন, শিল্পকারখানা এবং পরিবহন খাতকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। বৈশ্বিক বাজারদর ও স্থানীয় অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে টার্মিনাল বসানোর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। এ জন্য বিনিয়োগকারীও খোঁজা হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক আলোচনায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে মন্ত্রী এ কথা বলেন। তিনি বলেন, গভীর সমুদ্রে একটি এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে এভাবে আগুন লাগার বিষয়টি সরকার ‘কল্পনাও’ করেনি। ‘এফএসআরওতে আগুন লেগেছে। লাগার পরে থেকে তো আমাদের এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে,’ বলেন তিনি। ওই ঘটনায় ক্ষতি আরও বড় হতে পারত বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, টার্মিনালের পাশে আরেকটি এলএনজিবাহী জাহাজ ছিল। আগুন লাগার পর সেটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া গেছে। তিনি বলেন, দেশে দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। এর একটিতে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। অন্যটি চালু থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিট মেরামতের পর দুটি ইউনিট একসঙ্গে চালু করতে ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে বলে প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন। ফলে ওই সময় গ্যাস সংকট আরও বাড়তে পারে জানিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘এখন শুধু আমার দিন গোনা ছাড়া আর কিছু নাই।’

তবে লোডশেডিং যাতে কম হয় এবং শিল্পে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া যায়, সে ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন জ্বালানিমন্ত্রী। গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে সরকার চার কার্গো এলএনজি কিনেছে বলে জানান মন্ত্রী। টার্মিনাল সচল হলে দ্রুত এসব কার্গো খালাস করে সরবরাহ বাড়ানোর আশা করছেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, গত ৬ মাসে সরকার একটি নতুন এফএসআরইউর অর্ডার দিয়েছে। আরও তিনটি টার্মিনাল স্থাপনে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ‘পায়রা, তারপর মোংলা এবং হিরণ পয়েন্টের এই জায়গাগুলো আমরা স্টাডি করছি এবং ইনভেস্টরদের আমরা ইনভাইট করছি।’

২০২৯ সালের মধ্যে এসব টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্য ধরার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, নতুন টার্মিনাল করলেই গ্যাস সরবরাহ বাড়বে না, সেজন্য সঞ্চালন লাইনও দরকার হবে। চট্টগ্রাম থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত গ্যাস সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নতুন এফএসআরইউ বসালেও বিদ্যমান পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের সুযোগ সীমিত। এ জন্য সমুদ্রের নিচ দিয়ে নতুন পাইপলাইন করে বাখরাবাদ পর্যন্ত নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানেও জোর দেওয়ার কথা বলেন মন্ত্রী। বাপেক্সকে দিয়ে নতুন কূপ খনন শুরু করার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত এ কোম্পানির জন্য আরও দুটি রিগ কেনার অর্ডার দেওয়ার কথা তিনি বলেন। মন্ত্রী বলেন, শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে ভোলার গ্যাস কনটেইনারে করে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেজন্য একটি বেসরকারি কোম্পানিকে ৩০টি কনটেইনার ট্রাকে গ্যাস পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে কনটেইনারে গ্যাস সরবরাহের প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম নিয়ে আলোচনা চলছে। দেশটি জানিয়েছে, বাংলাদেশে কনটেইনার সরবরাহ করতে হলে সেগুলো চীনে তৈরি করে আনতে হবে। এই ব্যবস্থা চালু করা গেলে শিল্পে গ্যাসের চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।

রাতেও বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা

অনুষ্ঠানে জ্বালানিমন্ত্রী দেশে বিদ্যুতের চাহিদার ‘ধরন’ বদলে যাওয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, আগে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকত। এখন মধ্যরাতেও চাহিদা বেশি থাকে। আগের দিন রাত ১২টার দিকে দেশে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল জানিয়ে এর কারণ হিসেবে রাতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়ার প্রবণতার কথা বলেন মন্ত্রী। এসব বাহনকে ‘গরিবের টেসলা’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাতে চার্জে বসে। এসব চার্জিংয়ের বড় অংশ অবৈধ সংযোগে চলে।’ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের বাধা ও হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন ইকবাল হাসান মাহমুদ।

ব্যবসায়ীদের ‘কষ্ট’

আলোচনায় শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বাড়তি ডিজেল খরচ এবং ব্যাংকঋণের চাপের কথা তুলে ধরেন। জবাবে মন্ত্রী বলেন, তিনি নিজেও একসময় শিল্পোদ্যোক্তা ছিলেন। তাই কারখানা বন্ধ থাকলেও ব্যাংকঋণের সুদ, শ্রমিকের বেতন ও অন্যান্য খরচ চালিয়ে যাওয়ার চাপ তিনি বোঝেন। ‘আমি তো আপনাদেরই একজন। আপনাদের কষ্টটা আমার চেয়ে বেশি কে বোঝে?’ কারখানা বন্ধ থাকলেও ব্যাংকঋণের সুদ যে বন্ধ থাকে না এবং শ্রমিকের যে বেতন দিতে হয়, সে কথা স্বীকার করে ব্যবসায়ীদের প্রতি সহমর্মিতা দেখান জ্বালানি মন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে তিনবার বৈঠক করেছেন। শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। মন্ত্রী বলেন, ‘ইন্ডাস্ট্রি যদি না চলে, তাহলে আমার ইকোনমির গ্রোথ হবে কই থেকে?’ তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী আগামী সংসদ অধিবেশনে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরবেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত