ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কেরানীগঞ্জের পর সাভারেও ব্যর্থ, নব্য জেএমবির বড় হামলার ছক!

কেরানীগঞ্জের পর সাভারেও ব্যর্থ, নব্য জেএমবির বড় হামলার ছক!

ঢাকার সাভারে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্যরা বোমা তৈরির শক্তিশালী ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিল বলে জানিয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট। (সিটিটিসি)। এ ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলার প্রস্তুতি, নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যপদগ্রহণ ও সংগঠনটির আদর্শ-সত্তাকে সমর্থনের অভিযোগে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ছয় থেকে সাতজনকে আসামি করা হয়েছে।

গত ১২ আগস্ট সাভার মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাটি করা হয়। মামলার বাদী সিটিটিসির উপ-পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. আলমগীর হোসেন।

সিটিটিসির এডিসি (ইনভেস্টিগেশন) মাঈন উদ্দীন চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একাধিক ধারা উল্লেখ রয়েছে।

মামলায় আসামিরা হলেন- মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান, মো. নাজমুল হাসান মামুন, মো. আক্কাস আলী, কামাল হোসেন ডাক্তার, বাক্মী ও রাকিব। এর বাইরে অজ্ঞাতনামা আরও ৬ থেকে ৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে জিজ্ঞাসাবাদে বোমা তৈরির ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। নব্য জেএমবির সদস্য নাজমুল হাসান মামুন ওরফে বোমারু মামুন বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কেরানীগঞ্জে একটি আস্তানা গড়ে তোলার পর সাভারে বোমা তৈরির জন্য শক্তিশালী ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, কেরানীগঞ্জে অসাবধানতাবশত বোমা বিস্ফোরণের পর সাভারে আস্তানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। সেখানে বোমা তৈরি করে অন্য কোথাও হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল বলে আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে নিরাপদে থাকার জন্য সাভারের ওই বাসায় বিভিন্ন সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছিল। প্রেসার কুকার, পাইপসহ বোমা তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন সামগ্রী সেখানে রাখা হয়েছিল।

নব্য জেএমবির আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে প্রজাতন্ত্রের সম্পত্তির ক্ষতি সাধনের লক্ষ্যে দেশকে অস্থিতিশীল করে, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা গ্রহণের উদ্দেশ্যে একসঙ্গে মিলিত হয়েছিল আসামিরা। - মামলার এজাহার

পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, নাজমুল হাসান মামুন ওরফে বোমারু মামুন সাভারের ওই বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করলেও সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন না। এ কারণে সাভার ও আশপাশের এলাকায় আরও কোনো আস্তানা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিটিটিসি সূত্রের দাবি, সম্প্রতি পুলিশের গাড়িতে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন নাজমুল হাসান মামুন ওরফে বোমারু মামুন। ওই হুমকি বাস্তবায়নে কোথায়, কখন এবং কী ধরনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল এসব বিষয়ে গ্রেপ্তার আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

তবে মামুনের সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে আরিফ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করছে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা। হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঠিক আগে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের জানানো হতো বলেও প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।

এজাহার সূত্রে জানা গেছে, নব্য জেএমবির আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে প্রজাতন্ত্রের সম্পত্তির ক্ষতি সাধনের লক্ষ্যে দেশকে অস্থিতিশীল করে, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা গ্রহণের উদ্দেশ্যে একসঙ্গে মিলিত হয়েছিল আসামিরা। তারা বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, জননিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার জন্য আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য পুলিশ অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার চক্রান্ত ছিল।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি ভাড়া বাসা থেকে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ও বোমা তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা আলামতের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের তরল রাসায়নিক, রাসায়নিক পাউডার, বিস্ফোরক জাতীয় পাউডার, ডেটোনেটর, রিমোট ও কন্ট্রোলার, বৈদ্যুতিক তার, ভোল্টমিটার, স্প্রিং, জিআই তার, বিয়ারিং বল, গ্যাস ক্যান, গ্যাস টর্চ ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি।

এছাড়া পাঁচটি নিষ্ক্রিয় করা পাইপ বোমার ধ্বংসাবশেষ (আইইডি) উদ্ধার করা হয়। এগুলো জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ঘটনাস্থলেই নিরাপদে নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। জব্দ তালিকায় একটি স্টিল পাইপ ও নাট-বল্টুও রয়েছে, যা পাইপ বোমা তৈরিতে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের জব্দ তালিকায় চারটি তরল রাসায়নিক ভর্তি বোতল, দুটি ড্রাম, বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পাউডার এবং বিস্ফোরক জাতীয় পাউডারের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া FertiMAX-NK, POTASSIUM NITRATE লেখা একটি প্যাকেট পাওয়া গেছে।

উদ্ধার করা অন্যান্য আলামতের মধ্যে রয়েছে একটি ডেটোনেটর, রিমোট ও কন্ট্রোলার, অসংখ্য বৈদ্যুতিক তার, ভোল্টমিটার, ডিজিটাল ওয়েট মেশিন, ড্রিল মেশিন, জিআই তার ও স্প্রিং। এ ছাড়া Nitric Acid লেখা একটি কাচের বোতল এবং সালফিউরিক এসিড ৯৮ শতাংশ লেখা একটি প্লাস্টিকের বোতলও উদ্ধার করা হয়েছে।

জব্দ তালিকায় ১০টি পলিথিন জিপার প্যাকেটে থাকা ছোট ছোট সিলভার রঙের বিয়ারিং বলের কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব আলামত বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের জব্দ তালিকায় জিহাদ সংক্রান্ত তিনটি বইয়ের কথাও উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে একটি বইয়ের প্রচ্ছদে জিহাদ সংক্রান্ত উৎকৃষ্ট মাসায়েল লেখা রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আরেকটি বইয়ে মোল্লা উমারের মৃত্যু নিয়ে একটি প্রসঙ্গ এবং তৃতীয় বইয়ে সিলসিলাহ এ ঈসমিয়াহ লেখা রয়েছে বলে জব্দ তালিকায় বলা হয়েছে।

উদ্ধার করা অন্যান্য আলামতের মধ্যে রয়েছে ১২ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটি চাপাতি এবং ১০ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটি সুইচ গিয়ার নাইফ। এছাড়া সিম ও ব্যাটারিসহ একটি নীল রঙের নকিয়া বাটন মোবাইল ফোন এবং WENGER NOBIR। লেখা একটি কালো ক্রস-চেস্ট ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে ঘটনার সময় ১১ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা ৩৫ মিনিট থেকে ১২ আগস্ট রাত ৩টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলের প্রথম স্থান হিসেবে সাভার থানার বাগবাড়ি থেকে ট্যানারীগামী রাস্তার শেষ মাথায় বিসিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যানারি এস্টেটের পশ্চিম দেয়ালসংলগ্ন বেড়িবাঁধের ওপর বটগাছের নিচের এলাকার কথা বলা হয়েছে। এলাকাটি তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয় স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর গুলশান মোড় এলাকার একটি ভাড়া বাসা। এটি আব্দুল জলিলের তিনতলা ভবনের নিচতলার দক্ষিণ পাশের বাসা। মামলার নথি অনুযায়ী, ওই বাসাটি আসামি মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানের ভাড়া বাসা। পুলিশ বলছে, উদ্ধার হওয়া আলামত ও আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য যাচাই করে নব্য জেএমবির সদস্যদের পরিকল্পনা, সম্ভাব্য আস্তানা এবং হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও তথ্য বের করার চেষ্টা চলছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, রাতে তিনজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রাম সেখানে রেখে যান। পরে ড্রামের ভেতর থেকে কালো স্কচটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকারটি বের করে মসজিদের মাঠে রাখা হয় এবং পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। সকালে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়। বুধবার বিকালে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট এলাকাটি জনশূন্য করে বোমাটি নিয়ন্ত্রিতভাবে নিষ্ক্রিয় করে। সাভার মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল আলম বলেন, ১১ আগস্টের ঘটনায় মামলা হয়েছে। যে বাড়ি থেকে বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে, সেটির ভাড়াটে পলাতক। বিষয়টি নিয়ে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট কাজ করছে এবং তাদের অগ্রগতিও রয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত