
বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে একটি নতুন বিশেষায়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে প্রস্তাবিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া অনুযায়ী এই বিশেষায়িত সংস্থাটি গঠন করা হচ্ছে।
গত ৪ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে জনগণের মতামত প্রদানের জন্য খসড়া আইনটি প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে ইমেইল ঠিকানায় মতামত পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে র্যাবের বিদ্যমান আইনি কাঠামো প্রতিস্থাপন করে নতুন ইউনিটের অধীনে এর কর্মক্ষম সম্পদ, জনবল এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বগুলো অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশ ও অন্যান্য সুশৃঙ্খল বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিয়ে পদায়ন, প্রেষণ বা সাময়িক সংযুক্তির মাধ্যমে এসআরবি (এসআরবি) গঠন করা হবে। প্রেষণ বা সংযুক্তির মেয়াদ সাধারণত ন্যূনতম দুই বছরের জন্য হবে।
ইউনিটের সদরদপ্তর ঢাকায় অবস্থিত হবে। তবে সরকারের অনুমোদনক্রমে দেশের অন্যান্য স্থানেও এর অধীনস্থ কার্যালয় স্থাপন করা যাবে। এটি ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও সেকশনে বিভক্ত থাকবে।
এসআরবি প্রধান হিসেবে একজন মহাপরিচালক (ডিজি) থাকবেন, যিনি বাংলাদেশ পুলিশের কর্মরত অন্তত অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হবেন।
মহাপরিচালক পুলিশ মহাপরিদর্শকের সাধারণ নিয়ন্ত্রণের সাপেক্ষে প্রশাসনিক, আর্থিক ও পরিচালনগত ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।
প্রস্তাবিত এসআরবি-কে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদ, সংগঠিত অপরাধ, সাইবার অপরাধ, মাদকপাচার, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুতর অপরাধ মোকাবিলার দায়িত্ব দেওয়া হবে।
এরমধ্যে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রতিরোধ, অপহরণ, হত্যা, গুম, জমি দখল রোধ এবং অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তা করাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশ পেলে এই ইউনিট মামলা দায়ের এবং ফৌজদারি তদন্ত পরিচালনা করতে পারবে।
ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইন সাপেক্ষে, এসআরবি কর্মীরা মাদক, অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচার, সংগঠিত অপরাধ এবং অন্যান্য আমলযোগ্য অপরাধের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পাবেন। তবে খসড়ায় গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি ও জব্দকৃত আলামত অবিলম্বে নিকটস্থ থানায় হস্তান্তর এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিলের বিধান রাখা হয়েছে।
ফৌজদারি তদন্তের জন্য অন্তত সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে। খসড়ায় এসআরবি সদর দপ্তরে আটক কেন্দ্র, মালখানা এবং জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষের বিধান রাখা হয়েছে।
‘এসআরবি’ কর্মীদের জন্য খসড়াটিতে বিস্তারিত শৃঙ্খলা কাঠামোর রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। বৈধ আদেশ অমান্য করা, কর্মস্থল ত্যাগ করা, সহকর্মীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দায়িত্ব পালন, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার বা ধ্বংস, অবহেলা এবং অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের মতো অসদাচরণের জন্য শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
অসদাচরণের দায়ে অভিযুক্ত কোনো সদস্যকে সুনির্দিষ্ট সুরক্ষাব্যবস্থা সাপেক্ষে আটক রাখা যেতে পারে। এই সুরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে-আটকের কারণ জানিয়ে লিখিত নোটিশ প্রদান, দ্রুত তদন্ত শুরু করা এবং প্রাথমিক কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলে মুক্তি প্রদান।
নাগরিকদের অভিযোগ এবং এসআরবি কর্মীদের ক্ষোভণ্ডবিক্ষোভ নিরসনে একটি পৃথক ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’-এর প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিনিধি, এসআরবির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার, আইন বা বিচার বিভাগীয় প্রশাসনে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকার মনোনীত একজন প্রতিনিধি থাকবেন।
কমিটিকে অভিযোগ তদন্ত করার, অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদক্ষেপের সুপারিশ করার এবং অনুচিত প্রভাব, হয়রানি, বৈষম্যমূলক আচরণ, পদোন্নতি ও পদায়ন সংক্রান্ত অসন্তোষ পরীক্ষার ক্ষমতা দেওয়া হবে। এটি সরকারকে ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনও জমা দেবে।
অন্তর্বর্তীকালীন বিধানের অধীনে, র্যাবের সম্পদ, তহবিল, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি, রেকর্ড, অধিকার, দায়বদ্ধতা এবং চুক্তির বাধ্যবাধকতা এসআরবিতে স্থানান্তরিত হবে।
র্যাবের বিদ্যমান সব কর্মকর্তা এবং সশস্ত্র কর্মী বা কর্মচারীরা এসআরবির সদস্য হবেন। নতুন আইনের অধীনে পরবর্তীতে সংশোধিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিদ্যমান চাকরির শর্তাবলী অপরিবর্তিত থাকবে।
নতুন আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রাখা সাপেক্ষে, বিদ্যমান র্যাবের মামলা, আইনি প্রক্রিয়া, বিভাগীয় কার্যক্রম এবং শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
নতুন বিধিমালা প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত, বিদ্যমান ‘র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (কোর্ট প্রসিডিউর অ্যান্ড ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিংস) রুলস, ২০০৫’ প্রয়োজনীয় সংশোধন সাপেক্ষে প্রযোজ্য হতে থাকবে।
প্রস্তাবিত আইনটিতে এসআরবি (এসআরবি)-র কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে এবং কার্যক্রম ও তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের লক্ষ্যে সদর দপ্তরে একটি বিশেষ গবেষণা ইউনিট গঠনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আইনটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিধি ও প্রবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে। প্রস্তাবিত আইনটি পাস হলে তা র্যাব থেকে এসআরবিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হবে। একইসঙ্গে, বাংলাদেশ পুলিশের নিয়ন্ত্রণে থাকা নতুন কাঠামোর আওতায় বিদ্যমান বাহিনীর জনবল, সম্পদ ও আইনি দায়িত্বের বড় একটি অংশ অক্ষুণ্ণ রাখা হবে।