ঢাকা রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

গ্যাস নিতেই দিনের অর্ধেক শেষ, আয় কমছে চালকদের

গ্যাস নিতেই দিনের অর্ধেক শেষ, আয় কমছে চালকদের

গ্যাস সংকটে ভোগান্তি কমছে না সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য গ্যাসচালিত যানবাহনের চালকদের। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় দিনের বড় একটি সময় কেটে যাচ্ছে ফিলিং স্টেশনে। এতে একদিকে যেমন আয় কমছে, অপরদিকে দৈনিক জমার টাকা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে চালকদের। গতকাল শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে এবং চালক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্যাস নিতে অনেক স্টেশনে প্রায় তিন ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি গ্যাস দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে মাত্র ১২০ টাকার গ্যাস নিয়েই রাস্তায় ফিরতে হচ্ছে তাদের। চালকরা বলছেন, গ্যাসের সংকটের কারণে দিনের বড় একটি অংশ পাম্পের লাইনে কেটে যাচ্ছে। ফলে আয় কমার পাশাপাশি গাড়ি পরিচালনার খরচও বাড়ছে। আয় কমে যাওয়ায় প্রতিদিনের জমার টাকাও পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সিএনজি চালক মো. মনা বলেন, কিস্তি থেকে টাকা তুলে সিএনজি মালিককে জমা দিতে হচ্ছে। ভোর ৪টা থেকে লাইনে আছি, এখনও গ্যাস পাইনি। গাড়ির মালিককে জমা দেব কীভাবে, সংসার চালাব কীভাবে- সামনে বাসা ভাড়া দিতে হবে। জাহাঙ্গীর নামের আরেক চালক বলেন, প্রতিদিন মহাজনকে ১ হাজার ২০০ টাকা জমা দিতে হয়। গ্যাস লাগে প্রায় ৫০০ টাকার। এর বাইরে সারাদিনে নিজের খরচ হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা খরচ হয়। গ্যাসের সংকটে গত দুই মাস ধরে আয় বন্ধ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। দিনে গ্যাস নেই, রাতে কিছুটা সরবরাহ উত্তরার এম এ মাসুদ ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক কামাল বলেন, গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হয়েছে। দিনে কোনো ধরনের গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, নিয়মিতভাবে সরবরাহ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত চাপ নেই। কম চাপের কারণে তাদের স্টেশনের ভালভ চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। যেসব স্টেশনের ভালভ কম চাপেও চালু হয়, সেগুলোই কিছুটা গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে। তার ভাষ্য, বর্তমানে বিশেষ করে রাতের দিকে কিছুটা গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। বিকালের দিকে গ্যাসের চাপও কিছুটা বাড়তে শুরু করে। আকিজ সিএনজি স্টেশনের কর্মী তারেক বলেন, গ্যাস নিয়ে কোনো ভালো খবর নেই। কবে ঠিক হবে জানা নেই। রাতে গ্যাস দিলেও সারাদিন আমরা গ্যাস দিতে পারিনি। জামান স্টেশনের কর্মী আব্দুল্লাহও জানান, রাতের বেলা কিছু গ্যাস পাওয়ার পর সারাদিন আর সরবরাহ পাওয়া যায়নি।

প্রাইভেটকার চালক সানাউল্লাহ বলেন, আমাদের তো এখন বড় ধরনের দুর্দিন চলছে। আমরা কাজ করতে পারছি না। কিন্তু খরচ তো ঠিকই হচ্ছে। তার প্রশ্ন, গাড়িই না চালাতে পারলে আমরা চলব কী করে?

রাজধানীর বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘ সারি

রাজধানীর উত্তরার আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাস না থাকায় অনেক স্টেশন বন্ধ রয়েছে। কোথাও পাম্প চালু থাকলেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সিএনজি, ট্রাকসহ অন্যান্য গ্যাসচালিত যানবাহনে জ্বালানি নিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আব্দুল্লাহপুরের পূর্ব পাশে খন্দকার ফিলিং স্টেশন এবং বিমানবন্দর-খিলক্ষেত এলাকার বিভিন্ন পাম্পে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করতে দেখা যায় চালকদের। খন্দকার ফিলিং স্টেশনের অপারেটর মনির হোসেন বলেন, আমাদের কাছেই যদি গ্যাস না থাকে, তাহলে গ্রাহকদের কীভাবে গ্যাস দেব? গত দুই সপ্তাহ ধরে পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছি না। গ্যাস না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন সিএনজি চালকরা। আমাদের পাম্প একেবারে বন্ধ রয়েছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আব্দুল্লাহপুর এলাকার পশ্চিম পাশে আরএসআর ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে বিক্রয়কর্মী জানে আলম বলেন, দুপুর ১টার দিকে কিছুক্ষণ গ্যাসের চাপ ছিল, পরে আবার চলে গেছে। ডেমরার রাসেল ফিলিং ও সিএনজি স্টেশন এবং হাজী সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও দিনভর গ্যাস নিতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় রাসেল ফিলিং স্টেশনের চারটি হোসের মধ্যে একটি সচল রাখা সম্ভব হয়েছে। মীরপাড়া এলাকার হাজী ফিলিং স্টেশনেও একটি হোস দিয়ে সীমিত পরিসরে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। যাত্রাবাড়ী থেকে ডেমরায় গ্যাস নিতে আসা সিএনজি চালক মো. সারোয়ার আরিফ বলেন, আমরা কি পরিবারসহ না খেয়ে মরব?

মহাখালী থেকে মালিবাগ-একই চিত্র

রাজধানীর মহাখালীর আরজতপাড়া, বাসস্ট্যান্ড, নাবিস্কো, তেজগাঁও, কাওরান বাজার, সাতরাস্তার মোড় ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণি এলাকায়ও গ্যাস সংকটের একই চিত্র দেখা গেছে। আরজতপাড়ার ইউরেকা, বাসস্ট্যান্ড এলাকার এবিএন, রয়েল, ইসা গার্ডেন ও ক্লিন ক্লেয়ার, নাবিস্কোর সাউদার্ন, তাজউদ্দীন আহমদ সরণির সিটি ও অল-ইন-ওয়ান এবং কাওরান বাজারের কানাডা-বাংলা সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় দীর্ঘ সারি দেখা যায়। রাজধানীর ব্যস্ত সাতরাস্তা মোড়ের আকিজ সিএনজি স্টেশনও গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে। স্টেশনের প্রবেশপথে ‘গ্যাস নেই’ লেখা সাইনবোর্ড দেখা যায়। দায়িত্বে থাকা গার্ড ও নোজেলম্যান তারেক জানান, গ্যাসের অভাবেই স্টেশনটি বন্ধ রয়েছে।

মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকার এবিএন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক শহীদুল বলেন, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে কিছুক্ষণ সরবরাহের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আবার চালু হচ্ছে। এভাবেই সীমিত পরিসরে সরবরাহ দিতে হচ্ছে। মালিবাগ, মুগদা বিশ্বরোড, মতিঝিল, মানিকনগর, খিলগাঁও, সবুজবাগ, বনশ্রী ও গোড়ানসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেও একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। গ্যাস না থাকায় অনেক স্টেশন বন্ধ রয়েছে। যেসব স্টেশন চালু রয়েছে, সেখানেও কম চাপের কারণে ধীরগতিতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সকাল থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদের। মালিবাগ হাজীপাড়া সিএনজি ফুয়েলিং স্টেশন, বিশ্বরোডের শান্ত সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশন, আরকে মিশন রোডের এনএস সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিসিং সেন্টার এবং মানিকনগরের বেস্ট ইস্টার্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কোথাও কম চাপের কারণে সীমিত পরিসরে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত