
রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর দখল-দূষণ রোধ করে নদীর স্বাভাবিক নাব্য রক্ষা ও দখল হয়ে যাওয়া নদ-নদী পুনরুদ্ধার করতে কেন্দ্রীয় সেল গঠন করেছে সরকার। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এ সেল গঠনের কথা জানানো হয়। ৩৭ সদস্যের কেন্দ্রীয় এ সেলের আহ্বায়ক হিসেবে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব। এ সেলের অধীনে থাকবে তিনটি সাব-কমিটি। প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় সেল ও এসব সাব-কমিটির কাজের ক্ষেত্র নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু, ধলেশ্বরীসহ খাল, নালার দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও নদ-নদী পুনরুদ্ধারে এ সেল কাজ করবে। কেন্দ্রীয় এ সেলের উপদেষ্টা করা হয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের। এ সেলের সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকবে নৌবাহিনী।
৩৭ সদস্যের এ সেলের সদস্য করা হয়েছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগের সচিব, নৌবাহিনীর প্রতিনিধি (রিয়ার এডমিরাল পদমর্যাদার কর্মকর্তা), পুলিশের মহাপরিদর্শক, কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, রাজউক চেয়ারম্যান, বিআইডব্লিউটিএ এর চেয়ারম্যান, ঢাকার বিভাগী কমিশনার, নৌপুলিশের এআইজি, ঢাকা ওয়াসার এমডি, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা, অ্যাটর্নি জেনারেলের প্রতিনিধি, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের জেলা প্রশাসক, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, ট্যানারি মালিক সমিতি ও ডক ইয়ার্ড এসোসিয়েশনের সভাপতি, এনজিও (পরিবেশ অধিদপ্তর মনোনীত), দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য অপসারণ, নদ-নদীর নাব্যতা অপসারণ, নদ-নদী পুনরুদ্ধার ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিতে তিনটি সাব কমিটি গঠন করে তাদের কাজ পরিধি ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সাব-কমিটি ১ শিল্পবর্জ্যসহ সব বর্জ্যের উৎসমুখ নিয়ন্ত্রণ, সাব-কমিটি ২ খাল ও ড্রেনের বর্জ্য অপসারণ, নদী পুনরুদ্ধার ও পানির প্রবাহ সচল রাখা এবং সাব-কমিটি ৩ নদীর তলদেশে জমে থাকা স্থায়ী বর্জ্য অপসারণসহ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের কাজ করবে।
প্রতি মাসে কেন্দ্রীয় সেল তাদের কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করবে। বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত চলমান প্রকল্পগুলোর পর্যালোচনা ও সমন্বয় করবে কেন্দ্রীয় সেল।
ঢাকার চারপাশের নদীগুলো বাঁচাতে সরকারের নতুন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। দীর্ঘদিন ধরে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, বালু ও শীতলক্ষ্যা দখল, দূষণ, অবৈধ স্থাপনা, শিল্পবর্জ্য, পয়োবর্জ্য ও প্লাস্টিকের ভারে বিপর্যস্ত। একের পর এক প্রকল্প হয়েছে, অর্থ ব্যয় হয়েছে, অভিযানও হয়েছে। কিন্তু নদীর সংকট কাটেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এ বাস্তবতায় সরকার এবার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলছে। প্রথম ধাপে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও ধলেশ্বরীতে অভিযান, পরবর্তী ধাপে বালু ও শীতলক্ষ্যায় কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু নদীর পানিতে ওষুধ ছিটানো কিংবা ড্রেজার নামিয়ে পলি তোলার পরিবর্তে দূষণের উৎসমুখ বন্ধ করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটিই এ উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ নদীতে প্রতিদিন বর্জ্য পড়তেই থাকলে যতই ড্রেজিং করা হোক, নদীকে সুস্থ করা সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক সরকারি জরিপে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে ২২৪টি বর্জ্য নিঃসরণের উৎসমুখ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ১৬৬টি এবং তুরাগে ৫৮টি। এসব দূষণের ৫৫ শতাংশের সঙ্গে শিল্পবর্জ্য, রং, রাসায়নিক ও ভারী ধাতু জড়িত। আরও ২৫ শতাংশ দূষণ আসে জৈব বর্জ্য, রোগজীবাণু ও অ্যামোনিয়া থেকে।
ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর সামগ্রিক জরিপে ৪২৪টি প্রত্যক্ষ বর্জ্য উৎসমুখের তথ্যও উঠে এসেছে। এর মধ্যে ২৪৪টি বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্পকারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ সমস্যাটি কোথায়, তার একটি বড় অংশ এখন আর অজানা নয়। প্রশ্ন হলো, এত বছর ধরে চিহ্নিত দূষণকারী উৎসমুখ বন্ধ করা গেল না কেন? সরকারের নতুন পরিকল্পনায় প্রথমে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
অভিযান নয়, স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ দরকার : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। কেন্দ্রীয় সেল গঠন করা হয়েছে। এর সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে। নৌবাহিনীকে 'ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার'-এর আওতায় মাঠে নামানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। দূষণকারী কারখানা, ডকইয়ার্ড, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার তালিকা হালনাগাদ করে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। দায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, অভিযান হয়েছে, জরিমানা হয়েছে, কারখানাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, আবার কিছুদিন পর আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। কোথাও ইটিপি আছে কিন্তু চালু নেই, কোথাও ইটিপি আছে কিন্তু তার সক্ষমতা উৎপাদনের তুলনায় অপ্রতুল, আবার কোথাও রাতের আঁধারে অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। সুতরাং এবার শুধু 'ইটিপি আছে কি না' তা দেখলেই হবে না। ইটিপি ২৪ ঘণ্টা চালু আছে কি না, কত পরিমাণ বর্জ্য পরিশোধন করছে, পরিশোধিত পানির মান কী, সেই তথ্যও নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শন ও নমুনা পরীক্ষার তথ্যও হতে হবে স্বচ্ছ। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুও শিল্পমালিকদের ইটিপি স্থাপন ও পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই ফল পাওয়া যাবে না বলে জানিয়েছেন।
নদীকে শুধু নৌপথ বানালে চলবে না : সরকার ঢাকার চারপাশের প্রায় ১১০ কিলোমিটার বৃত্তাকার নৌপথে যাত্রী ও পর্যটক পরিবহন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। গাবতলী থেকে সদরঘাট হয়ে পোস্তগোলা পর্যন্ত প্রতি ২০ থেকে ৩০ মিনিট পরপর নৌযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ছয় মাসের মধ্যে ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী বহন করতে সক্ষম ১২টি ছোট নৌযান নির্মাণের সিদ্ধান্তও হয়েছে। ঢাকার যানজট কমাতে নদীপথকে গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার চিন্তা বাস্তবসম্মত।
কিন্তু নদীর পানি যদি দূষিত থাকে, নাব্য না থাকে এবং নদীর দুই তীরে অবৈধ স্থাপনা ও বর্জ্যের স্তূপ থাকে, তাহলে কেবল নৌযান নামিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এর আগে বৃত্তাকার নৌপথ প্রকল্পের দুর্বলতা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সেবা-ফ্রিকোয়েন্সি, বিনিয়োগ ও সংযোগব্যবস্থার ঘাটতির কথা বলেছেন। পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খানও বলেছেন, নদী পুনরুদ্ধারকে শুধু পরিবহন পরিকল্পনা হিসেবে দেখলে হবে না; নদীর পরিবেশগত কার্যকারিতা রক্ষা এবং নদীতীরের প্রকৃতি-সম্মত উন্নয়নও নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ নদীকে একদিকে গণপরিবহনের পথ, অন্যদিকে বর্জ্য নিষ্কাশনের নালা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
বুড়িগঙ্গার অবস্থা সতর্কবার্তা : সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগের গুরুত্ব বোঝার জন্য বুড়িগঙ্গার বর্তমান অবস্থা যথেষ্ট। সরকারি পর্যায়ে উপস্থাপিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গায় দ্রবীভূত অক্সিজেন বা উঙ অনেক স্থানে মাত্র ১ দশমিক ৭০ থেকে ২ দশমিক ৬৮ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার। অথচ জলজ প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার জন্য অনেক বেশি মাত্রার অক্সিজেন প্রয়োজন। তুরাগের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। ২০২৬ সালের একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় তুরাগের শুষ্ক মৌসুমে তাপমাত্রা ০ দশমিক ৯ মিলিগ্রাম প্রতি লিটারে নেমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। একই গবেষণায় উচ্চ ইঙউ ও ঈঙউ এবং ভারী ধাতুর উপস্থিতিও নদীটির মারাত্মক পরিবেশগত চাপের প্রমাণ হিসেবে উঠে এসেছে। অর্থাৎ এটি এখন শুধু সৌন্দর্য বা নৌযান চলাচলের প্রশ্ন নয়। এটি জনস্বাস্থ্য, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং ঢাকার ভবিষ্যৎ নগরব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।
পরিবেশবিদদের সতর্কতা : পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের বক্তব্যও একই জায়গায় এসে মেলে: নদী পরিষ্কারের আগে দূষণের প্রবাহ বন্ধ করতে হবে। পরিবেশবিদ ও নদী বিশেষজ্ঞরা বহুবার বলেছেন, নদীকে বাঁচাতে হলে দূষণের উৎসে যেতে হবে। কেবল নদীর তলদেশ থেকে বর্জ্য তুলে এনে অন্য জায়গায় রাখা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। শিল্পবর্জ্য, পয়োবর্জ্য ও কঠিন বর্জ্যের প্রবাহ বন্ধ না করে ড্রেজিং করলে কিছুদিন পর আবার একই দূষণ ফিরে আসবে। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা নদী পরিষ্কারকে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার ওপর জোর দিয়েছেন। তার বক্তব্যের সারকথা হলো, বুড়িগঙ্গার মতো নদীকে বাঁচানো কঠিন হলেও ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে। এখন সরকারের পরিকল্পনায় এ ধারাবাহিকতাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
খাল-ড্রেন না বাঁচালে নদীও বাঁচবে না : ঢাকার নদী রক্ষার ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল, ড্রেন ও জলাধারগুলোকে নদী থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন পৌরসভা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নদীর স্বাস্থ্য সরাসরি সম্পর্কিত। শহরের পয়োবর্জ্য ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত নদীর ওপর চাপ তৈরি করে। মধ্যমেয়াদে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের খাল-ড্রেন থেকে বর্জ্য অপসারণ, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং পানিপ্রবাহ বাড়ানোর যে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, সেটি তাই দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, খাল-ড্রেনের পানি অপরিশোধিত অবস্থায় নদীতে পড়া বন্ধ করতে হবে।
কেন্দ্রীয় সেলকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কেন্দ্রীয় সেল এবং তিনটি পৃথক সাব-কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। কিন্তু শুধু কমিটি গঠন করলেই কাজ হবে না। কেন্দ্রীয় সেলের কাজের অগ্রগতি মাসে অন্তত একবার প্রকাশ করা উচিত। কোন উৎসমুখ বন্ধ হয়েছে, কোন কারখানার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কতটি ইটিপি চালু হয়েছে, কতটি অবৈধ ড্রেন বন্ধ করা হয়েছে, নদীর পানিতে ডিও, বিওডি, সিওডি ও ভারী ধাতুর মাত্রা কতটা পরিবর্তিত হয়েছে, এসব তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। কারণ নদী রক্ষার সবচেয়ে বড় সমস্যা পরিকল্পনার অভাব নয়, বাস্তবায়নের ঘাটতি।
নদী রক্ষায় রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরীক্ষা : ঢাকার চারপাশের নদী পাঁচটি হলেও এগুলো আসলে একটি আন্তঃসংযুক্ত জলব্যবস্থা। একটি নদীর দূষণ অন্য নদীতে ছড়িয়ে পড়ে। পানিপ্রবাহ কমে গেলে নাব্য ও জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে আলাদা আলাদা নদীকে আলাদা প্রকল্প দিয়ে বাঁচানোর পুরোনো পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দূষণের উৎস বন্ধ, এরপর খাল-ড্রেনের সংযোগ পুনরুদ্ধার, তারপর প্রয়োজনীয় ড্রেজিং ও নদী পুনরুদ্ধার, এবং সবশেষে নিয়মিত নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণ, এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, নদী দখল ও দূষণের ক্ষেত্রে পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা করা যাবে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান, বড় শিল্পগোষ্ঠী, ছোট কারখানা, ডকইয়ার্ড কিংবা স্থানীয় ব্যবসা, যে-ই দূষণ করুক, একই আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঢাকার নদীগুলোকে বাঁচানোর উদ্যোগ এবার যেন আরেকটি প্রকল্প, আরেকটি কমিটি কিংবা আরেক দফা অভিযান হয়ে না থাকে। নদীর উৎসমুখ বন্ধ হলে দূষণ কমবে, খাল-ড্রেন সচল হলে পানিপ্রবাহ বাড়বে, অবৈধ দখল বন্ধ হলে নদী তার জায়গা ফিরে পাবে। এরপরই ড্রেজিং ও নৌপরিবহনের উদ্যোগ কার্যকর হবে। ঢাকার চারপাশের নদী রক্ষা মানে শুধু একটি নদীকে পরিষ্কার করা নয়; এটি ঢাকার পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, জলাবদ্ধতা, নৌপরিবহণ এবং ভবিষ্যৎ নগরজীবন রক্ষার লড়াই। এবার তাই প্রশ্ন একটাই: সরকার কি নদী রক্ষার এই উদ্যোগকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারবে? নদীগুলো আরেকটি ব্যর্থতার ভার বহন করার অবস্থায় নেই।