ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিদ্যুৎ গিলছে অটোরিকশা চাপ পড়ছে গ্রিডে

বিদ্যুৎ গিলছে অটোরিকশা চাপ পড়ছে গ্রিডে

রাস্তায় যত বাড়ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ততই বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। শহরের অলিগলি থেকে গ্রামের বাজার- সর্বত্রই এখন সারি সারি অটোরিকশা। দিনের বেলায় যাত্রী পরিবহন, আর রাত নামলেই শুরু হয় ব্যাটারি চার্জের পালা। একসঙ্গে শত শত, ব্যাটারি চার্জে বসে। এর বড় একটি অংশের বিদ্যুৎ আসে কোথা থেকে- সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসছে আরও ভয়াবহ চিত্র। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অনুমোদিত চার্জিং স্টেশনের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে অসংখ্য অননুমোদিত চার্জিং গ্যারেজ। কোথাও আবাসিক মিটারে, কোথাও দোকানের সংযোগে, আবার কোথাও সরাসরি বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সংযোগ নিয়ে চলছে ব্যাটারি চার্জ। ফলে একদিকে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা, অন্যদিকে রাজস্ব হারাচ্ছে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান। সাম্প্রতিক বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখের মতো। এসব যান চার্জে বছরে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দিতে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে। তবে এসব হিসাব অটোরিকশার প্রকৃত সংখ্যা, ব্যাটারির ধরন, চার্জিংয়ের সময় ও দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল।

রাত হলেই বদলে যায় দৃশ্য

দিনভর সড়কে ছোটাছুটি। সন্ধ্যা নামতেই অটোরিকশার গন্তব্য চার্জিং গ্যারেজ। একটি গ্যারেজে ঢোকার পর সারি সারি চার্জার যুক্ত হয় ব্যাটারির সঙ্গে। কোথাও একই সঙ্গে কয়েক ডজন, কোথাও আরও বেশি অটোরিকশা চার্জ দেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে এই কার্যক্রম। সমস্যা হচ্ছে, এসব চার্জিং পয়েন্টের সবগুলোর জন্য আলাদা ও অনুমোদিত বাণিজ্যিক সংযোগ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় বাড়ির নিচতলা বা গ্যারেজে অটোরিকশা রেখে রাতভর চার্জ দেওয়া হচ্ছে। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ গ্যারেজ; ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় বিদ্যুতের তারের জটলা, সারি সারি ব্যাটারি ও চার্জার।

'চার্জিং' এখন বড় ব্যবসা

অটোরিকশা চার্জ দেওয়াকে ঘিরে অনেক এলাকায় গড়ে উঠেছে আলাদা ব্যবসা। চালক নির্দিষ্ট টাকা দিয়ে ব্যাটারি চার্জ করান। একটি অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে কত টাকা নেওয়া হবে, তা এলাকা ও চার্জিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অটোরিকশার সংখ্যা যত বাড়ছে, চার্জিংয়ের বাজারও তত বড় হচ্ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় চার্জিং গ্যারেজের বিস্তারের খবর এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। ঢাকার ক্ষেত্রে অনুমোদিত ও অননুমোদিত চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে বড় ধরনের পার্থক্যও দেখা গেছে। প্রশ্ন উঠছে- এই বিশাল ব্যবসার বিদ্যুৎ খরচের পুরোটা কি মিটারের আওতায় আসছে?

আবাসিক মিটারে বাণিজ্যিক কারবার

যে সংযোগে একটি পরিবারের ফ্যান, লাইট, ফ্রিজ ও অন্যান্য গৃহস্থালি যন্ত্র চলার কথা, সেই সংযোগে একসঙ্গে চলছে একাধিক অটোরিকশার চার্জার। ফলে একটি আবাসিক সংযোগের ওপর যে লোড অনুমোদিত, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার হতে পারে। এতে শুধু বিদ্যুৎ চুরির প্রশ্নই নয়, তৈরি হচ্ছে নিরাপত্তাঝুঁকিও। অতিরিক্ত লোডে বৈদ্যুতিক তার ও সরঞ্জাম উত্তপ্ত হয়ে যেতে পারে। নিম্নমানের তার, চার্জার বা ব্যাটারির সঙ্গে যুক্ত হলে শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও বাড়ে।

খুঁটি থেকে সরাসরি লাইন!

কিছু এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সরাসরি সংযোগ নিয়ে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমন অভিযোগ নতুন নয়। অতীতে বিভিন্ন জেলায় অবৈধ সংযোগে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের সংযোগে ব্যবহৃত বিদ্যুতের জন্য নিয়মিত বিল পরিশোধ করা হয় না। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রকৃত হিসাবও থাকে না। এখানেই প্রশ্ন- চুরি যাওয়া বিদ্যুতের এই বোঝা শেষ পর্যন্ত কে বহন করছে?

চাপ পড়ছে গ্রিডে

বিদ্যুতের চাহিদা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে, তখন বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চার্জে বসলে স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে একই এলাকার অনেকগুলো চার্জিং পয়েন্ট যদি একসঙ্গে চালু থাকে, তাহলে স্থানীয় ট্রান্সফরমার ও বিতরণ লাইনের ওপর বাড়তি লোড পড়ে। এর প্রভাব হতে পারে ভোল্টেজ ওঠানামা, ট্রান্সফরমারে অতিরিক্ত চাপ কিংবা বিদ্যুৎ বিভ্রাট। অর্থাৎ একটি অটোরিকশার চার্জিং হয়তো ছোট বিষয়; কিন্তু একই সময়ে লাখ লাখ অটোরিকশা চার্জে বসলে বিষয়টি আর ছোট থাকে না।

হিসাবের বাইরে বিশাল বিদ্যুৎ খরচ

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাবের ঘাটতি রয়েছে। ফলে এসব যান প্রতিদিন বা বছরে ঠিক কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, তারও একক ও নির্ভুল হিসাব পাওয়া কঠিন। তবে বিভিন্ন গবেষণা, বিশেষজ্ঞের হিসাব ও সংবাদ প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ ব্যবহারের যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে বিষয়টির ব্যাপকতা স্পষ্ট। একটি অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে প্রায় ৬ থেকে ৮ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ লাগতে পারে। এখন যদি লাখ লাখ অটোরিকশার প্রতিটির দৈনিক চার্জিং হিসাব করা হয়, তাহলে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ যে বিশাল হবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

সরকারিভাবে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা আছে, তবু অনিয়ম কেন?

অটোরিকশা বা ব্যাটারি চার্জিংকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখা হয়নি। সরকারি গেজেটেও ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনের জন্য পৃথক গ্রাহক শ্রেণি নির্ধারণের বিধান রয়েছে। ২০২৪ সালের বিদ্যুৎ ট্যারিফ-সংক্রান্ত গেজেটে নির্দিষ্ট অনুমোদিত লোডের ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনকে পৃথক শ্রেণির আওতায় রাখা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো- যেখানে বৈধভাবে চার্জিং স্টেশনের ব্যবস্থা করা সম্ভব, সেখানে অবৈধ সংযোগের প্রয়োজন হচ্ছে কেন? নাকি নিয়মের ফাঁক, নজরদারির দুর্বলতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের কারণে তৈরি হয়েছে বিকল্প একটি ব্যবস্থা?

শুধু বিদ্যুৎ চুরি নয়, রাজস্বেরও ক্ষতি

অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জিং হলে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি রাজস্ব হারায়। অন্যদিকে অনুমোদিত সংযোগে চার্জিং হলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব থাকে, বিল আসে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রাজস্ব পায়। অর্থাৎ একই বিদ্যুৎ- কেউ বৈধভাবে ব্যবহার করে বিল দিচ্ছে, আবার কেউ অবৈধভাবে ব্যবহার করে অর্থ উপার্জন করছে। এ ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে কারা- এটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

চালকরা বলছেন, চার্জ না দিলে গাড়ি চলবে না

অটোরিকশা চালকদের যুক্তিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তাদের বক্তব্য, ব্যাটারি চার্জ না দিলে গাড়ি চলবে না। যাত্রী পরিবহন করে আয় করতে হলে নিয়মিত চার্জ দিতেই হবে। বৈধ ও পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন না থাকলে তারা বাধ্য হয় কাছাকাছি যেখানেই সুযোগ পান, সেখানেই ব্যাটারি চার্জ করাতে। অর্থাৎ সমস্যার একটি বড় অংশ তৈরি হয়েছে পরিকল্পিত চার্জিং অবকাঠামোর ঘাটতি থেকেও।

বিদ্যুৎ বিভাগ কি জানে কোথায় কত চার্জার?

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- একটি এলাকায় মোট কত অটোরিকশা চার্জ হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে, কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে এবং তার কত অংশ বৈধ- এই তথ্য কি বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আছে? যদি না থাকে, তাহলে এত বড় বিদ্যুৎ ব্যবহার কীভাবে নজরদারির আওতায় আসবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, অটোরিকশার সংখ্যা ও চার্জিং স্টেশনের একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে অনুমোদিত চার্জিং স্টেশনগুলোতে পৃথক মিটার ও লোড পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

একদিকে পরিবেশবান্ধব, অন্যদিকে বিদ্যুৎখেকো

ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- এগুলো সরাসরি পেট্রল বা ডিজেল পোড়ায় না। স্বল্প দূরত্বে মানুষের যাতায়াত সহজ করতেও এসব যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বিদ্যুৎচালিত হলেই কোনো যান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই হয়ে যায় না।

যদি সেই যান চার্জ দিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়, অবৈধ সংযোগ নেওয়া হয় এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সক্ষমতা বিবেচনা না করে চার্জিং কেন্দ্র গড়ে ওঠে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

অভিযান নয়, দরকার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা

শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে কয়েকটি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রথমে প্রয়োজন প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত