ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ইলিশ আমদানি কমাতে চিঠি মন্ত্রণালয়ের সাড়া নেই

ইলিশ আমদানি কমাতে চিঠি মন্ত্রণালয়ের সাড়া নেই

দেশে উৎপাদিত ইলিশসহ রুই, কাতলা, আইড় ও বোয়ালের মতো দেশীয় প্রজাতির মাছ আমদানি না করে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর জোর সুপারিশ করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। তবে এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে বারবার চিঠি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। হাতে আসা নথি ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর মৎস্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) আবদুর রউফ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে দেশীয় মাছের আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার অনুরোধ জানানো হয়।

মৎস্য অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে দেশের মৎস্য খাতের অগ্রগতির বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরে দেশীয় মাছ আমদানি নিয়ন্ত্রণের সপক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট ৫০.১৮ লাখ টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭.০৬ শতাংশই (১৮.৬০ লাখ টন) কার্পজাতীয় মাছ। এছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯০ হাজার ৬২০ টন মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে ৬১৪৪ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। তবে বর্তমানে আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী ভারত ও মিয়ানমার থেকে রুই, কাতলা, ভেটকি, বোয়াল ও কাঁচকিসহ বিভিন্ন জাতের হিমায়িত মাছ আমদানি হচ্ছে। চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, দেশে সহজলভ্য এসব মাছ ঢালাওভাবে আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে তা অভ্যন্তরীণ মৎস্যচাষ ও সামগ্রিক মৎস্য খাতের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। একইসঙ্গে জাতীয় মাছ ও জিআই পণ্য ইলিশ আমদানির ওপর নির্ভর না করে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশেই এর আহরণ ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি, বিদেশ থেকে আমদানি করা মাছে ফরমালিন, ভারী ধাতু, অ্যান্টিবায়োটিক, রঞ্জক পদার্থ, প্রিজারভেটিভ ও হিস্টামিনের মতো ক্ষতিকর উপাদান থাকার ঝুঁকি রয়েছে, যা খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দেশে সহজলভ্য প্রজাতির মাছ আমদানি বন্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে মন্ত্রণালয়ের প্রতি অনুরোধ জানায় অধিদপ্তর।

তিন মাসের বেশি ফাইলবন্দি চিঠি : মৎস্য অধিদপ্তরের সুপারিশের পরও মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে থমকে আছে ইলিশ আমদানি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর মৎস্য অধিদপ্তর থেকে চিঠি পাঠানোর তিন মাসেরও বেশি সময় পর, ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন মৎস্য সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের চিঠিটি অতিরিক্ত সচিবকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়ে পাঠান। কিন্তু এরপরও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যে চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর ইলিশের আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনে জোর দিতে পুনঃরায় চিঠি পাঠানো হলে সেটিও এখন ফাইলবন্দি অবস্থায় রয়েছে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, অতীতে বিভিন্ন সময় বিপুল ইলিশ আমদানি হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কেবল চট্টগ্রাম অঞ্চল দিয়েই ২১১৮.৮৮ টন ইলিশ আমদানি করা হয়েছিল। পরবর্তী ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭২৩.৮২৫ টন এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৪৫৪.২৭৯ টন ইলিশ আমদানি হয়। এই আমদানির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে; তখন এক বছরেই ৮১২৫.৬১৭ টন ইলিশ আনা হয়েছিল, যার জন্য ব্যয় হয় প্রায় ৬১ লাখ ৬৪ হাজার ৪৮২ মার্কিন ডলার।

বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়েও বিভিন্ন অর্থবছরে গড়ে প্রায় তিন হাজার টন ইলিশ আমদানি হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা উল্লেখযোগ্য কমেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৬৬ টন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৬৫ টন এবং চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৪৫০ টন ইলিশ আমদানি হয়েছে। তবে আমদানির পরিমাণ কমলেও দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে এখনো দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার ঘাটতি রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইলিশের উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় ৪৩১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল, যার মেয়াদ শেষ হয় চলতি বছরের ৩০ জুন। তবে প্রকল্পটি থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কোনো কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। উল্টো এর অর্থ ব্যয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলেও জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, 'প্রকল্পে কী কী অনিয়ম হয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা উচিত।'

মৎস্য অধিদপ্তরের ডিজি বলেন, 'এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, কোন প্রক্রিয়ায় ইলিশ প্রকল্পের অর্থ বেহাত হয়েছে—এসব বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান করলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসতে পারে।' তিনি বলেন, 'বাজারে ইলিশের দাম অন্যায্যভাবে বেড়ে গেলে প্রতি বছরই পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে সীমিত পরিমাণে ইলিশ আমদানি করে দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে আমদানি-নির্ভরতা কমানো না গেলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে।' তিনি আরও বলেন, 'এত সম্ভাবনাময় একটি খাত অব্যবস্থাপনার কারণে বেহাত হয়ে যেতে পারে। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে একটি টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন।' এ বিষয়ে জানতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সাবেক সিনিয়র সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আবু বকর মো. শাহজাহান বলেন, কোনো দপ্তর থেকে একটি বিষয়ে সুস্পষ্ট সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর পর সেটি দীর্ঘ সময় ফাইলবন্দি পড়ে থাকা প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে মৎস্যের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা ও আমদানি নীতির সঙ্গে যখন দেশের কৃষক, জেলে, ভোক্তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিষয় জড়িত, তখন এ ধরনের সুপারিশ দ্রুত পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, একটি মন্ত্রণালয়ে অধীনস্থ দপ্তর থেকে কোনো নীতিগত সুপারিশ এলে সেটি আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পড়ে থেকে যাওয়ার কথা নয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মতামত, অর্থনৈতিক প্রভাব, জনস্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধি পর্যালোচনা করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত