ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সত্য, ন্যায় ও নারীর মর্যাদার বাংলাদেশ

প্রকৌশলী মাহবুবা হাকিম
সত্য, ন্যায় ও নারীর মর্যাদার বাংলাদেশ

গণমাধ্যম একটি জাতির বিবেক ও আয়না। একটি সংবাদ শুধু কিছু শব্দের সমষ্টি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন মানুষের সম্মান, একটি পরিবারের অনুভূতি এবং একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা। তাই সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যের যথার্থতা, ভাষার সংযম, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং ভুল হলে তা সংশোধনের নৈতিক দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ নতুন বাংলাদেশে আমি যখন মানবতার কল্যাণে কিছু করার প্রত্যয় নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছিলাম, ঠিক তখনই আমাকে থামানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলো হলফনামায় কলমের ছোট্ট একটি দাগ—টাইপের ত্রুটি, শব্দের অপব্যবহার ও ভাষার অপপ্রয়োগের মাধ্যমে। কিন্তু আমি থামিনি। কারণ ভুল শব্দ একজন মানুষের মর্যাদায় আঘাত করতে পারে; কিন্তু সত্যের পথে চলার প্রত্যয়কে থামাতে পারে না। বরং সেই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও দৃঢ় করেছে— সত্য, ন্যায় ও মানুষের কল্যাণের পক্ষে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার জন্য।

নারী— একটি প্রজন্মের নির্মাতা : আমরা নারীরা শুধু একটি জনগোষ্ঠী নই; আমরা একটি প্রজন্মের নির্মাতা, মূল্যবোধের ধারক এবং সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম শক্তি। একজন নারী যখন মা, তখন তিনি শুধু একটি সন্তানকে বড় করেন না— তিনি একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চরিত্র নির্মাণ করেন। তিনি যখন শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষক, উদ্যোক্তা, কর্মজীবী কিংবা জনপ্রতিনিধি— তখন তিনি তার পরিবার ও সমাজের সক্ষমতাকে আরও বিস্তৃত করেন। তাই নারীর উন্নয়ন কোনো বিচ্ছিন্ন 'নারী বিষয়' নয়। নারীর উন্নয়ন মানে পরিবার, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন। তৃণমূল থেকেই শুরু হোক পরিবর্তন : নারীর প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন এর সুফল শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত গ্রামের নারীর ঘরেও পৌঁছাবে। গ্রামের একজন নারী হয়তো উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাননি; কিন্তু তার হাতে রয়েছে সেলাই, কারুশিল্প, কৃষি, পশুপালন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার দক্ষতা। সেই দক্ষতাকে আয় ও মর্যাদায় রূপান্তরের পথ তৈরি করাই আমাদের দায়িত্ব। তাই তৃণমূল নারী উন্নয়নে শুধু প্রশিক্ষণ নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা প্রয়োজন— প্রশিক্ষণ, দক্ষতা, অর্থায়ন, উৎপাদন, বাজার, আয়, উদ্যোক্তা সৃষ্টি।

ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা, পোশাক ও হস্তশিল্প, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে।

প্রশিক্ষণের পর যেন একজন নারী আবার ঘরে ফিরে থেমে না যান— সেজন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, ব্যবসায়িক পরামর্শ, পণ্য প্রদর্শন ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। তৃণমূলের নারীকে শুধু প্রশিক্ষণার্থী নয়, উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হতে পারে— গ্রামের নারী উদ্যোক্তার পণ্য— দেশের বাজারে; দেশের পণ্য— বিশ্বের বাজারে।

শিক্ষা হোক আত্মনির্ভরতার ভিত্তি : নারীর ক্ষমতায়নের প্রথম ভিত্তি শিক্ষা। তবে শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, আইন সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান এবং নেতৃত্বের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

বিশেষ করে ঝরে পড়া কিশোরীদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জন্য নিরাপদ শিক্ষা-পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একজন মেয়েকে শুধু চাকরির জন্য নয়— নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া, দায়িত্ব বোঝা, অধিকার জানা এবং সমাজে অবদান রাখার সক্ষমতা অর্জনের জন্য শিক্ষিত করতে হবে।

নিরাপত্তা ছাড়া নারী উন্নয়ন অসম্পূর্ণ : একজন নারী যেন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ভয় না পান, গণপরিবহনে নিরাপদে চলাচল করতে পারেন, কর্মস্থলে হয়রানির শিকার না হন— এটি কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি তাঁর ন্যায্য অধিকার।

গুরুত্বপূর্ণ বাসস্ট্যান্ড, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলের আশপাশে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকতে হবে। গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা হতে হবে সহজ, দ্রুত ও গোপনীয়।

কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা এবং নারী কর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, প্রতারণা ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার থেকে নারীদের সুরক্ষার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

নির্যাতনের শিকার একজন নারীকে যেন এক অফিস থেকে অন্য অফিসে ছুটতে না হয়। চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, পুলিশি সহায়তা, কাউন্সেলিং ও নিরাপদ আশ্রয়— প্রয়োজনীয় সেবাগুলো সমন্বিতভাবে তার কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন। আমার কাছে তাই একটি নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— সেবা নারীর কাছে যাবে; নারীকে সেবার পেছনে ছুটতে হবে না।

মাতৃত্বের মর্যাদা ও কর্মজীবী নারী : বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটির বিদ্যমান বৈষম্যদূর করা অত্যন্ত জরুরি। কর্মক্ষেত্র ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মাতৃত্ব, সন্তান জন্মদান ও শিশুর প্রাথমিক পরিচর্যার প্রয়োজন প্রতিটি মায়ের জন্যই সমান। তাই মাতৃত্বকালীন ন্যায্যতা, চাকরির নিরাপত্তা, কর্মস্থলে ডে-কেয়ার সুবিধা, নিরাপদ যাতায়াত এবং মাতৃত্বের কারণে কর্মজীবনে বৈষম্য না হওয়ার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। একজন মা যেন কর্মজীবন ও মাতৃত্বের মধ্যে একটি বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য না হন— এমন মানবিক কর্মপরিবেশ আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা : নারীর স্বাস্থ্যকে শুধু মাতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য ও কল্যাণের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কিশোরীদের পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং নির্যাতনের শিকার নারীর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে বিশেষ গুরুত্ব প্রয়োজন।

অন্যদিকে প্রযুক্তি নারীর সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। একজন গ্রামের নারী ঘরে বসেই অনলাইন ব্যবসা করতে পারেন, ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন এবং নিজের পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারেন। তাই তৃণমূল নারীদের ডিজিটাল দক্ষতার পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তায়ও প্রশিক্ষিত করতে হবে। ডিজিটাল স্বাধীনতার সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।

নারীর মর্যাদা : নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আলোচনায় আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে সামনে রাখা প্রয়োজন। ইসলাম নারীকে মা হিসেবে সম্মান দিয়েছে, কন্যা হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে, স্ত্রী হিসেবে অধিকার দিয়েছে এবং একজন মানুষ হিসেবে তার ন্যায্য অধিকার ও সম্মানের স্বীকৃতি দিয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি, নারীর প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা মানে নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো নয়; বরং নারী ও পুরুষের পারস্পরিক দায়িত্ব, অধিকার, সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা। নারীর নিরাপত্তা, শিক্ষা ও ন্যায্য অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি পরিবার, নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধকেও সুরক্ষিত রাখতে হবে। মর্যাদা ও মূল্যবোধ— দুটিকে পাশাপাশি রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ : নারীর উন্নয়ন শুধু কর্মসংস্থানে সীমাবদ্ধ নয়; সিদ্ধান্ত গ্রহণেও নারীর কণ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে নারীর নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ বাড়াতে হবে। তৃণমূলের নারী স্থানীয় সমস্যাগুলো সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেন— শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি, স্যানিটেশন, নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ, মাদক কিংবা পারিবারিক সহিংসতা। তাই তাদের অভিজ্ঞতাকে নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নারীর কণ্ঠকে শুধু শুনলেই হবে না; সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাতেও তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারের চোখে বাংলাদেশ : একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমি জানি— একটি সুদৃঢ় বস্ত্র তৈরি হয় অসংখ্য সুতার সঠিক সমন্বয়ে। একটি সুতা একা হয়তো দুর্বল; কিন্তু সঠিক প্রক্রিয়া ও বিন্যাসে অসংখ্য সুতা একত্রিত হয়ে শক্তিশালী বস্ত্রে রূপ নেয়। আমাদের বাংলাদেশও তেমন। কৃষক, শ্রমিক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, যুবক, নারী— প্রত্যেকেই এই জাতির একটি করে সুতা। কেউ পিছিয়ে থাকলে জাতীয় উন্নয়নের বস্ত্রও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই নারীকে পেছনে রেখে উন্নত বাংলাদেশ নির্মাণ সম্ভব নয়।

গণমাধ্যম হোক সত্যের প্রহরী : আলোকিত বাংলাদেশের মতো গণমাধ্যমের কাছে আমার প্রত্যাশা আরও বেশি। একটি সত্য সংবাদ একজন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। একটি অনুসন্ধান অন্যায় উন্মোচন করতে পারে। একটি দায়িত্বশীল প্রতিবেদন সমাজের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে পারে।

আবার একটি ভুল তথ্য বা অসতর্ক শব্দ একজন মানুষের সামাজিক মর্যাদায় গভীর আঘাত করতে পারে। তাই গণমাধ্যমকে আমি প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণের সহযাত্রী হিসেবে দেখতে চাই। সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার কলম; আর সেই কলমের সবচেয়ে বড় পুঁজি হলো— সত্য, বিবেক ও দায়িত্বশীলতা।

আমার প্রত্যয় : একজন সাংসদ হিসেবে আমার প্রত্যয় কোনো একটি শ্রেণি বা একটি অঞ্চলের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই— যেখানে গ্রামের মেয়েটিও স্বপ্ন দেখবে; যেখানে কিশোরী নিরাপদে স্কুলে যেতে পারবে; যেখানে একজন মা তার মাতৃত্বের কারণে কর্মজীবন হারাবেন না; যেখানে একজন নারী উদ্যোক্তা পুঁজি ও বাজারের অভাবে থেমে যাবেন না; যেখানে নির্যাতনের শিকার নারী ন্যায়বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরবেন না; যেখানে কর্মজীবী নারী নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ পাবেন; যেখানে নারীর কণ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব পাবে এবং যেখানে নারীকে করুণা নয়— মর্যাদা, সুযোগ ও ন্যায্য অধিকার দেওয়া হবে।

আমার বিশ্বাস, একজন নারীকে এগিয়ে দিলে শুধু একজন নারী এগিয়ে যান না— একটি পরিবার এগিয়ে যায়, একটি প্রজন্ম এগিয়ে যায়, একটি সমাজ এগিয়ে যায়।

অন্ধকার যতই ঘন হোক, আলো তার পথ খুঁজে নেয়। সত্যের আলো জ্বলুক। ন্যায়ের বাংলাদেশ গড়ে উঠুক। নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক। মানবতার বাংলাদেশ আলোকিত হোক। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্য, ন্যায় ও মানুষের কল্যাণের পথে কাজ করার তৌফিক দান করুন— আমিন।

লেখক : সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত মহিলা আসন ৪৮ এবং

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত