
পাঁচ-সাত বছর আগেও যে জমিতে বিঘাপ্রতি ৬ থেকে সর্বোচ্চ ৮ মণের বেশি আমন ধানের ফলন পাওয়া কঠিন ছিল, এখন সেই জমিতেই কৃষক ফলন পাচ্ছে ১৬ থেকে ১৮ মণ পর্যন্ত। স্থানীয় জাতের বদলে উন্নত ও আগাম জাতের আমন চাষ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং কৃষি বিভাগের সার্বিক সহায়তায় আমূল পরিবর্তন এসেছে শরীয়তপুরের কৃষিতে। উন্নত জাতের আমন আবাদের ফলে প্রায় তিন গুণ ফলন বৃদ্ধির পাশাপাশি আগাম ধান কাটতে পারায় কৃষক একই জমিতে দ্রুত পেঁয়াজ, রসুন, কালোজিরা ও ধনিয়াসহ বিভিন্ন মসলা ফসল আবাদ করতে পারছেন সহজেই। আমনের আগাম ফলন ঘরে তুলতে পারায় কৃষককে ভরা মৌসুমে কম দামে বিক্রিও করতে হচ্ছে না তাদের। সবমিলে উন্নত জাতের আমনে শুধু ফলনই বাড়েনি শরীয়তপুরের কৃষিতে খুলে দিয়েছে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে শরীয়তপুরে এবার স্থানীয় জাতের আমন আবাদ হয়েছে ৮ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে। আর উন্নত জাতের আমন আবাদ হয়েছে ১৭ হাজার ৫১২ হেক্টর জমিতে। যা গত বছরের তুলনায় এক হাজার ৬৩২ হেক্টর বেশি। স্থানীয় প্রচলিত জাতের মধ্যে লক্ষীদীঘা, গাবুরা, ঝিঙ্গাসাইল, লোহাগরছা ও হিজলদীঘা উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে উন্নত জাতের মধ্যে ব্রিধান-৭৫, ব্রিধান-৮৭, ব্রিধান-৯৩, ব্রিধান-১০৩, বিনাধান-৭, বিনাধান-১৭, ও বিনাধান-২২ সহ অন্যান্য জাতের ধান চাষ করছেন কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও সরেজমিনে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, জমির ধরন অনুযায়ী ও অনুকূল আবহাওয়ায় ৫-৭ বছর আগে যেখানে বিঘাপ্রতি আমনের সর্বোচ্চ ৬-৮ মণ ফলন পাওয়া যেতো, সেখানে এখন উন্নত জাতের আমন আবাদের ফলে ফলন পাওয়া যাচ্ছে ১৬-১৮ মণ পর্যন্ত। উন্নত ও আগাম জাতের আমন দ্রুত কেটে ফেলতে পারায় মৌসুমের প্রথম দিকেই বিনাচাষ পদ্ধতিতে পেঁয়াজ-রসুন, কালোজিরা ও ধনিয়া আবাদ করতে পারছেন। ফলে মৌসুমের প্রথম দিকেই পেঁয়াজ-রসুন বাজারে তুলতে পারায় কৃষকদের ভরা মৌসুমে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে না।
জাজিরা উপজেলার মুলনা ইউনিয়নের ছোটমুলনা গ্রামের কৃষক ঈসরাইল হোসেন মল্লিক, ৫ বছর আগে আমরা স্থানীয় জাতের আমন আবাদ করে ফলন ভালো হলে বিঘাপ্রতি সর্বোচ্চ ৮ মণ ধান পেতাম। সেখানে এখন উন্নত জাতের ব্রি ধান-৭৫ আবাদ করে ১৮ মণ পর্যন্ত ফলন পাচ্ছি। দ্রুত ধান কাটতে পারায় মসলা ফসল আবাদেও বেশ সুবিধা হচ্ছে। এছাড়াও দ্রুত ধান কেটে জমিতে বিানাচাষে পেঁয়াজ-রসুন লাগাতে পারছি। ফলে মৌসুমের প্রথম দিকেই পেঁয়াজ-রসুন বাজারে তুলতে পারলে দামও পাচ্ছি ভালো। কারণ ভরা মৌসুমে দাম অনেক ক্ষেত্রেই কমে যায়। প্রথম বছর ৩ বিঘা জমিতে ব্রি ধান-৭৫ আবাদ করেছিলাম। এবার আমার ৮ বিঘাতেই এই জাতের আমন আবাদ করেছি। এবছর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় সর্বোচ্চ ফলনের আশা করছি।
নড়িয়া উপজেলার নশাসন গ্রামের কৃষক বোরহান উদ্দিন বলেন, ৬ বছর আগে ভাবতেও পারি নাই বিঘায় ১৮ মণ পর্যন্ত আমনের ফলন পাওয়া সম্ভব। তবে কৃষি অফিসের পরামর্শ ও সহযোগিতায় পরের বছর থেকেই আধুনিক পদ্ধতিতে উন্নত জাতের ব্রিধান-৮৭ আবাদ শুরু করেছি। প্রথম বছর বুঝতে একটু কষ্ট হওয়ায় বিঘায় ১৫ মণ ফলন পেলেও তার পরের বছর থেকে ১৮ মনের উপর ফলন পাচ্ছি। এবার আমি ৫ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আশা করছি এবার ৯০ থেকে ১০০ মণ ধান পাব। আমার দেখাদেখি এলাকার অনেক কৃষকই এখন উন্নত জাতের আমন চাষ করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর শরীয়তপুরের উপ-পরিচালক মো: জাহীদুল আলম বলেন, জমির ধরন ও মাটির গুণাগুণ বিবেচনা করে কৃষকদের জলামগ্ন সহিষ্ণু ও উন্নত আগাম জাতের আমন আবাদে পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। যাতে কৃষক জমির উপযোগী জাত নির্বাচন করে সর্বোচ্চ ফলন পেয়ে লাভবান হতে পারেন। এরইমধ্যে অনেক কৃষক স্থানীয় জাতের জায়গায় এখন উন্নত আগাম জাতের আমন চাষ করছেন। প্রতি বছরই বাড়ছে উন্নত জাতের আমন চাষ, কমছে স্থানীয় জাতের আবাদ।