
ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও কাঁচামালের বাজার ব্যাহত হয়েছে। যুদ্ধের একপর্যায়ে ইরান তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। সেই সঙ্গে গত দুই সপ্তাহে এই সমুদ্রপথ পার হতে চেষ্টা করা এক ডজনেরও বেশি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রণালি নিরাপদ করার জন্য তার ইউরোপীয় মিত্রদের চাপ দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে সমর্থন না করলে তা ন্যাটোর ভবিষ্যতের জন্য খুবই খারাপ হবে। পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচলে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় ব্রেন্ট (অপরিশোধিত) তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে ভোক্তাপণ্য থেকে শুরু করে কৃষিসংক্রান্ত কাঁচামালসহ আরও নানা ধরনের পণ্যের বিশ্ব বাণিজ্যও প্রভাবিত হয়েছে।
কিন্তু এই যুদ্ধ আরও একটি বড় সমস্যাকে সবার সামনে নিয়ে এসেছে। সেটা হলো, আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বিশ্ব বাণিজ্য অল্প কিছু সরু সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলোকে প্রায়ই ?‘সরু পথ’ বলা হয়ে থাকে। নিচে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো সম্পর্কে এবং সেগুলো বাধাগ্রস্ত হলে সম্ভাব্য কী ধরনের ঝুঁকি হতে পারে সে বিবরণ তুলে ধরা হলো-
হরমুজ প্রণালী : বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জ্বালানি পথ হলো হরমুজ প্রণালি। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৯ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৯ শতাংশ এই পথ দিয়েই যায়। বাণিজ্যের অন্যান্য সরু পথগুলোর তুলনায় এই হরমুজ প্রণালির বৈশিষ্ট্য হলো, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির জন্য বাস্তবিকভাবেই এই পথটির কোনো বিকল্প নেই।
১৯৮০ সাল থেকেই ইরান মাঝে মাঝেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। তবে গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম ইরানের ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালানোর পর জাহাজ চলাচলে যে বাধার সৃষ্টি হয়েছে, সেটা গত কয়েক দশকের মধ্যে উত্তেজনা যেভাবে বেড়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে এই যুদ্ধের কারণে, বিশ্বের তেলের বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিপর্যয় ঘটেছে এবং বিশ্ববাজারে ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। পারস্য উপসাগরে সামুদ্রিক পরিবহনে এই বাধার প্রভাব জ্বালানি খাতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। এই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে বছরে ২৬ মিলিয়ন বা দুই কোটি ৬০ লাখের বেশি কন্টেইনার যাতায়াত করে এবং বিশ্বের সার রপ্তানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই যায় পরিবহন করা হয়। এই কারণেই সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে দীর্ঘমেয়াদী বাধা বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন খরচের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
সুয়েজ খাল : লোহিত সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে সুয়েজ খাল। যেটি এশিয়া এবং ইউরোপের ভ্রমণের সময় অন্তত ১০ দিন কমিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১০ শতাংশই এই জলপথ দিয়ে হয়।
এর মধ্যে রয়েছে মোট কন্টেইনার পরিবহনের ২২ শতাংশ, যানবাহন চলাচলের ২০ শতাংশ এবং ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের ১০ শতাংশ। যেহেতু এই সুয়েজ খাল মিশরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেহেতু এটি সহজে বা সরাসরি কোনো হুমকির সম্মুখীন হয় না।
তবে এই জলপথটি যে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয় তা ২০২১ সালে একটি বড় জাহাজ আটকে যাওয়ার ঘটনায় প্রমাণিত হয়। ওই জাহাজটি আটকে যাওয়ায় ছয় দিন সরু এই সুয়েজ খালটি বন্ধ ছিল। এর ফলে প্রায় ১০ বিলিয়ন বা এক হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই কৌশলগত খালটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বাবে আল মানদাব প্রণালি। গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিবাদে ২০২৩ এবং ২০২৫ সালের মধ্যে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী হুথিরা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে যে হামলা চালিয়েছিল তার ফলে অনেক জাহাজ পথ পরিবর্তন করে আফ্রিকা হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এই কারণে সুয়েজ খালে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা যেটি ২০২৩ সালে ২৬ হাজারের বেশি ছিল তা কমে পরের বছর ২০২৪ সালে ১৩ হাজারে নেমে দাঁড়িয়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ নিতে সম্প্রতি হুথি নেতারা আবারো বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, তাদের আঙ্গুল বন্দুকের ট্রিগারে রয়েছে।