প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ নভেম্বর, ২০২৫
আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাদের আদেশ করেছেন যেন তারা ইসলামকে দৃঢ়ভাবে অঁকড়ে ধরে এবং ইসলাম ধর্মের সবদিক ও নিয়ম মেনে চলে। ইসলাম মানে শুধু নামধারী হওয়া নয়, বরং এতে অবশ্যই বিশ্বাস থাকতে হবে, যা আন্তরিকভাবে সত্য বলে গ্রহণ করা হয়। ইসলামের বিশ্বাসের ছয়টি মূল স্তম্ভের একটি হলো- পরকাল বা শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে মহানবী মুহাম্মাদ (সা.) মৃত্যুর পর যা যা ঘটার কথা বলেছেন। যেমন- কবরে প্রশ্নোত্তর, শাস্তি, প্রতিদান ও হাশর-নাশর বা পুনরুত্থান।
মৃত্যুর পরের জীবনের প্রথম ধাপ হলো মৃত্যুর মুহূর্ত। যখন কোনো মোমিনের মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন আকাশ থেকে শুভ্র চেহারার এমন ফেরেশতারা নেমে আসেন, যাদের মুখমণ্ডল সূর্যের মতো উজ্জ্বল। তাদের হাতে থাকে জান্নাতের কাফন ও বেহেশতের সুগন্ধি। তারা মৃত ব্যক্তির চারপাশে বসে থাকে চোখ যতদূর পর্যন্ত দেখে। এরপর প্রাণ হরণকারী ফেরেশতা এসে মাথার পাশে বসে বলেন, ‘হে পবিত্র আত্মা, বের হয়ে এসো আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টির দিকে।’ তখন সেই আত্মা পানির ফোঁটার মতো সহজে শরীর থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু অবিশ্বাসী কাফের ব্যক্তির বিষয়টি ভিন্ন। তার কাছে নেমে আসে কালো চেহারার ফেরেশতারা, যাদের হাতে থাকে রুক্ষ পশমি মোটা কাপড়। তারা চারপাশে বসে থাকে চোখ যতদূর দেখে। এরপর মালাকুল মওত এসে মাথার পাশে বসে বলেন, ‘হে নিকৃষ্ট আত্মা, বের হয়ে এসো আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির দিকে।’ তখন সেই আত্মা শরীরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে; ফলে কষ্টসহকারে জোরপূর্বকভাবে তাকে টেনে বের করা হয়। যেমন- ভেজা পশম থেকে লোহার কাঁটাযুক্ত দণ্ড টেনে বের করা হয়।’ (মুসনাদে আহমদ : ১৮৫৫৭)।
যখন আত্মা বের করা হয়, তখন মোমিন দুনিয়ার কষ্ট থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর রহমতের দিকে চলে যায়। কিন্তু অপরাধী বা ফাসেক ব্যক্তির মৃত্যু হলে মানুষ, জমিন, গাছপালা ও পশুরা তার থেকে স্বস্তি পায়। (বোখারি : ৬৫১২)।
এরপর মানুষ প্রবেশ করে এক দীর্ঘ জীবনে, যাকে বলে বরজখের জীবন; এটি দুনিয়া ও কেয়ামতের মাঝের সময়। কবর হলো পরকালের প্রথম ঘর। যখন মৃতকে কবর দেওয়া হয়, তখন সে শুনতে পায় তার সঙ্গীদের জুতার শব্দ, যখন তারা চলে যায়। এরপর তাকে জিজ্ঞেস করা হয় তিনটি প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর দিতে পারে খুব অল্পসংখ্যক মানুষ। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কবরের পরীক্ষা হবে দাজ্জালের পরীক্ষার মতো কঠিন।’ (বোখারি : ৭২৮৭)।
দুইজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে প্রশ্ন করেন-
‘তোমার রব কে?’
‘তোমার ধর্ম কী?’
‘তোমার নবী কে?’
যদি আল্লাহ তাকে স্থিরতা দেন, সে বলে, ‘আমার রব আল্লাহ, আমার ধর্ম ইসলাম, আর আমার নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)।’ তখন ফেরেশতারা বলে, ‘তোমার জাহান্নামের জায়গা দেখো। আল্লাহ তা বদলে তোমাকে জান্নাতে একটি জায়গা দিয়েছেন।’ এরপর সে উভয়টি দেখতে পায়। কিন্তু কাফের বা মুনাফিক বলে, ‘আমি জানি না, আমি শুধু মানুষের মতোই বলতাম।’ তখন তাকে বলা হয়, ‘তুমি জানলে না, কোরআনও পড়লে না।’ তারপর তাকে লোহার হাতুড়ি দিয়ে এমন আঘাত করা হয় যে, সে চিৎকার করে ওঠে। সেই আঘাতের শব্দ মানুষ ও জিন ছাড়া আশপাশের সব প্রাণী শুনতে পায়। (বোখারি : ১৩৩৮)।
এই পরীক্ষার পর শুরু হয় আনন্দের জীবন, নয়তো শাস্তির জীবন- যা চলবে কেয়ামত পর্যন্ত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এরপর আল্লাহ তাকে এদের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং কঠিন শাস্তি পরিবেষ্টন করল ফেরাউন সম্প্রদায়কে। এদের উপস্থিত করা হয় আগুনের সামনে সকাল ও সন্ধ্যায় এবং যেদিন কেয়ামত ঘটবে সেদিন বলা হবে, ‘ফেরাউন-সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিন শাস্তিতে।’ (সুরা গাফির : ৪৫-৪৬)।
এভাবেই এই উম্মতকেও কবরের পরীক্ষা দেওয়া হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘এই উম্মতকে তাদের কবরেও পরীক্ষা করা হবে।’ (মুসলিম : ১৬১)। একবার বিশ্বনবী (সা.) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, ‘এই দুজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, যদিও তারা বড় কোনো অপরাধ করেনি। একজন মানুষদের মধ্যে লাগাতার অপবাদ রটাত, আর অন্যজন প্রস্রাব থেকে নিজেকে বাঁচাত না।’ (বোখারি : ২১৮)।
পশু-পাখি কবরের শাস্তির শব্দ শুনতে পায়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কবরবাসীদের এমনভাবে শাস্তি দেওয়া হয়, যা সব পশু-পাখি শুনতে পায়।’ (বোখারি : ৬৩৬৬)। বিশ্বনবী (সা.) আরও বলেছেন, ‘মানুষ এই শাস্তির শব্দ না শোনার কারণ হলো, যদি এমন না হতো যে, তোমরা একে অপরকে কবর দিতে বন্ধ করে দিতে, তাহলে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম যেন তোমরাও কবরের শাস্তির সেই শব্দ শুনতে পারো, যা আমি শুনি।’ (মুসলিম : ১৬১)।
কবরের আনন্দ ও শাস্তি উভয়ই আত্মা ও শরীরের জন্য হয়। ইবনু তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত মত হলো, কবরের শাস্তি ও সুখ আত্মা ও শরীর দুটির ওপরই প্রভাব ফেলে।’ মহানবী (সা.) নিজে প্রতিটি নামাজের শেষে কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাইতেন এবং সাহাবাদেরও আশ্রয় চাইতে বলতেন। একদিন তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাও।’ সাহাবারা বললেন, ‘আমরা আল্লাহর কাছে কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই।’ (মুসলিম)। তিনি আরও বলতেন, ‘তোমাদের কেউ যখন শেষ তাশাহুদ সমাপ্ত করবে, তখন আল্লাহর কাছে চারটি জিনিস থেকে আশ্রয় চাইবে-
১. জাহান্নামের শাস্তি থেকে।
২. কবরের শাস্তি থেকে।
৩. জীবন ও মৃত্যুর পরীক্ষার মন্দ দিক থেকে।
৪. মসিহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে।’ (বোখারি : ১৩৭৭)। ইবনু আব্বাস (রা.) বলেছেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) সাহাবিদের এই দোয়া এমনভাবে শেখাতেন, যেমন তিনি কোরআনের কোনো সুরা শেখাতেন।’ (মুসলিম)।
মৃত ব্যক্তিরা কবরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে দোয়ার। এ জন্য জীবিতদের উচিত তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। কিন্তু মৃতদের কাছে চাওয়া, তাদের ডাকা বা তাদের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করা শিরক বলে গণ্য। মানবজাতির মধ্যে প্রথম শিরক শুরু হয়েছিল মৃত ব্যক্তিদের প্রতি এমন আচরণের মাধ্যমেই। কবর নিজেই এক বড় উপদেশ যা জীবিতদের অনেক কিছু স্মরণ করিয়ে দেয়। উসমান (রা.) যখন কোনো কবরের পাশে দাঁড়াতেন, তখন এত কাঁদতেন যে, তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। (মুসনাদে আহমদ)। আল্লাহর রাসুল (সা.) একবার খুতবায় কবরের ফিতনার কথা বললেন, যে ফিতনার সম্মুখীন সবাই হবে। তিনি যখন এ কথা বললেন, তখন সাহাবিগণ এত কাঁদলেন যে, আওয়াজে মসজিদ ভরে গেল। (বোখারি)।
আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস কবরের শাস্তি থেকে মুক্তির সবচেয়ে বড় উপায়। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, ‘যখন মোমিনকে কবরের মধ্যে বসানো হবে, তখন সে সাক্ষ্য দেবে, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল।’ আল্লাহতায়ালার নিম্নোক্ত বাণীর মর্ম এটাই, ‘যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী তাদের দুনিয়ার জীবনে ও আখেরাতে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন।’ (সুরা ইবরাহিম : ২৭)।
ভালো কাজ কবরের ভেতর বন্ধুর মতো সঙ্গ দেয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো মোমিনকে কবর দেওয়া হয়, তখন তার কাছে এক সুন্দর মুখের, সুন্দর পোশাক পরা ও সুগন্ধযুক্ত এক ব্যক্তি এসে বলে, ‘তুমি আনন্দিত হও, আজ তোমার সেই দিন এসেছে, যার প্রতিশ্রুতি তোমাকে দেওয়া হয়েছিল।’ মোমিন জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কে?’ সে উত্তর দেয়, ‘আমি তোমার সৎকর্ম।’ (মুসনাদে আহমদ)। তাই বুদ্ধিমান মানুষ মৃত্যুর আগে সৎকাজের পুঁজি জমা করে, কারণ আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য, মৃত্যুর সময় আসবেই, আর জীবন যতই দীর্ঘ হোক, শেষ ঠিক কবরেই। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ, তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে পৌঁছা পর্যন্ত কঠোর সাধনা করে থাক, পরে তুমি তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করবে।’ (সুরা ইনশিকাক : ৬)।
জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত, দ্রুত ফুরিয়ে যায়, দুনিয়া মানুষকে ভুলিয়ে রাখে; কিন্তু কবর মানুষকে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কবর জিয়ারত করো, কারণ এটি তোমাদের মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দেয়।’ (মুসলিম : ২১৪৯)। মহানবী (সা.) প্রায়ই সাহাবিদের কবরের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। একবার সূর্যগ্রহণের সময় তিনি নামাজ শেষে দীর্ঘ খুতবা দিয়ে শেষে বলেন, ‘তোমরা কবরের শাস্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
অতএব, তোমরা আল্লাহর কাছে কবরের শাস্তি ও পরীক্ষার ভয়াবহতা থেকে আশ্রয় চাও, পাপ থেকে দূরে থাকো, আর কবরের শান্তি ও জান্নাতের আনন্দ পাওয়ার জন্য সৎকাজে আত্মনিয়োগ করো।
(১৬-০৫-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ০৭-১১-২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস আবদুল কাইয়ুম শেখ)