প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬
বুদ্ধিমান সব মানুষই একমত যে, জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো, হৃদয়ের প্রশান্তি ও মনের শান্তি অর্জন করা। মানুষের পথ ও স্বভাব ভিন্ন হলেও সবাই এই শান্ত জীবন পাওয়ার জন্য চেষ্টা করে। কারণ এই শান্তিতেই সুন্দর জীবন ও তৃপ্তিময় জীবিকা নিহিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, অনেক মানুষ এই পথ থেকে সরে নানা ভুল পথে ঘুরে বেড়িয়েছে। অথচ আল্লাহতায়ালা তাঁর কোরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে লক্ষ্য অর্জন করার পথ দেখিয়ে বলেছেন, ‘মোমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকর্ম করবে তাকে আমি নিশ্চয়ই পবিত্র জীবন দান করব। আর তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার প্রদান করব।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৯৭)। আল্লাহর প্রতি ঈমান ও সৎকর্মই সুন্দর জীবনের মূল চাবিকাঠি।
এই আয়াতের আগের ও পরের আয়াতগুলো ভেবে দেখলে কোরআনের গভীর আলো আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়। এর আগে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কাছে যা আছে তা নিঃশেষ হবে এবং আল্লাহর নিকট যা আছে তা স্থায়ী। যারা ধৈর্য ধারণ করে আমি নিশ্চয়ই তাদেরকে তারা যা করে তা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৯৬)। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, মানুষের সুখ, আনন্দ ও মনের প্রশান্তি শুধু দুনিয়ার বাহ্যিক জিনিস বা ধন-সম্পদে নয়। এগুলো একা কখনোই প্রকৃত শান্তি দিতে পারে না, যদি না মানুষের অন্তর আল্লাহর একত্বে ভরপুর হয় ও তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী সৎকর্মে লিপ্ত থাকে। সৎকর্মই আত্মাকে পরিশুদ্ধ ও উন্নত করে। এ কারণেই আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ধন-সম্পদের আধিক্যই প্রকৃত সম্পদ নয়; বরং প্রকৃত সম্পদ হলো মনের সম্পদ।’ (সহিহ বোখারি, হাদিস : ৬৪৪৬)। অর্থাৎ প্রকৃত সুখ বাহ্যিক জৌলুসে নয়, অন্তরের অবস্থায়। এরপর আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যখন কোরআন পাঠ করবে তখন অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় নেবে। নিশ্চয়ই এর কোনো আধিপত্য নেই তাদের ওপর যারা ঈমান আনে ও তাদের প্রতিপালকেরই ওপর নির্ভর করে। এর আধিপত্য তো শুধু তাদেরই ওপর যারা একে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে এবং যারা আল্লাহর শরিক করে।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৯৮-১০০)। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, এই মহান কোরআনের মধ্যেই দুনিয়া ও আখিরাতের সুখের সব কারণ ও উপকরণ নিহিত আছে। এটি হৃদয়ের জীবন, আত্মার তৃপ্তি, জীবনের প্রকৃত আনন্দ ও আত্মার প্রশান্তি।
কোরআনের সঙ্গে জীবন যাপন তথা পড়া, বোঝা, শেখা ও সে অনুযায়ী আমল করাই প্রকৃত নেয়ামত। দুনিয়ার সব সুখ এর কাছে তুচ্ছ। একজন মুমিন যখন আল্লাহর জিকির গ্রহণ করে, তখন তার হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে যায় ও আত্মা শান্তিতে নিমজ্জিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত : ২৮)।
আর শয়তান সম্পর্কে আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায় যে, সুন্দর জীবন আসে তখনই, যখন মানুষের হৃদয় তার স্রষ্টার সঙ্গে যুক্ত থাকে, একত্বে পরিপূর্ণ হয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকে ও সৃষ্টির মুখাপেক্ষী না হয়ে আল্লাহতেই নির্ভরশীল হয়। আল্লাহর খাঁটি তাওহিদ এবং সব অবস্থায় শুধু তাঁর প্রতিই হৃদয়ের পূর্ণ ঝোঁক মানুষের নিরাপত্তা ও প্রশান্তির সবচেয়ে বড় কারণ। পরিবর্তনের ঝড় ও দুঃখ-কষ্টের ঢেউ উঠলেও এতে হৃদয় অটল থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে আর তাদের ঈমানকে জুলুম দিয়ে কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্যে। আর তারাই সৎপথপ্রাপ্ত।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৮২)। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘এই আয়াত নাজিল হলে সাহাবিরা চিন্তিত হয়ে বললেন, আমাদের মধ্যে কে আছে যে নিজের ওপর জুলুম করে না?’ তখন রাসুল বললেন, তোমরা যেভাবে ভাবছ তা নয়। এখানে জুলুম বলতে শিরক বোঝানো হয়েছে। যেমন লুকমান তার ছেলেকে বলেছিলেন, ‘হে বৎস, আল্লাহর সঙ্গে কোনো শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক চরম জুলুম।’ (সুরা লুকমান, আয়াত : ১৩)। সুতরাং একত্ববাদী মোমিনের হৃদয় ভয়াবহ পরিস্থিতি ও অস্থির সময়েও পাহাড়ের মতো দৃঢ় থাকে।
সুখ আসলে একটি লুকানো অর্থ ও অন্তরের অনুভূতি। এটি চোখে দেখা যায় না, কথায় পুরো বোঝানো যায় না, টাকা-পয়সা দিয়ে কেনা যায় না, আর দুর্গ বা প্রাচীর দিয়েও ধরে রাখা যায় না।
তবে এর কিছু স্পষ্ট প্রভাব ও উজ্জ্বল চিহ্ন আছে। একজন মোমিন তা অনুভব করে মনের প্রশান্তি, আত্মার তৃপ্তি ও স্বচ্ছলতা, হৃদয়ের শান্তি ও আনন্দের মাধ্যমে। আমরা যখন গভীরভাবে চিন্তা করে কোরআন পড়ি এবং তার অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝতে চেষ্টা করি, তখন দেখি সুরা নাহলের আয়াতগুলোতে আল্লাহতায়ালা সুন্দর জীবনের রহস্য তুলে ধরেছেন। তার আগে তিনি তাঁর অসংখ্য দয়া ও নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, ইসলাম দুনিয়ার জীবনের বাহ্যিক দিক ও বস্তুগত উপকরণকে অবহেলা করে না। ইসলাম বাস্তব জীবন ও তার আনন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ধর্ম নয়। তবে ইসলাম এসব বিষয়কে শুধু উপায় ও মাধ্যম হিসেবে দেখেছে যে, শুধু এগুলোর মাধ্যমেই মানুষের প্রকৃত সুখ আসে না। প্রকৃত সুখ ও হৃদয়ের শান্তি আল্লাহর প্রতি খাঁটি ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমে এসে থাকে। এ কারণেই ওই আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় আল্লাহতায়ালা কোরআন অস্বীকারকারীদের দুরবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটা এই জন্য যে, তারা দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের ওপর প্রাধান্য দেয় এবং আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ১০৭)।
এতে বোঝানো হয়েছে যে, তারা শুধু বস্তুগত কারণের ওপর নির্ভর করেছে ও জীবনের আসল উদ্দেশ্য ভুলে গেছে। এরপর আল্লাহ নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতার ভয়াবহ পরিণতি একটি উদাহরণের মাধ্যমে তুলে এভাবে ধরেছেন, ‘আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেখানে আসত সর্বদিক থেকে এর প্রচুর জীবনোপকরণ; এরপর তা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল, ফলে তারা যা করত তার জন্যে আল্লাহ তাদেরকে স্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের। তাদের কাছে তো এসেছিল এক রাসুল তাদেরই মধ্য থেকে, কিন্তু তারা তাকে অস্বীকার করেছিল। ফলে সীমালঙ্ঘন করা অবস্থায় শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করল।’ (সুরা নাহল : ১১২-১১৩)।
এরপর আল্লাহ স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, জীবনের বৈধ আনন্দ ও সৌন্দর্য উপভোগ করতে কোনো বাধা নেই, তবে তা থেকে হবে আল্লাহকে স্মরণ করে ও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে হালাল ও পবিত্র যা দিয়েছেন তা হতে তোমরা আহার করো। আর আল্লাহর অনুগ্রহের জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, যদি তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করো।’ (সুরা নাহল : ১১৪)। এভাবে একজন মোমিনের জীবন হয় ভারসাম্যপূর্ণ। একদিকে আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক, তাঁর একত্বে বিশ্বাস ও ইবাদত; অন্যদিকে জীবনের প্রয়োজনীয় উপায় গ্রহণ ও দুনিয়ার বৈধ আনন্দ উপভোগ। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ঐশী জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের জীবনের সব দিককে অন্তর্ভুক্ত করে, আত্মার অধিকার পূরণ করে। একই সঙ্গে তাকে তার স্রষ্টা ও চিরস্থায়ী আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
জেনে রাখো, এই জুমার দিনে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিন হলো জুমার দিন। তাই এই দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো, কেননা তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৩১)।
(০৪-০৮-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ২৩-০১-২০২৬ থ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস- আবদুল কাইয়ুম শেখ)