প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৯ এপ্রিল, ২০২৬
মানুষ অবশ্যই দরিদ্র ও তার প্রতিপালক ও মালিকের প্রতি মুখাপেক্ষী; তিনিই তাকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে সুগঠিত করেছেন, তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করেছেন ও তাকে জীবিত করেছেন; তিনি তাকে রিজিক দিয়েছেন, দান করেছেন ও সমৃদ্ধ করেছেন; তিনি তাকে আহার করিয়েছেন ও পান করিয়েছেন; তিনি তাকে আচ্ছাদিত করেছেন ও পরিধান করিয়েছেন; তিনি তাকে আরোগ্য দিয়েছেন ও সুস্থতা দান করেছেন। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘সমুদ্রে যখন তোমাদের বিপদ স্পর্শ করে তখন শুধু তিনি ছাড়া অপর যাদের তোমরা আহ্বান করে থাক তারা অন্তর্হিত হয়ে যায়।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৬৭)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকলের জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহরই। তিনি এদের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত; সুস্পষ্ট কিতাবে সব কিছুই আছে।’ (সুরা হুদ : ৬)।
প্রার্থীদেরকে কাঙ্ক্ষিত বস্তু দেওয়া ও বিপদগ্রস্তদের প্রয়োজন পূরণ করার ক্ষমতা একমাত্র বিশ্বজগতের প্রতিপালকেরই আছে; তিনিই প্রত্যেক প্রার্থনাকারীর জবাব দেন, প্রত্যেক আশাবাদীকে দান করেন; তাঁর ভাণ্ডার কখনও কমে না, তাঁর কাছে যা আছে তা কখনও শেষ হয় না। মানুষের চাহিদা গণনা করে শেষ করা যায় না, কোনো সীমায় থেমে থাকে না; এগুলোকে একমাত্র একক ও অদ্বিতীয় সত্তাই পরিবেষ্টন করে। আবু জর (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, ‘হে আমার বান্দাগণ! আমি আমার ওপর জুলুম হারাম করেছি এবং তোমাদের মাঝেও তা হারাম করেছি; সুতরাং তোমরা একে অপরের উপর জুলুম করো না। হে আমার বান্দাগণ, তোমাদের সবাই পথভ্রষ্ট, তবে যাকে আমি হিদায়াত দিই সে ছাড়া; অতএব, তোমরা আমার কাছে হেদায়াত চাও, আমি তোমাদের হেদায়াত দেব। হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের সবাই ক্ষুধার্ত, তবে যাকে আমি আহার দেই সে ছাড়া; সুতরাং তোমরা আমার কাছে আহার চাও, আমি তোমাদের আহার দেব। হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের সবাই বস্ত্রহীন, তবে যাকে আমি বস্ত্র দিই সে ছাড়া; সুতরাং তোমরা আমার কাছে বস্ত্র চাও, আমি তোমাদের বস্ত্র দেব। হে আমার বান্দাগণ! তোমরা রাত-দিন পাপ করো, আর আমি সব গোনাহ ক্ষমা করি; সুতরাং তোমরা আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাদের ক্ষমা করব। হে আমার বান্দাগণ! তোমরা কখনোই আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, আর আমার কোনো উপকারও করতে পারবে না। হে আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ, মানুষ ও জিন- সকলেই তোমাদের মধ্যকার সবচেয়ে পরহেজগার ব্যক্তির হৃদয়ের মতো হয়ে যায়, তাতে আমার রাজত্বে কিছুই বৃদ্ধি পাবে না। হে আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ, মানুষ ও জিন- সকলেই তোমাদের মধ্যকার সবচেয়ে পাপিষ্ঠ ব্যক্তির হৃদয়ের মতো হয়ে যায়, তাতে আমার রাজত্বে কিছুই কমবে না। হে আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ, মানুষ ও জিন- সবাই একটি ময়দানে দাঁড়িয়ে আমার কাছে চায়, আর আমি প্রত্যেককে তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু দিই, তবুও আমার কাছে যা আছে তা এতটুকুও কমবে না- যেমন সমুদ্রে সূঁচ ঢোকালে যতটুকু পানি কমে।
হে আমার বান্দাগণ! এগুলো তোমাদেরই আমল, আমি তা গণনা করে রাখি, তারপর তোমাদের পূর্ণ প্রতিদান দেব; যে ভালো পায়, সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে; আর যে অন্য কিছু পায়, সে যেন নিজেকেই দোষারোপ করে।’ (মুসলিম : ৬৪৬৬)।
দোয়া হলো ইবাদত। এটি নৈকট্য অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠমাধ্যম ও মহান ইবাদতসমূহের একটি। এর মর্যাদা মহান, এর উপকার সর্বব্যাপী। এর মাধ্যমেই নেয়ামত আহরণ করা হয় ও বিপদণ্ডআপদ প্রতিরোধ করা হয়। দোয়া হলো প্রয়োজন পূরণ, কামনা অর্জন, মর্যাদা বৃদ্ধি, সব কল্যাণ লাভ এবং অকল্যাণ ও অনিষ্ট দূর করার সর্বশ্রেষ্ঠ দ্বার। দোয়া বিপদের সময় মোমিনের সঙ্গী ও তীব্র দুঃখ-কষ্টের সময় তার সান্ত¡না। এর মাধ্যমে মজলুম সাহায্য পায়; কারণ তার দোয়ার মাঝে ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই। এর দ্বারা প্রয়োজন পূরণ হয়, বিপদ ও শাস্তি দূর হয়। আর তাকদিরকে ফিরিয়ে দেয় কেবল দোয়াই।
সুতরাং তোমরা দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ধাবিত হও; কারণ আল্লাহর কাছে দোয়ার চেয়ে সম্মানিত কিছু নেই। তোমরা হাত আকাশের দিকে উঠাও এবং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করো। তোমরা তোমাদের রবকে বিনয় ও গোপনে ডাকো; কারণ এটা অক্ষমতা ও ক্ষতি রোধ করে। যে বান্দা তার প্রভুর কাছে নিজের প্রয়োজন চাওয়া থেকে বিমুখ হয় সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি দয়ালু, করুণাময়, অমুখাপেক্ষী, সর্বশক্তিমান মহান। তাঁর দরজাগুলো কখনো বন্ধ হয় না, তাঁর হাত প্রসারিত। তিনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যয় করেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর হাত পরিপূর্ণ; খরচ করা তা কমায় না। তিনি রাত-দিন অবিরাম দান করে চলেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ, আসমান-জমিন সৃষ্টি করার পর থেকে তিনি কত ব্যয় করেছেন? তবুও তাঁর হাতে যা আছে, তা হতে এতটুকুও কমেনি।’ (বোখারি : ৪৬৮৪)। নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন তাদের প্রয়োজন পূরণ করে দেওয়ার মাধ্যমে; তিনি তাদের দোয়া করতে আদেশ করেছেন, তাদের কবুলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ও যাকে ইচ্ছা তাকে এর তাওফিক দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির : ৬০)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে তোমাকে প্রশ্ন করে, আমি তো নিকটেই। প্রার্থনাকারী যখন আমার নিকট প্রার্থনা করে আমি তার প্রার্থনায় সাড়া দেই। সুতরাং তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক আর আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা ঠিক পথে চলতে পারে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৬)। উবাদা ইবনে সামিত (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পৃথিবীতে কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কোনো দোয়া করলে, আল্লাহ তাকে তা দেন অথবা সমপরিমাণ কোনো অনিষ্ট তার থেকে দূর করে দেন, যতক্ষণ না সে গোনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করে।’ তখন এক ব্যক্তি বলল, তাহলে আমরা বেশি বেশি দোয়া করব। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ আরও বেশি দান করেন।’ (তিরমিজি : ৩৫৭৩)।
হে মানুষ, উত্তম সময়গুলো খুঁজে নাও; কারণ তখন দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ও চাওয়া অধিক উপযুক্ত। বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সেজদার অবস্থায়।
সুতরাং তখন বেশি বেশি দোয়া করো। জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, যে সময় কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে ভালো কিছু চাইলে তিনি তাকে তা দেন। রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ আসমানে নেমে বলেন, ‘কেউ কি আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কেউ কি আছে যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দেব?’ আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। লাইলাতুল কদর দোয়া কবুলের জন্য অধিক উপযোগী। আর যে দোয়াগুলো কবুল হয় তার মধ্যে আছে: রোজাদারের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া, মজলুমের দোয়া, পিতা-মাতার দোয়া, অসহায় ব্যক্তির দোয়া, নেককার ব্যক্তির দোয়া ও এক মুসলিমের জন্য আরেক মুসলিমের অদৃশ্যে করা দোয়া।
দোয়া ইবাদত। সুতরাং এতে একমাত্র আল্লাহর কাছেই একনিষ্ঠভাবে আশ্রয় নাও, তাঁর কোনো শরিক নেই। সুখের সময়ে আল্লাহকে চিনে রাখো; তিনি দুঃসময়ে তোমাদের সঙ্গে থাকবেন। স্বচ্ছলতায় তাঁর সঙ্গে থাকো; তিনি কষ্টের সময় তোমাদের সঙ্গে থাকবেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, একদিন আমি রাসুুলুল্লাহ (সা.)-এর পেছনে ছিলাম, তখন তিনি বললেন, ‘হে বালক, আমি তোমাকে কিছু কথা শিখাই: আল্লাহর নির্দেশ হেফাজত কর (মানো), তিনি তোমাকে হেফাজত করবেন। আল্লাহকে হেফাজত কর, তুমি তাঁকে তোমার সামনে পাবে। যখন কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছেই চাও; আর সাহায্য চাইলে, আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাও। জেনে রাখো, যদি সমগ্র মানুষ তোমার কোনো উপকার করতে একত্রিত হয়, তারা তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন তা ছাড়া। আর যদি তারা তোমার ক্ষতি করতে একত্রিত হয়, তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যতটুকু আল্লাহ তোমার ওপর নির্ধারণ করেছেন তা ছাড়া। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে ও পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে।’ (তিরমিজি : ২৫১৬)।
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় যে কঠিন সময় ও বিপদের সময় আল্লাহ তার দোয়া কবুল করুন, সে যেন স্বচ্ছল সময়ে বেশি বেশি দোয়া করে।’ (তিরমিজি : ৩৩৮২)।
দোয়া কবুল হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, আল্লাহর কাছে সত্যনিষ্ঠভাবে ফিরে যাওয়া, বিনয় ও একাগ্রতা, নম্রতা ও আনুগত্য এবং দোয়ায় সীমালঙ্ঘন না করা। তাই তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে, সন্তানদের বিরুদ্ধে বা সম্পদের বিরুদ্ধে দোয়া করো না। কেউ যেন জুলুম বা গুনাহের জন্য, কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া না করে। যখন তোমাদের কেউ দোয়া করবে, সে যেন নিচু স্বরে করে ও দৃঢ়ভাবে চায়। মুসলিমের উচিত আন্তরিকভাবে দোয়া করা ও দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ তা কবুল করবেন, শুনবেন ও জবাব দেবেন; কারণ তিনি এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর তিনি কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে দোয়া কর এই বিশ্বাস নিয়ে যে, তা কবুল হবে; এবং জেনে রাখো, আল্লাহ এমন অন্তর থেকে দোয়া কবুল করেন না, যা উদাসীন ও অমনোযোগী।’ (তিরমিজি : ৩৪৭৯)।
(১৫-১০-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ০৩-০৪-২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস- আবদুল কাইয়ুম শেখ)