ঢাকা সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নবীপত্নীদের কামরার স্মৃতি

বিদ্বান নবীপত্নী উম্মে সালামা (রা.)

নূর মুহাম্মদ রাহমানী
বিদ্বান নবীপত্নী উম্মে সালামা (রা.)

উম্মে সালামা (রা.)। পৃথিবীর ইতিহাসে পূর্ণিমার মতো উজ্জ্বল এক নাম। নাম লিখিয়েছেন উম্মুল মোমিনের খাতায়। ইলম প্রজ্ঞা এবং সম্মানে অনন্য। প্রকৃত নাম হিন্দ। বাবা কোরাইশ বংশের মাখজুম গোত্রের সাহল ইবনুল মুগিরা ইবনে আবদুল্লাহ। মতান্তরে আবদুল্লাহ ইবনে হুজাইফা। তিনি অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। সাধারণত যখন কোনো সফরে বের হতেন, সফরসঙ্গীদের ব্যয়ভার তিনিই বহন করতেন। এ কারণে তাকে ‘জাদুর রাকিব’ (সফরসঙ্গীদের ব্যয়ভার বহনকারী) বলা হতো। সম্ভ্রান্ত বংশে লালিত-পালিত হওয়ায় উম্মে সালামা (রা.) এর স্বভাবেও আভিজাত্য, লাজুকতা ও দানশীলতার প্রভাব ছিল।

কারও কারও মতে, তার নাম রামলা। তবে আল্লামা ইবনে আবদুল বার (রহ.)-এর বর্ণনা মতে বেশ ক’জন আলেম হিন্দ নামটা সমর্থন করেছেন। (আলামুন নিসা : ৫/২২১ ও ২২২)। তিনি নবীজির নবুওয়াতের আনুমানিক ৯ বছর আগে ৫৯৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

মা আতেকা বিনতে আমের ইবনে মালেক। কেউ কেউ আতেকাকে নবী (সা.) এর ফুফু বলেও উল্লেখ করেছেন। (আল-কামেল ফিত-তারিখ, ইবনুল আসির : ১/৫৯৪)। আতেকা একজন বিদগ্ধ জ্ঞানী নারী। সম্ভ্রান্ত বংশে বড় হয়েছেন। ৬০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেছেন। মৃত্যুর সময় বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

উম্মে সালামা (রা.) যৌবনে আপন চাচাত ভাই আবু সালামা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল আসাদের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ প্রথম স্বামীর ঘরে তার সন্তান ছিল চারজন। যাদের নামÑ সালামা, ওমর, দুররা ও বাররা।

ইসলাম গ্রহণ : তিনি এবং তার স্বামী আবু সালামা সেই ত্যাগী সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত যারা নবুওয়াত সূচনাকালের অল্প কয়েক দিন পরই ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হন। নবী (সা.)-এর দাওয়াতে তখন মাত্র ১০ জন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছেন। নবী (সা.) ধারাবাহিকভাবে মেহনত করছিলেন। একদিন দারে বনু আরকামে কয়েকজন সাহাবির সঙ্গে বসা ছিলেন। এরই মধ্যে বিবিসহ আবু সালামা উপস্থিত হলেন। নবী (সা.) আবু সালামার আসায় অনেক খুশি হলেন, ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন এবং পবিত্র কোরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। কোরআন শোনার পর আবু সালামা বললেন, ‘ভাই হওয়ার সুবাদে আমারও এ হক আছে, আমিও এ আলো থেকে নিজের রুহকে আলোকিত করব, যার থেকে অন্যরা উপকৃত হচ্ছে।’ এ কথা শুনে নবী (সা.) খুবই খুশি হলেন। আবু সালামা দ্বিতীয়বার বললেন, আমরা স্বামী-স্ত্রী উভয়কে মুসলমান বানিয়ে আপনার আনুগত্যে অন্তর্ভুক্ত করবেন! অতঃপর কালেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণে ধন্য হলেন।

কাফেরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি পর্যায়ক্রমে আবিসিনিয়া, মক্কা-মদিনায় হিজরত করেন। বরণ করেছেন এক বছরের কৃতদাসীর জিন্দেগিও।

স্বামী আবু সালামা উহুদ যুদ্ধে আহত হন। এরপর আর সুস্থ হননি। চতুর্থ হিজরির জুমাদাস সানি মাসে শাহাদতবরণ করেন। নবী (সা.) তার জানাজার ইমামতি করেন।

জীবন পরিবর্তনকারী দোয়া : স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি যে কোনো শোকে পড়ার সুন্নত দোয়া পড়তেন ‘আল্লাহুম্মা আজিরনি ফি মুসিবাতি ওয়াখলুফ লি খাইরাম মিনহা।’ (অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আমার এ বিপদে আমাকে প্রতিদান দিন এবং আমাকে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় প্রদান করুন।’ দোয়াটি করতেন আর মনে মনে চিন্তা করতেন, আবু সালামার চেয়ে আর কে ভালো হবে! তিনি তো ছিলেন অনেক উন্নত চরিত্রের মানুষ। এ দোয়ার বদৌলতেই স্বামী হিসেবে পেয়েছেন তিনি মহানবী (সা.) কে।

ইতিহাস গ্রন্থে আছে, উম্মে সালামা (রা.) স্বামী আবু সালামা (রা.) কে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমাদের দু’জনের যে কেউ আগে ইন্তেকাল করবে, সে যেন দ্বিতীয় বিয়ে না করে। যাতে বেহেশতেও আমরা একসঙ্গে থাকতে পারি। আবু সালামা (রা.) তখন এ দোয়া করলেন আমার মৃত্যুর পর উম্মে সালামা এমন একজনকে বিয়ে করুক, যে তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। ইনসাফের আচরণ করবে। আবু সালামা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। প্রস্তাব দিয়েছেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.)ও। কিন্তু উম্মে সালামা (রা.) তা গ্রহণ করেননি। পরে মহানবী (সা.) বিয়ের প্রস্তাব দিলেও প্রথম তা এড়িয়ে যান। মহানবী (সা.) দ্বিতীয়বার লোক পাঠিয়ে প্রস্তাব দিলে তিনি তা গ্রহণ করেন। এ বছরেই (প্রথম কিংবা দ্বিতীয় হিজরি) নবী (সা.)-এর সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ বিয়েতে খুতবা দিয়েছেন ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)।

জ্ঞান-গরিমা : তিনি ছিলেন বিদ্বান ও বিদ্যোৎসাহী। ছিলেন হাদিস শাস্ত্রের ধ্রুবতারা। সফলতা ও সাধনার মূর্তপ্রতিক। সাহাবি ও তাবেয়িদের বড় একটি দল তার থেকে জ্ঞানার্জন করেছে। মতবিরোধ চলছিল, সমাধান হচ্ছিল নাÑ এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ মাসালায় তার শরণাপন্ন হয়েছেন। তিনি নবীজির অনেক হাদিস বর্ণনা করেছেন। তার বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ৩৭৮। বোখারি ও মুসলিমে রয়েছে ২৯টি।

হাদিস ছাড়াও তিনি তফসির, ফিকহ, বংশবিদ্যা ও সামাজিক রীতিনীতি বিষয়ে অগাধ জ্ঞান রাখতেন। কবিতা আর সাহিত্য তো ছিল তার নিয়মিত চর্চার বিষয়। তিনি যেহেতু অনেক বিচক্ষণ ও জ্ঞানী ছিলেন, এজন্য নবী (সা.)-এর অন্য স্ত্রীরা তাকে আলাদাভাবে সমীহ করতেন।

হাফসা (রা.) ও আয়েশা (রা.) উম্মে সালামা (রা.) এর খর্বাকৃতি ও পোশাক নিয়ে কৌতুক করলে তার নিন্দায় সুরা হুজুরাতের ১১ নম্বর আয়াত নাজিল হয়। উম্মে সালামা (রা.) আরও কয়েকটি নাজিলের প্রেক্ষাপট। সুরা আলে ইমরানের ১৯৫ নম্বর আয়াতের শানে নজুলে এসেছে। একদিন তিনি নবীকে (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর নবী! হিজরতের ব্যাপারে শুধু পুরুষের নাম নেওয়া হয়েছে, নারীদের ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিতও করা হয়নি! এর উত্তরে আল্লাহ তায়ালা নবী (সা.)-এর ওপর উল্লেখিত আয়াত নাজিল করেন।

নবী (সা.) আসরের পর পালাক্রমে সব স্ত্রীর কাছে যেতেন। শুরুটা করতেন উম্মে সালামা (রা.) দিয়ে। কেন না, তিনি বয়সে স্ত্রীদের সবার বড় ছিলেন। আয়েশা (রা.) দিয়ে শেষ করতেন, কেন না তিনি সবার ছোট ছিলেন।

নবীসেবার আগ্রহ : জ্ঞানের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র উম্মে সালামা (রা.) নবীসেবায়ও অনন্য উপমা। জান-প্রাণ দিয়ে খেদমত করেছেন প্রিয় নবীর। কৃতদাসী সাফিনাকে নবীজির খেদমতের শর্তে স্বাধীন করে দিয়েছেন। সাফিনা (রা.) বলেন, মুক্তিতে উম্মে সালামা শর্তারোপ না করলেও আমি মৃত্যু পর্যন্ত নবীজির সঙ্গ ত্যাগ করতাম না।

তিনি বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তন্মধ্যে হুদায়বিয়া, খায়বার, মক্কা বিজয়, হাওয়াজেন, সাকিফ, তায়েফ ও বিদায় হজের সফরে নবীজির সঙ্গে ছিলেন।

তিনি অনেক বুদ্ধিমতি ও জ্ঞানী ছিলেন। ষষ্ঠ হিজরিতে হুদায়বিয়ার সন্ধির পর নবী (সা.) মাথা মু-ন ও কোরবানি করার তাকিদ করলে সন্ধির কিছু শর্ত আপাতদৃষ্টিতে ইসলামের বিরুদ্ধে হওয়ায় সাহাবিরা ইতস্ত করছিলেন। তখন উম্মে সালামাই নবীজিকে পরামর্শ দিলেন, দ্বিতীয়বার আর আদেশ না করে বরং তিনি নিজেই যেন এ কাজ শুরু করে দেন। হলোও তাই। নবী (সা.) নিজে মাথা মু-ন শুরু করতেই সাহাবিরাও মাথা মু-ণ করতে লাগলেন।

নবুওয়াতের সুগন্ধি : তিনি নিজেই বলেছেন, নবী (সা.) এর ইন্তেকালের দিন আমার হাত নবী (সা.) এর বুকে রেখেছি। কয়েক জুমা পার হয়ে গেছে, আমি পানাহার করছি, অজুতে হাত ধৌত করছি; কিন্তু মেশকের সুগন্ধ আমার হাত থেকে যাচ্ছে না।

মৃত্যু : নবী (সা.) এর স্ত্রীদের মধ্যে তিনি সর্বশেষ ইন্তেকাল করেন। নবীর স্ত্রী হিসেবে তার গর্ভে কোনো সন্তান আসেনি। আবু হুরাইরা (রা.) জানাজার নামাজের ইমামতি করেন। জান্নাতুল বাকিতে তাকে দাফন করা হয়। মৃত্যু সন নিয়ে মতবিরোধ আছে। কারও মতে ৫৩, কারও মতে ৫৯ আবার কারও মতে ৬২ কিংবা ৬৩ হিজরি।

লেখক : শিক্ষক, হাদিস ও ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ

আল্লাহর নবী (সা.) এর কবর মোবারকে প্রবেশের দরজা। এটি ছিল উম্মুল মোমিনিন আয়েশা (রা.) এর কামরা। এর পরপর সারিবদ্ধভাবে ছিল নবীপতœী ও উম্মতের মাতা তথা উম্মুল মোমিনিনদের কামরা। এখানে আশপাশেই ছিল উম্মে সালামা (রা.) ঘর।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত