প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৫ জুন, ২০২৬
মসজিদগুলো আল্লাহর জমিনে তাঁর ঘর। এগুলো তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান হলো মসজিদগুলো, আর সবচেয়ে অপছন্দনীয় স্থান হলো বাজারগুলো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪১৪) মহান আল্লাহ মসজিদ নির্মাণ ও সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে এগুলো হয় তাঁর স্মরণ, তাসবীহ ও মহিমা ঘোষণার স্থান। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সে সব গৃহে যাকে সমুন্নত করতে ও যাতে তাঁর নাম স্মরণ করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে সেসব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান হতে বিরত রাখে না, তারা ভয় করে সেই দিনকে যেই দিন অনেক অন্তর ও দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে- যাতে তারা যে কর্ম করে তার জন্যে আল্লাহ তাদেরকে উত্তম পুরস্কার দেন ও নিজ অনুগ্রহে তাদের প্রাপ্যের অধিক দেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবিকা দান করেন।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩৬-৩৮)।
মসজিদগুলোকে আবাদ করে এমন লোকেরা, যারা দিনে ও রাতে পাঁচবার তা দেখাশোনা করে; যাতে তারা আল্লাহর ফরজ ইবাদতগুলো আদায় করতে পারে। আল্লাহ মসজিদে আগমনকারীদের ঈমানদার বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সুতরাং, মসজিদে নিয়মিত যাতায়াত করে শুধু সেই ব্যক্তি, যে আখিরাতকে ভয় করে ও তার রবের রহমত কামনা করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারাই তো আল্লাহর মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে, যারা ঈমান আনে আল্লাহ ও আখিরাতে। আর সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় ও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও ভয় করে না। কাজেই আশা করা যায়, তারা হবে সৎপথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ১৮)
মুসলমানের মন মসজিদের জন্য আকুল হয়, তার হৃদয় এর প্রতি আকৃষ্ট হয়, যখনই সে সেই মহান প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করে, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদ আবাদকারীদের সুসংবাদ হিসেবে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সকাল বা সন্ধ্যায় মসজিদে যায়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি আবাস প্রস্তুত করেন, যখনই সে যাওয়া-আসা করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪১০)
মুসলমান মসজিদকে আবাদ করে তার রবের জিকিরের মাধ্যমে, তাঁর কিতাব তিলাওয়াতের মাধ্যমে, ফরজ ইবাদত আদায়ের মাধ্যমে; সেখানে বেশি বেশি নফল ইবাদত করে, উত্তম শরয়ি জ্ঞান অর্জন করে। এই কারণেই মসজিদ নির্মিত হয়েছে। এগুলোকে অর্থহীন কথা, অনর্থক আলোচনা, খেলাধুলা ও ফালতু প্রশ্ন থেকে পবিত্র রাখা হয়েছে। প্রখ্যাত তাবেঈ ইমাম সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রহ. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মসজিদে বসে, সে যেন তার রবের সঙ্গেই বসে; তাই তার জন্য উচিত নয় ভালো কথা ছাড়া অন্য কিছু বলা।’ যে ব্যক্তি মসজিদে বসে তার রবকে স্মরণ করে, তাকে ফেরেশতারা ঘিরে রাখে, তার ওপর রহমত নেমে আসে, তার ওপর প্রশান্তি অবতীর্ণ হয় এবং আল্লাহ তাঁকে তাঁর নিকটবর্তী লোকদের মাঝে স্মরণ করেন। আর যার হৃদয় মসজিদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে যখনই সে মসজিদ থেকে বের হয়, পুনরায় ফিরে আসা পর্যন্ত, সে সেই সাত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে আল্লাহ তার ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না; এ কথা রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের জানিয়েছেন।
যে ব্যক্তি মসজিদের দিকে অগ্রসর হয়, তার প্রতিটি পদক্ষেপে একদিকে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে একটি গুনাহ মাফ হয়ে যায়। ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর যে ব্যক্তি মসজিদে বসে নামাজের অপেক্ষা করে, সে যেন নামাজরত ব্যক্তির সমান সওয়াব পায়। এই মহান ফজিলতগুলো সম্পর্কে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির জামাআতের সঙ্গে সালাতের সওয়াব, তার নিজের ঘরে ও বাজারে আদায়কৃত সালাতের সওয়াবের চেয়ে পঁচিশ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর কারণ এই যে, সে যখন উত্তমরূপে অজু করলো, অতঃপর একমাত্র সালাতের উদ্দেশে মসজিদে রওয়ানা করল তখন তার প্রতি কদমের বিনিময়ে একটি মর্তবা বৃদ্ধি করা হয় ও একটি গুনাহ মাফ করা হয়। সালাত আদায়ের পর সে যতক্ষণ নিজ সালাতের স্থানে থাকে, ফেরেশতাগণ তার জন্য এ বলে দুআ করতে থাকেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি তার উপর রহমত বর্ষণ করুন ও তার প্রতি অনুগ্রহ করুন।’ আর তোমাদের কেউ যতক্ষণ সালাতের অপেক্ষায় থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সে সালাতে রত বলে গণ্য হয়।’ (সহিহ বোখারি, হাদিস: ৬৪৭)
ইসলামে মসজিদের মর্যাদা, আল্লাহর কাছে এর ভালোবাসা ও এর সম্মানের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তাঁর সম্মানিত মসজিদ নির্মাণ করেছেন। তাঁর সাহাবিরাও এতে তাঁকে সাহায্য করেছেন। এর আগে তিনি মসজিদে কুবা নির্মাণ করে মসজিদ নির্মাণে উৎসাহ দিয়েছেন। কারণ এতে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান ও মহান পুরস্কারের ওয়াদা করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর থেকে বহু বর্ণনা রয়েছে। মুমিনদের নেতা উসমান ইবন আফফান রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামণ্ডকে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ একটি ঘর নির্মাণ করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৩৬০)
অতএব, হে আল্লাহর বান্দাগণ! এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে, মসজিদ হলো সৎকর্মশীলদের বিশ্রামের স্থান ও মুমিনদের মিলনস্থল। আবু ইদরিস খাওলানি রহ. বলেছেন, ‘মসজিদ হলো সম্মানিত লোকদের আসন।’ মসজিদে ইসলামের একটি মহান উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়। আর তা হলো ঈমানের ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা। এখানে একজন মুসলমান আরেক মুসলমানের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করে, তাকে সালাম দেয়; ফলে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতি ছড়িয়ে পড়ে। তারা একে অপরের খোঁজখবর নেয়, নেক কাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে এবং সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়। এগুলোই মসজিদ আবাদ করার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ও নির্মাণের মহান কারণ।
মসজিদগুলো আল্লাহর ঘর। এগুলো শুধুু তাঁর জিকির কায়েম করার জন্যই নির্মিত হয়েছে। এতে শিষ্টাচার মানা আবশ্যক; কারণ এটি আল্লাহর সঙ্গে শিষ্টাচারের অংশ। তাই যে ব্যক্তি এতে দাঁড়ায়, সে যেন শুধু ভালো কথাই বলে ও ভালো কাজই করে। এখানে শুধু আখিরাতের কাজই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এতে দুনিয়াবি সব কাজ পরিহার করতে হবে; এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন। এতে জীবিকা ও উপার্জনের আলোচনা থেকেও বিরত থাকতে হবে। আর মানুষের দোষচর্চা, গীবত, অপবাদ দেওয়া, উচ্চস্বরে কথা বলা, হাসাহাসি, হইচই, তর্ক-বিতর্ক ও অতিরিক্ত খোঁজখবর নেওয়াও বর্জনীয়।
মসজিদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আদব হলো, যে কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এতে প্রবেশ করে, তার জন্য এটি আবশ্যক যে, সে যেন আল্লাহ ছাড়া কাউকে না ডাকে, তার মর্যাদা যত বড়ই হোক না কেন। আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে কল্যাণ বা উপকার আশা করবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এবং এই যে মসজিদগুলো আল্লাহরই জন্যে। সুতরাং আল্লাহর সঙ্গে তোমরা অন্য কাউকেও ডেকো না।’ (সূরা জিন, আয়াত: ১৮) তাই এতে শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া হবে, শুধু তাঁর সন্তুষ্টিই কামনা করা হবে ও প্রয়োজন পূরণের জন্য শুধু তাঁর কাছেই প্রার্থনা করা হবে।
মসজিদকে সম্মানিত করার অংশ হলো তা পরিষ্কার রাখা, অপবিত্রতা থেকে পবিত্র রাখা ও সুগন্ধিময় করা। কেউ যদি এতে ময়লা বা আবর্জনা দেখে তা সরিয়ে দেয়, তবে সে এ কাজে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ করল। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর রা. বলেন, 'একবার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ পড়ছিলেন। তিনি কিবলার দিকে মসজিদের দেয়ালে থুথু দেখতে পেলেন। তিনি নিজ হাতে তা মুছে ফেললেন ও বিরক্ত হলেন। তারপর বললেন, তোমাদের কেউ যখন নামাজে থাকে, তখন আল্লাহ তার সামনে থাকেন; তাই সে যেন নামাজে নিজের সামনে থুথু না ফেলে।’ (সহিহ বোখারি, হাদিস: ৬১১) ইমাম ইবন রজব রহ. বলেন, ‘মসজিদ ঝাড়ু দেওয়া ও তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস দূর করা একটি সম্মানজনক কাজ। যে ব্যক্তি শরীয়তের আদব জানে, সে এ কাজকে তুচ্ছ মনে করে না, বিশেষ করে মসজিদের ক্ষেত্রে।’
মসজিদ হলো আল্লাহর ঘর ও ফেরেশতাদের অবতরণের স্থান। তাই এগুলোকে দুর্গন্ধযুক্ত জিনিস তথা রসুন, পেঁয়াজ, ধোঁয়া ইত্যাদি থেকে রক্ষা করতে হবে; এসব থেকে আল্লাহর ঘরকে পবিত্র, সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ রাখা হয়। মসজিদে আগত ব্যক্তির উচিত মনে করা যে, সে তার রবের কাছে উপস্থিত হচ্ছে ও তার সঙ্গে কথা বলছে। তাই সে যেন নিজের সাধ্য অনুযায়ী উত্তম পোশাক পরিধান করে, শরীর পরিষ্কার রাখে ও সম্ভব হলে সুগন্ধি ব্যবহার করে। অনেক মানুষ মসজিদে আসে, কিন্তু নিজের কাপড়ের পরিচ্ছন্নতা বা মুখের পবিত্রতার প্রতি গুরুত্ব দেয় না, ফলে অন্যদের কষ্ট দেয় ও তাদের নামাজে মনোযোগ নষ্ট করে! আর ফেরেশতারাও সে সব জিনিসে কষ্ট পায়, যেগুলোতে মানুষ কষ্ট পায়। এ কথা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন।
হে মুসলিম ভাইয়েরা! তোমাদের এই মাসটি একটি সম্মানিত মাস ও হারাম মাসগুলোর একটি। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটিকে ‘আল্লাহর মাস’ নামে অভিহিত করেছেন। একে আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত করা এর মর্যাদা ও ফজিলত প্রমাণ করে। এই মাসে রোজা রাখা রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাসের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৭৪২)
এই মাসের দশম দিন বা আশুরার দিনে রোজা রাখা একটি জোরালো সুন্নাহ। হযরত আবু কাতাদা রা. বলেন, এক ব্যক্তি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামণ্ডকে আশুরার রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, এটি পূর্বের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৩৬)
আর পূর্ণ ফজিলত অর্জনের জন্য এর আগে একদিন বা পরে একদিন রোজা রাখা উচিত। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জীবনের শেষ দিকে সংকল্প করেছিলেন যে, তিনি এটি একদিন একা রাখবেন না; বরং এর সঙ্গে আরেক দিন মিলিয়ে রাখবেন, ইহুদিদের বিরোধিতা করার জন্য।
তিনি বলেছেন, ‘আগামী বছর যদি বেঁচে থাকি, তাহলে ইনশাআল্লাহ নবম দিনও রোজা রাখব।’ হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘পরবর্তী বছর আসার আগেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করেন।’
হে আল্লাহর বান্দাগণ! এই বরকতময় দিনের অবশিষ্ট সময়গুলো বেশি বেশি দু’আ করে কাজে লাগাও; হয়ত তোমরা কবুলের সময় পেয়ে যাবে। আর বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ কর শেষ নবী, রাসুলদের নেতা ও সমস্ত মানবজাতির শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির ওপর। কারণ যে ব্যক্তি তার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাযিল করেন।
(০৪-০১-১৪৪৮ হিজরি মোতাবেক ১৯-০৬-২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস- আবদুল কাইয়ুম শেখ)