
রাগ মানবিক চরিত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ। রাগ নেই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্থান বিশেষ রাগের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সামগ্রিক দৃষ্টিতে রাগ কোনো ভালো গুণ নয়। রাগ মানুষকে বেসামাল করে তোলে। জ্ঞান, বিবেক ও ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত করে মানুষকে বিপথে নিয়ে যায়। দুনিয়ায় বহু অনিষ্টের কারণ রাগ। মানুষ এ রাগের বশবর্তী হয়ে অনেক নির্দয় ও অত্যাচারমূলক কাজ করে ফেলে। অথচ তিনি সর্বজনিত একজন নেককার ও ইনসাফগার মানুষ। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় কখনও কখনও মানুষ জালিম হয়ে যায়।
এ রাগের ফলে মানুষ সম্মানিত হওয়ার পরিবর্তে লজ্জা ও অবজ্ঞার শিকার হয়। তাই কারও দ্বারা কোনো ক্ষতি বা অন্যায়মূলক কাজ হয়ে গেলেও রাগ না করে ক্ষমা করা বা ধৈর্য ধারণ করা অনেক বড় গুণ।
ইমাম আযম আবু হানিফা বলেন ‘আমি জীবনে কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করিনি। কেউ আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলেও আমি এর বদলা নেইনি। না আমি কাউকে গালি দিয়েছি, না কারও ওপর জুলুম করেছি, না কারও আমানতের খেয়ানত করেছি, না কাউকে ধোঁকা দিয়েছি।’ (উকুদুল জুম্মান, পৃ. ২৮৮)।
এক.
একবারের ঘটনা। বিতর্কের বৈঠক। তর্ক শুনতে বহু মানুষের জমায়েত। দু’পক্ষে তর্ক চলছে। তর্ক তো নয় যেন মহাবাকযুদ্ধ। বিপক্ষের বিতার্কিকদের পাল্লা নত। তেজ সইতে না পেরে বিপক্ষের একজন আবু হানিফাকে বেদাআতি এবং নাস্তিক বলে গালি দেয়। আবু হানিফা সবুরের সঙ্গে বলেন, ‘মুহতারাম! আল্লাহ আপনাকে মাফ করুন। আপনি আমার ব্যাপারে যা বলেছেন তা নিতান্তই ভুল।’
তর্কের মজমায় হাজার দর্শনার্থী সামনে তর্কে না পেরে যুগের সেরা আলেমকে নাস্তিক বলে গালি দেওয়া হয়। সে অবস্থায় রাগ সংবরণ করে চুপ থাকা এবং উল্টো রসালো করে বলা ‘আল্লাহ আপনাকে মাফ করুক।’ কতখানি ধৈর্য থাকলে তা সম্ভব একটু ভাবুন তো...! (উকুদুল জুম্মান পৃ. ২২৬)।
এই জন্যেই রাসুল (সা.) রাগ সংবরণকরীকে বীর বাহাদুর বলে আখ্যা দিয়েছেন। রাসুলে আকরাম (সা.) একবার সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কাকে তোমরা অধিক শক্তিশালী মনে করো? তারা উত্তর দিলেন, যে ব্যক্তি কুস্তিতে অন্যকে হারিয়ে দিতে পারে। রাসুল বললেন, ‘সে প্রকৃত বীর নয় যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সে-ই প্রকৃত বীর যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।’ (বোখারি : ৫৬৮৪)।
দুই.
আরেকবারের ঘটনা। আবু হানিফা (রহ.) মসজিদে বসে আছেন। তাকে কেন্দ্র করে এদিক সেদিক থেকে লোকজন এসে জমা হচ্ছেন। যে যার মতো মাসআলা জিজ্ঞাসায় ব্যস্ত। বসরার এক ব্যক্তি একখান মাসআলা জিজ্ঞেস করলে আবু হানিফা এর জবাব দেন। লোকটা বলেন, এই মাসআলায় হাসান বসরী (রহ.) ভিন্নমত পোষণ করেছেন। আবু হানিফা বলেন : হাসান বসরী ভুল মত পেশ করেছেন। আবু হানিফার কথা শুনে লোকটার লেজে-গোবরে মাখামাখি। গলা ফাটিয়ে চিৎকার মেরে বলে এই হারামজাদা! হাসান বসরী মিথ্যে বলেছেন?
বন্দুকের গুলি এবং কথা দুটোই এক। মানুষকে আহত-নিহত করতে পারে। যদিও বলা হয় কথায় চিড়া ভেজে না। তবে কথায় চিড়া না ভিজলেও মানুষ কিন্তু ভেজে। তাই তো সাধক বলেছেন ‘কথার কিন্তু অনেক দোষ, ভেবেচিন্তে কথা কস।’
গালি শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে লোকজন। হৈ হুল্লা শুরু হলে আবু হানিফা সবাইকে খামোশ করিয়ে দেন। তা না হলে বড় ধরনের গ-গোল বেঁধে যেত। এত্তো কিছু হয়ে যাওয়ার পরও আবু হানিফা রাগ সংবরণ করে নীরব। (উকুদুল জুম্মান, পৃ. ২৮৭)।
তিন.
একদিন ইমাম আবু হানিফা মসজিদের কোনায় বসে সবক পড়াচ্ছেন। শাগরেদরা মনোযোগ সহকারে সবক ধরছে। মসজিদের আরেক কোনায় বসে একজন আবু হানিফার নামে মিথ্যা বুলি আওড়াচ্ছে। আবু হানিফা না শোনার ভান করে আছেন। লোকটা আরও জোর গলায় বকাঝকা করতে থাকে। এতেও কোনো কাজ হয় না। আবু হানিফা এমন ভাব নিয়ে আছেন, যেন তিনি কিছু শোনেন না। গন্ডারের চামড়ার মতো কিছুই ঢোকে না। লোকটা এটা সেটা বলে যাচ্ছে...।
শাগরেদদের সামনে এত কিছু বলার পরও না তিনি নিজে উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন, না শাগরেদের প্রতিবাদ করার সুযোগ দিয়েছেন। তারপর আবু হানিফা সব শেষ করে বাড়ির পথে হাঁটেন। লোকটা তার পিছু নেয়। তাকে চেতানোর জন্য আরও বেশি গালমন্দ করতে থাকে। তিনি নিজের মতোই আছেন, বিন্দু পরিমাণ বিরক্তবোধ করেন না।
কুকুর অপরিচিত কাউকে দেখলে পিছু পিছু যেতে যেতে যেমন বকবক করতে থাকে। লোকটাও তাই করছিল। আবু হানিফা বাড়ির সামনে গিয়ে বলেন ‘ভাই! এটা আমার বাড়ি। আপনার আরও কিছু বলার থাকলে মন খুলে বলে ফেলুন। বলা শেষ হলে আমি বাড়িতে প্রবেশ করব। আবু হানিফার বচনে লোকটা জিহ্বা কামড় দিয়ে মাথায় হাত। ভাবেÑ আমি এত কিছু বলার পরও আমার সঙ্গে এমন আচরণ...? এই হলো ইমাম আবু হানিফা। আর এই হলো তার রাগ নিয়ন্ত্রণের উপমা। (উকুদুল জুম্মান, পৃ. ২৯১)।
রাগ সংবরণ করা যেমন কষ্ট এর পুরস্কারও তেমনই মিষ্ট। রাগ সংবরণকারীর পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন স্বয়ং রাব্বুল আলামিন। এরশাদ হয়েছে, ‘যারা বড় গোনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকে এবং ক্রোধান্বিত হয়েও ক্ষমা করে দেয় (তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার)।’ (সুরা আশ-শূরা : ৩৭)।
তবে তাদেরকে কী কী পুরস্কার দেওয়া হবে, তা রাসুল বাতলে দিয়েছেন। যেমন বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধ চরিতার্থ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা সংবরণ করে, আল্লাহ তাকে কেয়ামতের দিন সমগ্র সৃষ্টির সামনে ডেকে আনবেন এবং জান্নাতের যে কোনো হুর নিজের ইচ্ছামতো বেছে নেওয়ার অধিকার দান করবেন।’ (ইবনে মাজাহ : ৪১৮৬)। রাসুল আরও বলেছেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বান্দার ক্রোধ সংবরণে যে মহান প্রতিদান রয়েছে, তা অন্য কিছুতে নেই।’ (ইবনে মাজাহ : ৪১৮৯)।