ঢাকা মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

‘ক্রীড়া কার্ড’ পেয়ে উচ্ছ্বসিত ক্রীড়াবিদরা

‘ক্রীড়া কার্ড’ পেয়ে উচ্ছ্বসিত ক্রীড়াবিদরা

দেশে ক্রিকেট এবং ফুটবলের বাহিরে খেলোয়াড়দের আর্থিক নিরাপত্তা ছিল না বললেই চলে। যে কারণে খেলায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারছেন না তারা। অবশেষে দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ক্রীড়াবিদদের জন্য চালু হলো ‘ক্রীড়া কার্ড’। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নিয়মিত আর্থিক সুবিধার আওতায় আসছেন দেশের খেলোয়াড়রা, যা ক্রীড়ায় পেশাদারিত্ব গড়ে তোলার পথে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে খেলাধুলা মানেই এতকাল বিনোদন, আর পাশাপাশি পেশা হিসেবে ধরা হতো। জাতীয় দলের ক্রীড়াবিদরা দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে কখনও কখনও থোক বরাদ্দ, প্রধানমন্ত্রীর অনুদান ছাড়া সেই অর্থে তেমন আর্থিক সুবিধা পাননি। সে কারণেই বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ‘স্পোর্টস প্রফেশনালিজম’ গড়ে ওঠেনি। খেলাধুলা করেও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল থাকা যায় স্পোর্টস ডিসিপ্লিনকে পেশা হিসেবে নেওয়া সম্ভবতা এতকাল ছিল ধারণার বাইরে। ক্রিকেটার ও ফুটবলার ছাড়া সেই অর্থে কোনো ফেডারেশনের ক্রীড়াবিদরা মাসোহারা পান না। কোনো প্রতিযোগিতা সামনে রেখে প্রস্তুতির জন্য একটি থোক বরাদ্দ থাকত ক্রীড়া পরিষদ থেকে। কখনও কখনও ফেডারেশনও ক্রীড়াবিদদের অনুশীলনের খরচ বহন করেছে। কিন্তু সরকারিভাবে ক্রীড়াবিদরা কখনোই বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুবিধা পাননি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশের ক্রীড়াবিদরা সেই কাঙ্ক্ষিত আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পেলেন।

প্রথমবারের মতো ক্রীড়া ভাতা চালু করেছে সরকার। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় তেজগাঁওস্থ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে ‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ক্রীড়া কার্ড ও ভাতা প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী ল্যাপটপে বাটন প্রেস করার সঙ্গে সঙ্গেই সোনালী ব্যাংকের অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে প্রত্যেক ক্রীড়াবিদের মোবাইলে এক লাখ টাকা পৌঁছে যায়। প্রথম দফায় ১২৯ ক্রীড়াবিদের হাতে ক্রীড়া কার্ড তুলে দেন। একইসঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জনকারী ক্রীড়াবিদদের সম্মাননা দেন।

এখন থেকে বিভিন্ন খেলার জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা করে ভাতা পাবেন। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানিয়েছেন, এপ্রিল থেকে পর্যায়ক্রমে ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে বেতনকাঠামোর আওতায় আনা হবে। সরকারের? ?এমন পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন দেশের ক্রীড়াবিদেরা। তারা বলছেন, এ উদ্যোগের ফলে খেলোয়াড়দের নিজেদের মধ্যে যেমন প্রতিযোগিতা হবে, একইভাবে সবাই চাইবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভালো করতে।

প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ভাতা পেয়ে আনন্দের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও মনে করছেন জাতীয় নারী ফুটসাল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। তার কথা, ‘এটা অনেক গর্বের একটি মূহূর্ত। ধন্যবাদ জানাই প্রধানমন্ত্রীকে। আমাদের অনেক ক্রীড়াবিদের জন্য সারপ্রাইজ ছিল এই মাসিক ভাতা। খেলোয়াড়রা এখন চোখ বন্ধ করে খেলাকে পেশা হিসাবে নিতে পারবে। আমার কাছে মনে হয়েছে, এতে খেলোয়াড়দের খেলার চাহিদা অনেক বেড়ে যেবে। যারা যখন দেখবে ভাল অর্থনৈতিক সাপোর্ট পাবে, তখন পারফরম্যান্সের অনেক উন্নতি হবে। যা অনেকটা চ্যালেঞ্জিং।’ ভাতা পেয়ে আনন্দে উদ্বেল পদকজয়ী শাটলার আল আমিন। তার কথা, ‘ধন্যবাদ জানই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্যারকে, এমন একটি উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। আমরা অনেক খুশী। ক্রীড়াবিদদের আরও ভাল করার চিন্তা করবে বিদেশে মাটিতে। সবাই এখন খেলাধূলায় আসতে চাইবে। এখান থেকে আমরা ভবিষ্যত তৈরী করতে পারব। আমার জুনিয়র যে আছে সে ভাল খেলে আমার জায়গায় আসতে চেষ্টা করবে।’

আরেক শাটলার উর্মি আক্তারের কথা, ‘আমরা গর্বিত, অনুপ্রাণিত। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে মাসিক ভাতা নেওয়া এক দারুণ অনুভূতি, যা বলে বুঝানো সম্ভব নয়।’ ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে রুপা জয়ী টেবিল টেনিস খেলোয়াড় খই খই মারমা বলেন, ‘কখনও ভাবতে পারিনি, মাসে এক লাখ টাকা করে পাবো। এটা সব ক্রীড়াবিদের জন্যই খুশীর ব্যাপার। এই ভাতা পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে চারমাস পর পর পরিবর্তন হবে। তাই ক্রীড়াবিদদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও তৈরী হবে। তাই চ্যালেঞ্জটা আমরা পজিটিভ ভাবেই নিতে চাই। আমি সব সময়ই চেষ্টা করছি দেশকে ভাল কিছু দেওয়ার। এই চ্যালেঞ্জটা আমাদের জন্য কঠিন হবে। যারা নতুন তাদের জন্যও খুবই ভাল হবে।’

দুবাইয়ে এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসের স্বর্ণ জেতা সাঁতারু মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ‘নিজেকে অনেক গর্বিত মনে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের মতো প্যারা অ্যাথলেটদের দু:খণ্ডকষ্ট বুঝতে পেরেছেন। স্বাভাবিক মানুষদের চেয়ে আমরা অনেক বেশি কষ্ট করি। দেশের জন্য আমরা কষ্ট করেছি। সরকারও আমাদের সহযোগিতা করছে। শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদরা আমাদের দেখে অনুপ্রাণিত হবে। ন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটি অব বাংলাদেশের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।’ সাবেক দ্রুততম মানব মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘একজন অ্যাথলেটের ফিটনেস ঠিক রাখা, পুষ্টির চাহিদা মেটাতেই মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা লাগে। আমরা পারফরম্যান্স করব নাকি টাকার টেনশন করব। সরকারের এই উদ্যোগ আমাদের জন্য খুবই কাজে দেবে। টাকার জন্য এখন আর কাউকে খেলা ছাড়তে হবে না। কেউ আর্থিক সমস্যা নিয়েও ভাববে না, সবার লক্ষ্য থাকবে কীভাবে ভালো পারফর্ম করা যায়।’

?সম্প্রতি এশিয়া কাপ আর্চারির (স্টেজ-১) কম্পাউন্ড পুরুষ দলগত ইভেন্টে সোনাজয়ী আর্চার হিমু বাছাড় বলছেন, ভাতাপদ্ধতি চালু হওয়ায় খেলার প্রতি সবার আগ্রহ আরও বাড়বে, ‘সরকার সত্যি দুর্দান্ত একটা পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন থেকে খেলার প্রতি সবার আগ্রহ বাড়বে। আসলে যেখানে ভবিষ্যতে নেই, সেখানে কেউ আসতেও চাইবে না। এখন যেহেতু ভালো একটা বেতন পাবে, সবাই চাইবে পারফর্ম করতে। পাইপলাইনে যারা আছে, তারা আমাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।’ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের সভাপতি মো. হাবিব উল্লাহ ডন বলেন, ‘ক্রীড়াবিদদের মাসিক এক লাখ টাকা করে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকারের অভূতপূর্ব এক সিদ্ধান্ত। এতে ক্রীড়াবিদরা অনুপ্রেরণা পাবে। তারা আরও পদক জিততে উৎসাহিত হবে।’

ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রাসেল কবিরের কথা, ‘ক্রীড়াবিদদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই উদ্যোগ সত্যিই অনেক বড় বিষয়। এতে ক্রীড়াবিদরা সামনের দিকে আরও এগিয়ে যাবে।’

আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে যেসব পরিবার তাদের সন্তানকে খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নিতে নিরুৎসাহিত করত, সেখানে পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন ?জাতীয় ব্যাডমিন্টন দলের তারকা খেলোয়াড় আল-আমিন জুমার, ‘তরুণেরা এখন ব্যাডমিন্টনে আরও বেশি আগ্রহী হবে। আগে পরিবার থেকেও বাধা আসত, এখন সবাই খেলাধুলা দিয়েই ভবিষ্যৎ গড়তে চাইবে। তবে এটা আনন্দের পাশাপাশি দারুণ চ্যালেঞ্জিংও। কারণ, আমার জুনিয়র যে আছে, সে এখন চাইবে আমার জায়গায় আসতে, আমিও চাইব পারফরম্যান্স আরও ভালো করে এই জায়গাটা ধরে রাখতে।’

এ ক্রীড়াবিদরা মনে করছেন, আর্থিক নিরাপত্তা খেলোয়াড়দের মানসিক চাপ কমাবে, যা পারফরম্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে পারফরম্যান্স ধরে রাখতে উন্নত অবকাঠামো, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও দরকার বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত