ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মিরাজদের চোখে আরও বড় স্বপ্ন

মিরাজদের চোখে আরও বড় স্বপ্ন

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় সব সময়ই বিশেষ কিছু। কারণ ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে সফল দলগুলোর একটিকে হারানো মানেই কেবল একটি ম্যাচ জেতা নয়, নিজের সামর্থ্যেরও প্রমাণ দেওয়া। দুই দশকের বেশি আগে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটকে চমকে দিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচের স্মৃতি আজও স্পষ্ট মেহেদি হাসান মিরাজের মনে! আট বছরও বয়স হয়নি তখন। টেলিভিশনের পর্দার সামনে বসে ছোট্ট এক ছেলে দেখছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় এক বিকেল। কার্ডিফে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটকে চমকে দিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচের অনেক কিছু হয়তো সময়ের সঙ্গে ঝাপসা হয়ে গেছে, কিন্তু জয়ের অনুভূতিটা থেকে গিয়েছিল মনে।

দুই দশকেরও বেশি সময় পর সেই ছেলেটিই এখন বাংলাদেশের অধিনায়ক। আর ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস-অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আরেকটি ঐতিহাসিক অর্জনের কেন্দ্রে এবার তিনিই। তবে এবার শুধু একটি ম্যাচ নয়, পুরো সিরিজ। মেহেদি হাসান মিরাজের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। টানা চারটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জয়ের ধারাবাহিকতায় এটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে আলোচিত সাফল্য। কারণ প্রতিপক্ষের নাম অস্ট্রেলিয়া-ওয়ানডে ক্রিকেটের সবচেয়ে সফল দল, বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে পেশাদার ও ধারাবাহিক শক্তিগুলোর একটি। কিন্তু এই সাফল্যের গল্প শুরু আজ থেকে নয়।

আট মাস আগেও বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেট ছিল অনিশ্চয়তায় ঘেরা। ২০২৭ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার স্বপ্ন তখনও পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না। র‌্যাঙ্কিংয়ের হিসাব-নিকাশ, পয়েন্টের সমীকরণ আর ধারাবাহিকতার অভাব নিয়ে ছিল নানা প্রশ্ন। সেই অবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ডের পর এবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয়-বাংলাদেশের ক্রিকেট যাত্রায় এটি নিঃসন্দেহে বড় এক মোড়। তবে মিরাজের চোখে সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু ট্রফি নয়, সম্মান। অধিনায়ক হিসেবে এই অর্জনগুলো নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সব মিলিয়ে আমি সন্তুষ্ট। অধিনায়ক হিসেবে অবশ্যই আমার কাছে ভালো লাগার জিনিস এগুলো। পাশাপাশি, যারা ক্রিকেট খেলা দেখছে এবং আপনারা যারা আছেন, সবাই ভালো অনুভব করছে। কারণ অস্ট্রেলিয়ার মত দলের বিপক্ষে যদি আমরা ভালো খেলতে পারি, তাহলে আমাদের জন্য একটা বিরাট সুযোগ থাকে।’ বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এখন আর কেবল সম্ভাবনাময় দল হিসেবে দেখা হচ্ছে না বলেও মনে করেন তিনি, ‘তারা কিন্তু আমাদেরকে নিয়ে কথা বলছে, প্রশংসা করছে বোলারদেরকে নিয়ে, ব্যাটসম্যানদেরকে নিয়ে এবং তাদেরকে যে আমরা কঠিন সময়টা দিচ্ছি, সেটা নিয়ে তারা আমাদেরকে সেই সম্মানটা দিচ্ছে। এটা অবশ্যই উন্নতির একটা লক্ষণ এবং আশা করি, এভাবে যদি চালিয়ে করতে পারি, আরও ভালো একটি দল হবে।’ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই সাফল্য মিরাজের কাছে ব্যক্তিগতভাবেও বিশেষ আবেগের। কারণ তিনি সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা বড় হয়েছে ২০০৫ সালের কার্ডিফ বিস্ময়ের গল্প শুনে কিংবা দেখে। তখন বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়াকে হারানো ছিল এক দিনের স্বপ্ন। আজ সেই দলের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের অধিনায়ক তিনি নিজেই। স্মৃতির সেই পাতায় ফিরে গিয়ে মিরাজ বলেন, ‘এটা অবশ্যই অনেক স্পেশাল। কারণ অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আগে আমরা কখনোই সিরিজ জিতিনি। একটা ম্যাচ আমরা হয়তো জিতেছিলাম, সেই ২০০৫ সালে। আমি অনেক ছোট ছিলাম, আমি দেখেছিলাম ম্যাচটা। আমার এখনও মনে আছে। এবার যেহেতু আমরা অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সিরিজ জিতেছি, এটা অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য বিরাট একটা অর্জন।’ তবে সিরিজ জয়ের চেয়েও যে একটি বিষয় তাকে বেশি আনন্দ দিচ্ছে, সেটিও জানাতে ভোলেননি তিনি, ‘আরও সবচেয়ে বড় অর্জন এটাই মনে করি যে, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররা আমাদেরকে নিয়ে প্রশংসা করছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে এবং বাংলাদেশের কন্ডিশন নিয়ে, উইকেট নিয়ে, ক্রিকেটারদেরকে নিয়ে। এটা আমাদের একটা বিরাট অর্জন।’ বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাম্প্রতিক সাফল্যকে অনেকেই হয়তো ফলাফলের চোখে দেখছেন। কিন্তু দলের ভেতরে বিষয়টিকে দেখা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। মিরাজের কথায় স্পষ্ট, বর্তমানের জয় তাদের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং বড় আসরের প্রস্তুতির ধাপ। তিনি বলেন, ‘আমাদের কিন্তু দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। গত এক বছরে আমাদের অনেক উন্নতি হয়েছে। এটা আসলে একদিনে সম্ভব নয়। এর আগেও বলেছি, একটা দল যখন আমরা (গঠন) করি, তখন অবশ্যই আমাদের একটা পরিকল্পনা থাকে যে, আমরা কীভাবে দলটাকে বানাব এবং কী কম্বিনেশনে আমরা খেলব।’

গত এক বছরে বিভিন্ন ক্রিকেটারকে ভিন্ন ভিন্ন পজিশনে খেলানোর পেছনেও ছিল সেই পরিকল্পনা, ‘গত এক বছর আমরা ওভাবেই পরিকল্পনা করেছি, সামনে আমাদের বিশ্বকাপ আছে, কোন পজিশনে কাকে সেট করব এবং কোন পজিশনে একটা ক্রিকেটারকে অনেক বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ দেব। এটা আমরা করেছি এবং বিভিন্ন সময় আপনারাও দেখেছেন যে, বিভিন্ন পজিশনেও খেলতে হয়েছে অনেক ক্রিকেটারকে। এটা শুধু আমাদের (দ্বিপাক্ষিক) সিরিজ না, সামনে যে বিশ্বকাপ বা এশিয়া কাপ আছে, সেটাকে লক্ষ্য করেই আমরা এগোতে চাচ্ছি এবং সেই পরিকল্পনাগুলো সাজাচ্ছি এবং আশা করি যে, আমরা ভালো একটা দলে পরিণত হয়েছি এখন।’ বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আক্ষেপগুলোর একটি হলো, দ্বিপাক্ষিক সিরিজে সাফল্য পেলেও বড় টুর্নামেন্টে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে না পারা। এশিয়া কাপ কিংবা বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ব্যবধান প্রায়ই হতাশা তৈরি করেছে। মিরাজদের এই দলটি সেই চক্র ভাঙার স্বপ্ন দেখছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয় তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে, বিশ্ব ক্রিকেটে অবস্থান আরও শক্ত করেছে, কিন্তু তাদের কাছে এটি শেষ নয়। কার্ডিফের সেই ছোট্ট দর্শক আজ বাংলাদেশের অধিনায়ক। একসময় যে জয় দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিল, আজ নিজেই তেমন এক ইতিহাসের অংশ। তবে মিরাজের ভাষায় বোঝা যায়, ইতিহাস লেখা এখনও শেষ হয়নি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত