
লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের শেষ বাঁকটা হয়তো শুধু বিদায়ের গল্প হবে না। আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের শেষ অধ্যায়ের ঘোষণা দেওয়ার পরও ক্লাব ফুটবলে চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আর সেই অধ্যায় শেষ হওয়ার পরও মেসিকে নিজেদের গল্পের অংশ করে রাখতে চায় ইন্টার মায়ামি। খেলোয়াড় হিসেবে নয়, অন্য কোনো ভূমিকায়-সম্ভবত মালিকানার অংশীদার হিসেবেও।
২০২৩ সালে মেসি মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর বদলে যায় ক্লাবটির পরিচয়। মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি বাণিজ্যিক দিক থেকেও যেন নতুন এক দরজা খুলে যায়। জার্সি বিক্রি থেকে শুরু করে দর্শক আগ্রহ, স্পনসরশিপ এবং বৈশ্বিক পরিচিতি-সবকিছুতেই মেসির উপস্থিতির ছাপ পড়েছে। ফোর্বসের হিসাবে ২০২৬ সালে ইন্টার মায়ামির মূল্য দাঁড়িয়েছে ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার, বার্ষিক আয় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার। মেসি আসার আগে ক্লাবটির মূল্য ছিল প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার!
তাই মেসিকে কেবল একজন ফুটবলার হিসেবে দেখছে না মায়ামি। ক্লাবটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তার জন্য মাঠের বাইরেও একটি জায়গা রাখতে চাইছে তারা। ইন্টার মায়ামির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের আসেনসির বক্তব্যেও সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট, 'মেসি যখন পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নেবেন, তখন ইন্টার মায়ামিতে তার সময় ও ভূমিকার জন্য একটি জায়গা রাখতে চায় ক্লাব। খেলোয়াড় থাকা অবস্থায় এমএলএসের নিয়মের কারণে মালিকানা নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও অবসরের পর সেই পথ খুলে যেতে পারে।' মেসির সঙ্গে মায়ামির সম্পর্কের শেষটা মাঠে হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং খেলোয়াড় মেসির অধ্যায় শেষ হলে শুরু হতে পারে অন্য এক মেসির গল্প!
বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী ২০২৮ মৌসুম পর্যন্ত মায়ামির সঙ্গে থাকবেন মেসি। নতুন চুক্তি ঘোষণার সময় ক্লাবও স্পষ্ট করেছে, কিংবদন্তি ফরোয়ার্ডকে আরও কয়েক বছর নিজেদের পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে তারা আগ্রহী। মেসিও মায়ামিকে শুধু ক্যারিয়ারের শেষ ঠিকানা হিসেবে দেখছেন না। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর থেকেই তিনি বলে আসছেন, এমএলএসে খেলার ইচ্ছা তার অনেক আগে থেকেই ছিল। মায়ামিকে এগিয়ে নেওয়া এবং লিগটিকে আরও বড় বৈশ্বিক মঞ্চে তুলে ধরার ভাবনাও ছিল তার পরিকল্পনার অংশ। এই সম্পর্কের আরেকটি দিকও এখন সামনে আসছে। ফুটবল থেকে অবসরের পর মেসি যে মালিকানার জগতেও পা রাখতে আগ্রহী, তার বাস্তব প্রমাণ ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালে স্পেনের ক্লাব সিডি এলদেনসের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিক হয়েছেন তিনি। এর আগে স্পেনের আরেক ক্লাব ইউই কর্নেয়াতেও মালিকানা নিয়েছেন। ফলে অবসরের পর মায়ামির মালিকানায় মেসির সম্ভাব্য প্রবেশ এখন আর নিছক কল্পনা নয়।
মায়ামির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতেও মেসিকে ঘিরে বড় ছবি আঁকা হচ্ছে। নতুন ২৭ হাজার আসনের স্টেডিয়াম, স্টেডিয়াম ঘিরে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে ক্লাবটির প্রভাব বাড়ানোর পরিকল্পনায় মেসির উপস্থিতি নিঃসন্দেহে বড় সম্পদ। নতুন স্টেডিয়াম প্রকল্পের সঙ্গে অফিস, খুচরা ব্যবসা, হোটেল ও পার্কসহ বড় বাণিজ্যিক উন্নয়নও যুক্ত হচ্ছে। মাঠে মেসি যতদিন থাকবেন, ততদিন তার গোল-অ্যাসিস্ট আর ট্রফিই আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে। কিন্তু অবসরের পর সেই আলোচনার বিষয় বদলে যেতে পারে। তখন হয়তো প্রশ্ন হবে-মেসি কোথায় খেলছেন নয়, কোন ক্লাবের ভবিষ্যৎ গড়ছেন?
মায়ামি সেই ভবিষ্যতের উত্তরটাও যেন এখন থেকেই লিখতে শুরু করেছে। খেলোয়াড় হিসেবে মেসিকে আরও কিছুদিন পাওয়া তাদের চাওয়া। আর যখন বুটজোড়া তুলে রাখবেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা, তখনও যেন ক্লাবের দরজা তার জন্য খোলা থাকে-মালিক, অংশীদার কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়! মেসির জন্য তাই মায়ামি হয়তো শেষ ক্লাব নয়। হতে পারে, ফুটবল ক্যারিয়ারের পরও চলতে থাকা তার সবচেয়ে বড় ক্লাব-গল্পের শুরু!