ঢাকা রোববার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ২৭ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ইবাদত কবুলে ইখলাস শর্ত

আবিদ আম্মার
ইবাদত কবুলে ইখলাস শর্ত

আল্লাহর দরবারে বান্দার আমল কবুল হওয়ার প্রধানতম শর্ত হচ্ছে ইখলাস। আমল বা ইবাদত হবে শুধু আল্লাহর জন্য, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে; মানুষের প্রশংসা বা পার্থিব সুবিধা-চিন্তা এতে থাকতে পারবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তাদের শুধু একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ (সুরা বাইয়িনা : ৫)। ইখলাসের অনুপস্থিতি বা রিয়া ইবাদতকে ধ্বংস করে দেয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) একে গোপন শিরক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি আমার উম্মতের জন্য যেসব বিষয়ে ভয় করি, তার মধ্যে অধিক আশঙ্কাজনক হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা। অবশ্য আমি এ কথা বলছি না যে তারা সূর্য, চন্দ্র বা প্রতিমার পূজা করবে; বরং তারা আল্লাহ ছাড়া অন্যের সন্তুষ্টির জন্য কাজ করবে এবং গোপন পাপ করবে (লোকদেখানো ইবাদত করবে)।’ (ইবনে মাজাহ : ৪২০৫)।

কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ছেড়ে মানুষের সন্তুষ্টির জন্য আমল করে- নামাজ-রোজা-হজ-জাকাত ইত্যাদি করে তবে তা নিষ্ফল হবে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি লোক-শোনানো ইবাদত করে, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার লোক-শোনানোর উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেবেন।’ (বোখারি : ৬৪৯৯)।

বান্দার অন্তরের নিয়ত ঠিক না হলে আল্লাহর কাছে কোনো কাজই গ্রহণযোগ্য নয়। নিয়ত শুদ্ধ হলে আল্লাহ জাগতিক কাজকেও ইবাদতের মর্যাদা দিয়ে দেন। আবার নিয়ত শুদ্ধ না হলেও ইবাদতগুলো প্রত্যাখ্যান করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বোখারি : ১)। মানুষের ইখলাসশূন্যতা বা রিয়া অর্থাৎ প্রদর্শনপ্রিয়তা বিচিত্র রূপে প্রকাশ পায়। কেউ ইবাদতের সময় প্রত্যাশা করে মানুষ তার ইবাদত দেখে প্রশংসা করুক। কেউ আশা করে, মানুষ বিস্মিত হোক। কারও ইচ্ছা থাকে মানুষ তার ইবাদত দেখে তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করুক। কারও উদ্দেশ্য থাকে ইবাদতের কারণে মানুষের ভেতর তার প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাক। প্রদর্শনের উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, তার পরিণতি ভয়াবহ। এমন ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। পরকালে এসব ইবাদত ব্যক্তির জন্য বোঝা ও আক্ষেপের কারণ হবে। মুসলিম শরিফে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কেয়ামতের দিন লোকদেখানো আমলকারীদের বিচারের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন, যাতে একজন শহিদ (আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারী), একজন কোরআনের শিক্ষক ও একজন দানবীরের আলোচনা এসেছে। যারা খ্যাতি ও সুনামের মোহে জিহাদ, কোরআন শিক্ষা ও দান করত। তারা তাদের আমলের প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হয়। আল্লাহ তাদের বলবেন- ‘তোমরা যা চেয়েছ পৃথিবীতে তা পেয়েছ। সুতরাং আজ আমার কাছে তোমাদের কোনো প্রাপ্য নেই।’ (মুসলিম : ৩৫২৭)।

‘রিয়া’ অর্থাৎ মানুষের জন্য ইবাদত বা আমল করা কবিরা গোনাহ (বড় পাপ) ও হারাম। আল্লামা ইবনে কায়্যিম (রা.) কবিরা গোনাহের তালিকার প্রথমে রিয়ার আলোচনা করেছেন। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেছেন, ‘জেনে রাখো, নিশ্চয় প্রদর্শনপ্রিয়তা হারাম। প্রদর্শনকারী আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয়। আয়াত, হাদিস ও পূর্ববর্তী আলেমদের বক্তব্য দ্বারা তা প্রমাণিত।’ (ইহয়াউ উলুমিদ্দিন : ২/৪৮০)। বান্দার আমলে রিয়া যদি ইচ্ছাকৃত হয়, তবে তা যত গৌণই হোক, সে আমল আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি শরিককারীদের শরিক থেকে অমুখাপেক্ষী। যে ব্যক্তি কোনো আমল করল এবং তাতে আমার সঙ্গে কাউকে শরিক করল, আমি তাকে ও যাকে সে শরিক করল তাকে প্রত্যাখ্যান করি।’ (মুসলিম : ৩৫২৮)। এজন্য যেকোনো আমলের আগে নিয়ত পরিশুদ্ধ করা জরুরি।

ইসলামের ইবাদত দুই প্রকারে বিভক্ত- ১. মূলগতভাবে ইবাদত। যেমন- নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি। ২. মূল ইবাদতের জন্য সহায়ক ইবাদত। যেমন- অজু, গোসল, তায়াম্মুম ইত্যাদি। মূলগত ইবাদতগুলো নিয়ত ছাড়া শুদ্ধ হয় না। তাই নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি আদায় করতে নিয়ত করতে হবে। আর মূল ইবাদতের সহায়ক ইবাদতের জন্য নিয়ত জরুরি নয়। তাই অজু, গোসল ইত্যাদি নিয়ত ছাড়া আদায় করা যাবে। তবে তায়াম্মুম ও মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া মূলগত ইবাদত না হলেও তাতে নিয়ত করা আবশ্যক। (আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ের : ৩০)। তবুও যেহেতু পরকালে বান্দা নিয়ত অনুযায়ী আমলের প্রতিদান ও পুরস্কার পাবে, তাই ছোট-বড় সব আমলেই আল্লাহকে রাজি-খুশি করার নিয়ত রাখতে হবে। হজরত ওমর (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলকে (সা.) বলতে শুনেছি, ‘প্রত্যেক কাজের ফলাফল নিয়ত অনুসারে হয়। প্রত্যেক মানুষ তার কাজের ফলাফল আল্লাহর কাছে তদ্রূপ পাবে, যেরূপ সে নিয়ত করেছে।’ (বোখারি : ১)।

যারা নিঃস্বার্থভাবে মানুষকেও ভালোবাসে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, রাসুল (সা.) তাদের পরিপূর্ণ ইমানের অধিকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসল, আল্লাহর জন্য কাউকে ঘৃণা করল, আল্লাহর জন্য কাউকে দান করল এবং আল্লাহর জন্য কাউকে দান করা থেকে বিরত থাকল, সে ব্যক্তি নিজ ইমানকে পূর্ণতা দান করল।’ (আবু দাউদ : ৪৬৮১)। তাই আমরা যদি ইবাদতকে আল্লাহর দরবারে কবুল করাতে চাই, তাহলে অবশ্যই রিয়া ও লৌকিকতা পরিহার করতে হবে এবং ইবাদত করতে হবে ইখলাসের সঙ্গে একমাত্র আল্লাহতায়ালার জন্য।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত