প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
আরবি বারোটি মাসের মধ্যে মুসলমানদের কাছে রমজান মাসের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এ মাসে তাদের মধ্যে বিরাজ করে ইবাদতের সাজসাজ রব। তারা প্রতিটি সময়জুড়ে থাকেন ইবাদতের প্রাণচাঞ্চল্যে। তাদের মধ্যে সবসময় বয়ে চলে আধ্যাত্মিকতার সুবাস। এ মাসকে তারা হৃদয়ে ধারণ করেন। এ মাসকে ভালোবেসেন। মুসলিমরা রমজানকে এত ভালোবাসে কেন, এর কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হলো-
আমল-ইবাদতের বসন্তমাস : রমজানের দিনে প্রাপ্তবয়স্করা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও দাম্পত্য মিলন থেকে বিরত থেকে রোজা রাখেন। প্রাণ খুলে কোরআন তেলাওয়াত করেন। অর্থ বুঝে কোরআন অনুধাবন করেন। অতিরিক্ত নফল নামাজ পড়েন। রাতে মসজিদগুলো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে; একসঙ্গে মুসল্লিরা ইফতার করেন। নামাজে দাঁড়ান। রাতভর দীর্ঘ নামাজে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের সুরে মোহিত হয় তাদের মন। তারা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকেন। জিকির করেন। সাহরি খান।
মাসজুড়ে রোজা : প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ। ইসলামে অন্য কোনো মাসে কোনো ধরনের ফরজ রোজা নেই। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের আগের মানুষের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)। এ মাসে মুসলিমরা রোজা রাখেন। আল্লাহর ভয়ে পানাহার ও দাম্পত্য মিলন থেকে বিরত থাকেন। তবে রোজা শুধু শারীরিক সংযম নয়, এর রয়েছে আত্মিক দিকও। মিথ্যা, গিবত অপবাদ, অশ্লীলতা ও অসদাচরণ থেকে বিরত থাকা রোজার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চোখ, কান ও চিন্তাকে পবিত্র রাখার চেষ্টাও এর অন্তর্ভুক্ত। রোজা মানুষকে ক্ষুধার অভিজ্ঞতা দেয়। দরিদ্রের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে উদ্ধুদ্ধ করে।
কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাস : রমজান মাসে পবিত্র কোরআন নাজিল করা হয়। এ মাসে অনেক মুসলমান বেশ আয়োজন করে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন। নামাজের দীর্ঘ রাকাতে পবিত্র কোরআন পড়েন। তারাবির নামাজে কেউ কেউ পুরো কোরআন শেষ করেন। তাহাজ্জুদের নামাজেও তারা দীর্ঘ সময় ধরে কোরআন পড়েন। অর্থ বুঝে কোরআন অনুধাবন করেন। এটি আত্মাকে প্রশান্ত করে এবং শক্তি যোগায়। আল্লাহ বলেন, ‘রমজান মাস- যে মাসে কোরআন নাজিল করা হয়েছে মানুষের হেদায়াতের জন্য, পথনির্দেশের সুস্পষ্ট বর্ণনারূপে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)
তারাবি নামাজ : রমজান মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমল তারাবি নামাজ। এ নামাজ দেহ ও মনে প্রশান্তি এনে দেয়। গুনাহ মাফের সুযোগ করে দেয়। মুসলমানরা রমজানজুড়ে তারাবি নামাজ পড়েন। তারাবি নামাজের জন্য তারা মসজিদে সমবেত হন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আল্লাহর একাকিত্বের ঘোষণা দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা রোজা তোমাদের ওপর ফরজ করেছেন এবং আমি তোমাদের জন্য তারাবি নামাজ সুন্নত করেছি। যে রমজানে ইমান এবং সওয়াবের আশায় রোজা রাখবে ও তারাবি নামাজ পড়বে, সে তার সব গুনাহ থেকে এমনভাবে মুক্ত হবে, যেভাবে একটি শিশু নিষ্পাপ অবস্থায় জন্মায়।’ (সুনানে নাসায়ি, পৃষ্ঠা : ২৩৯)
দান-সদকা : রমজান দান-সদকার মাসও। মুসলমানরা এ সময় বেশি বেশি দান-সদকা করার চেষ্টা করেন। দান শুধু অর্থের মাধ্যমে নয়, একটি হাসিও হতে পারে সদকা। গোপনে দান করা উত্তম। মহানবী (সা.) ছিলেন সবচেয়ে বেশি দানশীল, রমজানে তার দানশীলতা আরও বৃদ্ধি পেত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ বলেছেন, হে আদম সন্তানরা, তোমরা অকাতরে দান করতে থাকো, আমিও তোমাদের ওপর ব্যয় করব। নবী (সা.) আরও বলেন, আল্লাহর ডান হাত প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ। রাত দিন অনবরত ব্যয় করলেও তা মোটেই কমছে না।’ (মুসলিম : ২১৯৮)।
রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর : রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর একটিতে রয়েছে লাইলাতুল কদর- শবে কদর বা ভাগ্যের রাত। এটি সবচেয়ে পবিত্র রাত হিসেবে বিবেচিত। এ রাতে কোরআন নাজিল করা হয়। এ রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি মাহাত্ম্যপূর্ণ কদরের রজনীতে। আপনি কি জানেন, সে মহিমাময় রাত কী? মহিমান্বিত ওই রাত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।’ (সুরা কদর : ১-৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতে কদরের রাত অনুসন্ধান করো।’ (বোখারি : ২০১৭)। রমজান যেন বিশ্বজুড়ে মুসলিম জাতিকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়- বিশ্বের সব মুসলিমরা একই নিয়মে রোজা রাখেন, তারাবি পড়েন, ইফতার ও সাহরি করেন। রমজান মুমিন- মুসলমানদের জন্য আত্মিক শান্তি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ।