ঢাকা শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মওলানা রুমির মসনবি শরিফ (কিস্তি- ৬/৩১)

উজির ইমাদুল মুলকের বিচক্ষণতা

ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
উজির ইমাদুল মুলকের বিচক্ষণতা

খাওয়ারেজের বাদশাহ একবার সফরে বের হন সভাসদ সঙ্গে নিয়ে। কাফেলায় শামিল হয়েছিল আমির-ওমারা, সিপাহসালার অনেকে। পথ চলতে কাফেলার একটি অশ্ব বাদশাহর দৃষ্টি কাড়ে। ঘোড়ার রঙ, রূপ, চলার গতি, দেহের গড়ন, চপল পদবিক্ষেপ ছিল দৃষ্টিনন্দন। বাদশাহ বারবার তাকাচ্ছিলেন ঘোড়াটির দিকে। কোনোভাবে দৃষ্টি ফেরাতে পারছিলেন না অন্যদিকে। বাদশাহর মনে খটকা জাগল, রাজা-বাদশাহদের শান-শওকত আমাকে কখনো প্রলুব্ধ করতে পারেনি; অথচ এই একটি ছোট্ট প্রাণী আমার হুঁশজ্ঞান কেড়ে নিচ্ছে। আমি কি জাদুগ্রস্ত?

মনকে ভারমুক্ত করতে বাদশাহ দোয়া দরুদ পাঠ করলেন। সুরা ফাতেহা, ‘লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা’ আরও আরও দোয়া। কিন্তু তাতে মনের গতি বদলায় না। দোয়া দরুদ যেন তাকে ঘোড়ার প্রতি আরও বেশি আসক্ত করে। বাদশাহ চিন্তা করলেন, সুরা ফাতেহার তেলাওয়াত ও দোয়া দরুদ তো মানুষের মনকে বাজে চিন্তা থেকে মুক্ত করে। কিন্তু আমার বেলায় আজ যে উল্টা ফল দিচ্ছে, কারণ কী। এখানে কী আল্লাহর কোনো ইশারা আছে, যার মর্ম বুঝতে আমি অক্ষম।

সুরা ফাতেহা পাঠ, দোয়া দরুদে ফল হবে- এটা ঠিক; কিন্তু ফল দিতে তিনি বাধ্য- এমন অঙ্ক ভুল। কারণ, আল্লাহর কাজের হিকমত বুঝা মানুষের আয়ত্বের বাইরে। তাঁর শান বিচিত্র। তাঁর সত্তা ও কাজ মানুষের ধারণা অনুমানের ঊর্ধ্বে। প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে তার বিচিত্র শান, যা বুঝার সাধ্য নেই মানুষের।

মানুষের প্রাণ আছে, প্রাণের মাঝে আত্মা লুক্কায়িত, প্রাণকে নির্ভর করে আছে আকল, জ্ঞানবুদ্ধি। কিন্তু এসবের স্বরূপ কি কেউ নিজ চোখে দেখেছে? কাজেই আল্লাহকে, আল্লাহর কাজকে নিজের জ্ঞানের মাপকাঠিতে বিচার করা বোকামি হবে। এসব চিন্তার মাঝে খাওয়ারেজম শাহ সফ শেষ করেন। রাজপ্রাসাদে এসে ঘনিষ্ঠ সভাসদদের কাছে ঘোড়ার ব্যাপারে মনের ইচ্ছাটি ব্যক্ত করেন। বাদশাহর আগ্রহের কথা জানতে পেরে সিপাহ সালারদের সে কী প্রস্তুতি। ঘোড়ার মালিক অমুক আমির, তার কাছ থেকে ঘোড়াটি নিয়ে আসা মুহূর্তের কাজ।

বাদশাহ তার ঘোড়াটি পছন্দ করেছেন, এটিই তো তার ভাগ্য। তারা উল্কা বেগে ছুটে গেলেন ঘোড়ার মালিক আমিরের বাড়িতে। আমির ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। তার ব্যক্তিত্ব ছিল পর্বতের মতো অটল। এরপরও সেনানায়কদের অতর্কিত আগমন দেখে ভড়কে যান, মোমের মতো গলে যান। অনিচ্ছায় প্রাণপ্রিয় ঘোড়াটি তাদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু ঘোড়া হারানোর শোকে আমিরের কাছে দুনিয়াটা অন্ধকার হয়ে এলো। একটি পোষা প্রাণীর ভালোবাসা এমন শোকে দুঃখে দুশ্চিন্তায় নিমজ্জিত করতে পারে, তিনি কোনো দিন ভাবতেও পারেননি। মন্ত্রী এই অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে থাকেন। হঠাৎ মনে উদয় হলো, এমন বিপদ থেকে উদ্ধার করার একজন ব্যক্তি তো আছেন। তিনি সবার বিশ্বাসভাজন মন্ত্রী ইমাদুল মুলক। একমাত্র তিনিই আমার ঘোড়া ফিরিয়ে দিতে পারেন। তিনি দেশের মজলুম, অধিকারহারা অসহায় মানুষের আশ্রয়। তিনি নির্লোভ, দুনিয়া বিরাগী, খোদাভীরু, বাদশাহর বিশ্বাসভাজন, পরম সম্মানিত। চিন্তা, দূরদর্শিতা, বলিষ্ঠ মতামত ও দানশীলতায় অনন্য। ক্ষমতাধর মন্ত্রী হয়েও ক্ষমতাচর্চার বাতিক তার নেই। রাজার বেশে তিনি সংসার-বিরাগী দরবেশ। দুনিয়া, দুনিয়ার চাকচিক্য তার কাছে কারাগারের মতো। প্রেম, ত্যাগ, সরল জীবন, ন্যায়বিচার তার চরিত্রের অলঙ্কার।

বুদে হার মোহতাজ রা হামচোন পেদার

পিশে সুলতান শাফে-ও দফএ জারার

অসহায় অভাবী মানুষের কাছে পিতৃতুল্য তিনি

বাদশাহ সমীপে সুপাশিকারী, দুঃখ মোচনকারী।

মর বদান রা সিতর চোন হেলমে খোদা

খুলকে উ বর আকসে খলকান ও জুদা

মন্দদের প্রতি ঢাল ছিলেন আল্লাহর সহনশীতার মতো

স্বভাব চরিত্র ছিল তার অন্য মানুষের বিপরীত, ভিন্নতর।

বহুবার তিনি চেষ্টা করেছেন মন্ত্রিত্ব ছেড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেবেন, ফকির দরবেশদের মতো নির্জন সাধনায় জীবন কাটাবেন; কিন্তু বাদশাহ বিনয় করে তার পথরোধ করেন, কঠিন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য করেন। আমির হিসাব করেন, ইমাদুল মুলক একত্রে ১০০ দোষীর ক্ষমার জন্যও সুপারিশ করেছেন; তাতেও বাদশাহ তার সুপারিশ গ্রহণ করেছেন। একটিবারও অসন্তুষ্টি দেখাননি তার প্রতি। কাজেই আমার অশ্ব ফিরিয়ে দিতে পারেন তিনিই। দিশাহারা আমির চললেন মন্ত্রী ইমাদুল মুলকের কাছে। কাতর কণ্ঠে বললেন, মন্ত্রী মহোদয়! ঘোড়াটি আমার প্রাণের প্রাণ। আমি ধন-জন হারালেও ধৈর্য ধরতে পারব; কিন্তু এই ঘোড়ার বিহনে আমার বেঁচে থাকা কঠিন। আল্লাহ আপনাকে বিরাট মর্যাদা দিয়েছেন। আমি আপনার সাহায্য চাই। যেভাবেই হোক আমার ঘোড়াটি উদ্ধার করে দিন, আল্লাহর দোহাই।

আমিরের কাকুতি শুনে মন্ত্রী ইমাদুল মুলক বাদশাহর দরবারে গেলেন। তিনি বাদশাহর সামনে দাঁড়ালেন, তবে তখনো তার হৃদয় যুক্ত আল্লাহর সঙ্গে। আল্লাহর বান্দারা দৃশ্যত দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত; অথচ তাদের অন্তর থাকে আরশের মালিকের সঙ্গে যুক্ত। উজির বাদশাহর কথাবার্তা শুনছিলেন, তবে অন্যদিকে সংকট উত্তরণের উপায় চিন্তা করছিলেন। মনে মনে বলছিলেন, হে আল্লাহ! তরুণ বাদশাহ যদি সুদর্শন অশ্বের মোহে বক্রচিন্তায় আক্রান্ত হন, তাহলে তো মজলুম আমির তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। যেকোনো বিপদে আমিরের উচিত ছিল তোমার শরণাপন্ন হওয়া। তা না করে আমার কাছে এসে ভুল করেছে। প্রভুহে তাকে পাকড়াও কর না তার জন্য।

সৃষ্টিলোকে তোমার উপমা সূর্যের মতো। সূর্যের আলো বাদ দিয়ে চেরাগের শরণ লওয়া বড় অন্যায়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ, যারা দুনিয়ার মোহে লোভে আক্রান্ত, তারা বাদুরের মতো, সূর্যকে দেখে না, রাতের আঁধারেই খাবার খোঁজে। কিন্তু যে বাজপাখি আকাশের নীলিমায় ওড়ে সে যদি বাঁদুরের মতো রাতের আঁধারে খাবার খোঁজে, সূর্য বেজায় নারাজ হন। বলেন যে, তুমি তো বাঁদুর নও, তুমি বাজপাখি। কী হলো যে, তুমি খাবার খোঁজো অন্ধকারে দিনের আলো ছাড়ি।

আল্লাহ কোনো প্রিয় বান্দার সামান্য ভুলের জন্যও পাকড়াও করেন। বলেন যে, তুমি আমার পরিচয় জান। এরপরও আমার পরিবর্তে অন্যের কাছে হাত পাতলে কেন। ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনি কোরআন মাজিদে বর্ণিত। মিশরপতি আজিজের স্ত্রী জুুলেখার ফুসলানোতে সায় না দেয়ায় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি কারাগারে বন্দি হন। পূতঃচরিত্র ইউসুফ কারাবন্দিদের আধ্যাত্মিক গুরুতে পরিণত হন। তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতেন। শিগগির মুক্তি পাবে- এমন এক বন্দিকে তিনি বলেন, তুমি যখন মুক্তি পাবে আর বাদশাহর দরবারে সেবকের পদে বহাল হবে, তখন বাদশাহর কাছে আমার কথাটা উত্থাপন করবে, তাতে হয়তো আমার কারামুক্তির একটি ব্যবস্থা হবে।

য়াদে মন কুন পিশে তখতে অন আজিজ

তা মোরা হাম ওয়া খরদ জিন হাবস নিজ

বাদশাহর দরবারে স্মরণ করবে আমার কথা

আমায়ও যেন মুক্তি দেন গুচে এই বন্দিদশা।

ইউসুফ (আ) আরেক বন্দির সাহায্য চাওয়ায় শাস্তি হয়েছিল, কারাকক্ষে কাটাতে হয়েছিল অন্তত সাতটি বছর। ইউসুফ কারাগারে বন্দি ছিলেন বটে; তার অন্তর ডুবেছিল আল্লাহর জিকির ও স্মরণের স্বাদে। ফলে তিনি বুঝতেই পারেননি বন্দিদশার কষ্টের কথা। মানবশিশু বন্দি থাকে মায়ের গর্ভে; কিন্তু যেহেতু তার জন্য আল্লাহ রহমতের দুয়ার খুলে দেন, ফলে বুঝতে পারে না, সে যে বন্দিদশায়। মায়ের গর্ভে মনের আনন্দে শিশু বেড়ে ওঠে, বিকশিত হয়। কাজেই আনন্দ ও স্বাদ আসলে মনের। মনে কারও না তা বাহ্যিক বস্তুগত সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের।

রাহে লজজত আজ দরুন দান নাজ বরুন

আবলহি দান জুসতনে কাসরো হুসুন

সুখ-আনন্দের পথ ভেতর দিয়ে বাইরে দিয়ে যায়নি

দালান-কোঠা, দুর্গের জৌলুসে সুখ সন্ধান আহম্মকী। (খণ্ড : ৬ বয়েত : ৩৪২০।

মন যদি খুশি না থকে, যদি দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হয় জমকালো অট্টালিকাও ভয়ার্ত কারাগারে পরিণত হয়। দেখুন-

আন য়াকি দর কুঞ্জে মসজিদ মস্তো শাদ

ওয়ান দিগার দর বাগ তুরশো ও বি মুরাদ

কেউ মসজিদের ভেতরে বসা সুখী, প্রফুল্লমন

আর কেউ মুক্ত বাগানে গুমড়ো ব্যর্থ মনোরথ।

মসজিদ দুনিয়াবি দৃষ্টিতে খুশি আনন্দের জায়গা নয়, অথচ অনেকে মসজিদেই খুশি মনে প্রফুল্লচিত্তে থাকে। আবার অনেকে উন্মুক্ত বাগানে খুশি বিনোদনের আয়োজনে থেকেও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত গুমরোমুখো থাকে। এই অভিজ্ঞতা বাস্তব জীবনে অহরহ। বাইরের দালান কোঠার জৌলুসের মতো তোমার দেহের কোঠায়ও নানা কল্পনা ও চিন্তার বিচিত্র সমারোহ আছে। মনের এসব আগাছা পরিষ্কার করে ঊর্ধ্বলোকের নুরের বিচ্ছুরণ দেখার জন্য প্রস্তুত থাক। মন্ত্রী ইমাদুল মুলক বাদশাহর সমানে আত্মমগ্ন দাাঁড়িয়ে এসব তত্ত্বকথা চিন্তা করছিলেন। এরই মধ্যে একজন সেপাহী অশ্বটি হাজির করল বাদশাহর মনোরঞ্জনের জন্য।

অশ্বদর্শনে প্রফুল্ল বাদশাহ মন্ত্রীকে সম্বোধন করে বলেন, দেখুন কী দৃষ্টিনন্দন একখানি অশ্ব, খুঁত নেই তার শরীরের কোথাও। ইমাদুল মুলক সুযোগটা লুফে নিয়ে বললেন, মহামান্য বাদশাহ! যদি আপনি কোনো দৈত্যকেও পছন্দ করেন, তা আপনার কাছে ফেরেশতার মতো মনে হবে। মানুষ কোনো কিছুকে ভালোবাসলে তার দোষত্রুটি তার চোখে গোপন থাকে। এই অশ্ব দৃষ্টিনন্দন বটে; কিন্তু একটি ত্রুটি তো আছে। এর মাথা ও মুখটা একেবারে গরুর মুখের মতো দেখতে। পশুর হাটে দালালরা যেভাবে পশুর গুনাগুণ বর্ণনায় ফেনা তুলে ক্রেতাদের মোহাচ্ছন্ন করে এখানেও তাই ঘটে গেল। বাদশাহর চোখ যেন বদলে গেল মন্ত্রীর চোখে। তার আগ্রহ পানসে হয়ে গেল। নির্দেশ দিলেন এই অশ্ব ফিরিয়ে দাও তার মালিকের কাছে।

মওলানা বলেন, আসলে মন্ত্রীর কথায় নয়, বরং মজলুমের হক আদায় করে দেওয়ার জন্য মন্ত্রী গোপনে যে দোয়া করেছিলেন তার প্রভাবে আল্লাহ পাক বাদশাহর চোখে ঘোড়াটি অসুন্দর করে দেখালেন। মন্ত্রীর দোয়ার বরকতে বাদশাহর চোখ থেকে দুনিয়ার পর্দা সরে গেল। তিনি খুঁজে পেলেন আল্লাহর রজ্জুর সন্ধান। সেই রজ্জুই আঁকড়ে ধরতে হবে আমাদেরও। এটিই আল্লাহর বিধান।

দস্তে কুরানে বেহাবলিল্লাহ জন

জুজ বর আমরো নাহয়ে য়াযদানি মতন

অন্ধদের মতো আঁকড়ে ধরো তুমি আল্লাহর রজ্জু

আল্লাহর আদেশ নিষেধ ছাড়া চেয়ো না অন্যকিছু।

আল্লাহর রজ্জুর পরিচয় কী? বর্জন করা কামনা বাসনা

নফসের বাসনাই এনেছে আদ জাতির ধ্বংসের পরওয়ানা। (খণ্ড : ৬, বয়েত : ৩৪৯৩)।

নফসের কামনা-বাসনা বর্জন করে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মানাই কোরআনে বর্ণিত আল্লাহর রজ্জু। এই রজ্জু ছেড়ে নফসের কামনা চরিতার্থ করার পরিণতিতে ধ্বংস নেমে এসেছিল আদ জাতির ওপর। (মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, খণ্ড : ৬, বয়েত : ৩৩৪৫—৩৪৯৩)

(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে ছায়াপথ প্রকাশনী, মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ১৪৯/এ, এয়ারপোর্ট রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন- CHAYAPATH PROKASHONI)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত