ঢাকা শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মওলানা রুমির মসনবি শরিফ (কিস্তি- ৬/৩৩)

হুশরুবা দুর্গে তিন শাহজাদা

ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
হুশরুবা দুর্গে তিন শাহজাদা

সফরগামী তিন শাহজাদাকে বিদায় জানানোর সময় বাদশাহ উপদেশ দিয়েছিলেন, তোমরা ইচ্ছামতো সারা দেশে ঘুরে বেড়াবে; কিন্তু সাবধান! একটি দুর্গে প্রবেশ করবে না, কারণ সেটি মানুষের আকলবুদ্ধি গুম করে হতবিহ্বল করে দেয়। দুর্গের নামটাও তাই হুশরুবা-হুঁশজ্ঞান হরণকারী। বাবার নিষেধের কারণেই বোধহয় হুশরুবার প্রতি ছেলেদের কৌতূহল বাড়তে লাগল। শেষ পর্যন্ত তিনজনই একদিন রাতে দুর্গে প্রবেশ করে দেখে তার দশটি দরজা। পাঁচটি দরজা সাগরের দিকে খোলা আর পাঁচটি মাঠের দিকে। দরজাগুলোর উপমা হচ্ছে-

পাঞ্জ আজ অন চো হেস বে সুয়ে রঙ্গ ও বু

পাঞ্জ আজ অন চোন হেসসে বাতেন রাজজু

পাঁচটি দরজা ইন্দ্রিয়ের মতো রং ও রূপমুখি

পাঁচটি অভ্যন্তরীণ ইন্দ্রিয়সম রহস্য সন্ধানী।

হুশরুবা দুর্গের দশটি দরজা কী রকম জানার কৌতূহল আমাদের মনেও। মওলানা রুমি (রহ.) তার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, মাঠের দিকে যে পাঁচটি দরজা খোলা সেগুলোর উপমা পাঁচটি বাহ্যন্দ্রিয়ের মতো। রংরূপ চাকচিক্যের দিকে এগুলোর প্রবণতা। অপর পাঁচটি দরজা অন্তরেন্দ্রিয়ের মতো। রংরূপ চাকচিক্যের দিকে এগুলোর মোহ নেই; বরং অদৃশ্য জগতের রহস্য সন্ধানই এগুলোর অন্বেষা।

পাঁচ বাহ্যন্দ্রিয়ের একটি চোখ বা দর্শনেন্দ্রিয়, দেহের এই দরজাটি দিয়ে মানুষ দুনিয়ার রংরূপ, সৌন্দর্য, আলো আঁধারি দেখে। শ্রবণেন্দ্রিয় বা কান দিয়ে কথাবার্তা শুনে, তথ্য আহরণ করে জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করে। ঘ্রাণেন্দ্রিয় বা নাকের দরজা দিয়ে দুনিয়ার বস্তুনিচয়ের ঘ্রাণ নিয়ে ভালোমন্দ যাচাই করে। স্বাদেন্দ্রিয় বা জিহ্বার দরজা দিয়ে পচা না তাজা, কিংবা স্বাদণ্ডবিস্বাদের জ্ঞান মস্তিষ্কে আহরণ করে। তারপর স্পর্শেন্দ্রিয় বা ত্বক এর দরজা দিয়ে বস্তুর অস্তিত্ব অনুভব করে, পাথরের বা জড়ের স্পর্শেন্দ্রিয় নেই, মানুষের তা আছে।

অনুরূপ বাহ্যন্দ্রিয়ের ন্যায় মানুষের আছে পাঁচটি অন্তরেন্দ্রিয়। এগুলো পাঁচ বাহ্যন্দ্রিয় দিয়ে উদ্ঘাটন করা যায় না, তাই এগুলোর পরিচয় হিসসে বাতেনী বা বাতেনী ইন্দ্রিয়। এর একটির নাম হিসসে মুশতারিক, ইংরেজিতে আমরা বলি সাধারণ বোধ বা কমন সেন্স। একে এদরাকে হিসসি বা সংবেদনশীল ধারণাও বলা যায়। দ্বিতীয় বাতেনী দরজা কুওয়ায়ে খেয়াল বা অনুমানশক্তি। কমনসেন্স এর সংগৃহীত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের ছবিগুলো এখানে সংরক্ষিত ও বিশ্লেষিত হয়। তৃতীয় দরজা কুওয়ায়ে ওয়াহম বা ধারণাশক্তি। ভেড়া যখন মাঠে চড়ে, নেকড়ে দেখলে পালায়। ভেড়ার মধ্যে নেকড়ে দেখলে পালানোর যে মানসিক জ্ঞান ও শক্তি তা তৃতীয় প্রকারের বাতেনী শক্তির অন্তর্ভুক্ত। চতুর্থ হচ্ছে স্মৃতিশক্তি, যা ধারণা বা স্বভাবজাত জ্ঞানের আহরিত ক্ষুদ্রাংশ সংরক্ষণের আধার। পঞ্চম বাতেনী শক্তির নাম কুওয়ায়ে মুতাখাইয়েলা বা কল্পনাশক্তি। এই কল্পনাশক্তির আওতা অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত।

মোটকথা হুশরুবা দুর্গের দশটি দরজা হচ্ছে মানব দেহের দশটি ইন্দ্রিয়ের মতো। এর পাঁচটি খোলা স্থলভাগের দিকে আর পাঁচটি জলভাগের দিকে। প্রথম পাঁচটির প্রবণতায় আছে রংরূপ চাকচিক্য। দ্বিতীয় পাঁচটির লক্ষ্য অতিন্দ্রিয় জগতের রহস্য। শাহজাদারা এই দুর্গে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার রংরূপ বৈচিত্র, জৌলুসের জমকালো আসর দেখে অভিভূত, দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য দিশাহারা হয়ে পড়ল। মওলানা এখান থেকে দীর্ঘ ৫১টি বয়েতে মানুষকে সতর্ক করেছেন এই চাকচিক্যে প্রলুব্ধ হওয়ার ব্যাপারে। তিনি বলেন, জাহেরি জামবাটি দেখে মাতাল হয়ো না, তাহলে মূর্তি নির্মাতা ও মূর্তি পূজারীতে পরিণত হবে। শরাব পান করা হয় জামবাটিতে রেখে। বুঝতে হবে, শরাব আর জামবাটি এক নয়। শরাব পান করলেই মত্ততা আসে। মওলানা সতর্ক করছেন, জামবাটি পেয়েই তুমি মাতলামী কর না।

শরাবের কাছে যাও। তার মানে এই যে জগতের দৃশ্যমান বৈচিত্র্য, এগুলো জামবাটির মতো। এর রংরূপে মুগ্ধ হইও না। মনে কর না যে, এগুলোর রূপমাধুরী স্বতন্ত্র বা নিজস্ব; বরং জামবাটির মত্ততা যেমন শরাব থেকে আসে, দৃশ্যমান জগতের রূপ বৈচিত্রের মূলেও রয়েছে সেই সত্তা, যিনি এই সৌন্দর্যের রূপকার, মূলাধার। জগতের বুকে যা কিছু দেখছ সবই আল্লাহর তাজাল্লির উদ্ভাস মাজহার। তুমি এই উদ্ভাস দেখে মুগ্ধ নয়নে যদি ভাব যে, এগুলোই আসল, এর অন্তরালে কোনো শক্তির ভূমিকা নেই; তাহলে তুমি মূর্তি-নির্মাতা ও মূর্তি-পূজারীতে পরিণত হবে। মূর্র্তিপূজার মূল দর্শন হচ্ছে, সৃষ্টিজগতের বিশ্বয়কর বস্তুসমূহের শক্তি বা সৌন্দর্য নিজস্ব। এগুলো পেছনের আল্লাহ বা ইশ্বরের শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ থেকে আলাদা। এই বোধ থেকেই পৌত্তলিকরা শক্তি ও সৌন্দর্যের আধার মনে করে বিভিন্ন বস্তু বা বস্তুর প্রতীক সাজিয়ে পুজো দেয়, প্রণাম করে। তারা যদি চিন্তা করলে বুঝতে পারত যে, এই বিশ্বপ্রকৃতির সবকিছুর মূলে রয়েছেন একজন প্রতিপালক। তার কুদরতি হাতের ইশারায় পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয় সমগ্র জগত। মওলানার পরিষ্কার বক্তব্য, জামবটির মধ্যে তুমি থামবে না; বরং জামবাটির শরাবের মধ্যে মত্ততা খোঁজ করো। ধোঁয়া দেখে মনে কর না যে, এই ধোঁয়ার অস্তিত্ব স্বতন্ত্র। বরং ধোঁয়ার মূলে রয়েছে আগুন। সেই আগুনের সন্ধান কর।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি তোমাকে বুঝতে হবে তা হলো, সৃষ্টিজগতের বস্তুনিচয় আল্লাহর তাজাল্লির বিচ্ছুরণ ও প্রতিভাস বটে; কিন্তু সবকিছু আল্লাহর যাত ও স্বত্তা থেকে আলাদা। জামবাটি আলাদা, শরাবও আলাদা। শরাবকে জামবাটি বা জামবাটিকে শরাব মনে করলে গোমরাহ হতে হবে। বুঝতে হবে আল্লাহতায়ালা সবকিছুর সাথে আছেন, আবার সঙ্গে নেই। অর্থাৎ সাথে থাকা মিশে থাকা অর্থে নয়। সূর্যের আলো দুনিয়াকে আলোকিত করে। আলো সূর্য থেকে পৃথক, আবার পৃথক নয়। আলো সূর্য থেকে এলেও সূর্র্য নয়। এই পার্থক্য তোমাকে বুঝতে হবে, নচেত গোমরাহ হয়ে শিরকে পতিত হবে।

শাহজাদারা বাবার নিষিদ্ধ হুশরুবা দুর্গে ঢুকে জ্ঞানবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। তারা আগেও অনেক রংরূপ, ভাষ্কর্য, চাকচিক্য দেখেছিল; কিন্তু এই দুর্গের কারুকার্য এমন ভুবন মাতানো যে, শাহজাদারা দিশেহারা বিহ্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দুর্গের একটি পাথরের ভাষ্কর্য তাদের হুঁশজ্ঞান হরণ করে নেয়। তারা তিলিষ্মায় আক্রান্ত। সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়ার সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। ভাষ্কর্যের প্রেম তাদের হৃদয়ে এমনভাবে বিদ্ধ হয়, যেমন যুদ্ধে শত্রুপক্ষের নিক্ষিপ্ত তীর বর্শায় তাদের বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। শাহজাদারা এখন অঝোরে কাঁদে। বর্ষার আকাশের মতো তাদের চোখে মুখে অশ্রুর বন্যা। তারা কাঁদে আর বলে, আজ আমরা যা দেখছি বাদশাহ আগেই দেখেছিলেন তা। সেই উপদেশে কর্ণপাত না করাতে আমাদের আজকের দুরাবস্থা।

আম্বিয়া রা হক্কে বিস্য়ারাস্ত আজান

কে খবর কর্দন্দ আজ পায়ানে মান

মানব জাতির ওপর নবী-রাসুলদের বহু হক আছে

তারা যে সতর্ক করেছেন আমাদের পরিণাম সম্পর্কে।

নবী-রাসুলগণ (আ.) আমাদের বলেছেন, সাবধান! দুরিয়ার চাকচিক্য ও নফসের কামনা-বাসনার ধোঁকায় গ্রেপ্তার হবে না। তাহলে তোমাদের আত্মা নফসের কামনা ও দুনিয়ার কাদা ময়লায় কলুষিত হয়ে যাবে। আকাশের পানে উড়াল দেওয়ার শক্তি প্রাণপাখি হারিয়ে ফেলবে। তারা বলেছেন, তোমরা দুনিয়ার খামারে যে বীজ বুনো তা মূলত কামনার বীজ, এই বীজ থেকে যে ফসল উৎপন্ন হবে তা কাঁটাগুল্ম ছাড়া আর কিছু নয়। কাজেই যদি কামনার দিকে উড়াল দাও রুহানি উন্নতির পথ তোমরা ভুলে যাবে। তারা বলেছেন, আমাদের কাছ থেকে ইবাদত ও আল্লাহর আনুগত্যের বীজ নাও তা তোমার মনের জমিনে বপন কর, আমাদের কাছ থেকে আধ্যাত্মিকতার দীক্ষা নাও সেই দীক্ষার ডানায় ভর করে উড়াল দাও। তাহলে হাকিকতের আকাশে তোমরা বিচরণ করতে পারবে। শাহজাদারা এখন হুশরুবা দুর্গে উ™£ান্ত ঘুরছে আর নিজেদের দুর্দশার জন্য নিজেকে তিরস্কার করছে। পিতার উপদেশ লঙ্ঘনের জন্য অনুশোচনায় তাদের উপলব্ধি হলো, হুশরুবা দুর্গের গোলকধাঁধা থেকে উদ্ধার পেতে হলে অবশ্যই একজন পথপ্রদর্শক পেতে হবে। দুর্গের তিলিষ্মার রহস্যজ্ঞানী পথপ্রদর্শক, রাহবর মুর্শিদই আমাদের মুক্তির পথ বাৎলাতে পারবে। তিলিষ্মার হুশরুবা দুর্গে উ™£ান্ত অবস্থায় ভাগ্য শাহজাদাদের সহায় হলো একজন দিব্যজ্ঞানী দিশারী তারা পেয়ে গেল। তিনি তাদের বললেন, যে ভাস্কর্যের আকষর্ণে তোমরা তিলিষ্মার জাদুমন্ত্রে বন্দি, সেই ভাষ্কর্যের প্রতি আকাশের সপ্তর্ষিমণ্ডলও ঈর্ষায় কাতর। তার রূপের সম্মোহনের কাছে সপ্তর্ষির আলো নিষ্প্রভ। এই ভাষ্কর্যটি আসলে চীনের রাজার রাজকুমারীর। রাজকুমারীর পরিচয় আমি তোমাদের বলি-

হামচো জান ও চোন জনিন পিনহানাস্ত উ

দর মুকাত্তাম পর্দা ও এইওয়ান আস্ত উ

প্রাণ ও ভ্রুণের মতো গোপন সেই রাজকুমারী

রাজপ্রাসাদের চৌহদ্দি, পর্দায় ডাকা অপসরী।

সুয়ে উ ন মর্দ রাহ দারদ ন যন

শাহ পেন্হান কর্দ উ রা আজ ফেতন

কোনো পুরুষ কিংবা নারীর সাধ্য নাই তার কাছে যাবে

জঞ্জাল থেকে লুকিয়ে রেখেছেন বাদশাহ নিজের কাছে।

গাইরাতি দারদ মলেক বর নামে উ

কে নপররদ মোর্গ হাম বর বামে উ

কেউ তার নাম নিলে আত্মমর্যাদায় বাধে বাদশাহর

কাকপক্ষীও যেন না ওড়ে তার ঘরের ছাদ বরাবর।

এই বিবরণ শুনে তাদের মন আরও উন্মাতাল হলো, তারা চীন দেশে যাবে। যে করেই হোক চীনের রাজকুমারীর প্রমে মজে জীবন সার্থক করতে হবে।

(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, খণ্ড : ৬, বয়েত : ৩৭০৫-৩৭৯৮)।

(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে ছায়াপথ প্রকাশনী, মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ১৪৯/এ, এয়ারপোর্ট রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্প ভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন CHAYAPATH PROKASHONI)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত