ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আদব সৌভাগ্য বয়ে আনে, বেয়াদবি বিপর্যয়

ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
আদব সৌভাগ্য বয়ে আনে, বেয়াদবি বিপর্যয়

আয্ খোদা জুয়িম তাওফিকে আদব

বী আদব মাহরূম শুদ আয্ লুতফে রাব

৭৮. আল্লাহর কাছে মাগি আদবের তওফিক

বেয়াদব আল্লাহর দয়া থেকে হয় বঞ্চিত।

বী আদব তান্হা ন খোদরা দাশ্ত বাদ

বল্কে আতাশ দার হামে আফাক্ব যাদ

৭৯. বেয়াদব যে শুধু নিজকে নষ্ট করেছে তাই নয়

বরং সে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে দিক-দিগন্তে বিশ্বময়।

মায়েদা আয আসমান দার মী-রাসীদ

বী সুদা ও বী-ফোরূখত ও বী খারীদ

৮০. খাবারের খাঞ্চা অবতরণ হচ্ছিল আসমান থেকে,

কোনো চিন্তা, মাথাব্যথা, বেচাকেনা ব্যতিরেকে।

দার মিয়ানে কাওমে মূসা চান্দ কাস

বী আদব গুফতান্দ কূ সীর ও আদাস

৮১. মুসার কওমে কতক লোক ছিল বেয়াদব

তারা বলল : কোথায় রসুন ও ডাল।

কোরআন মাজিদে প্রতিপাদ্য আয়াত ‘আমি তোমাদের জন্য খাবার পাঠিয়েছি মান্না ও সালওয়া।’ (সুরা বাকারা : ৫৭)।

কোরআন মাজিদে এ সম্পর্কে আরও বর্ণিত হয়েছে, ‘স্মরণ করো ওই সময়ের কথা যখন তোমরা বললে, হে মুসা! আমরা একই ধরনের খাদ্যদ্রব্যে কখনো ধৈর্যধারণ করব না। কাজেই তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট আমাদের হয়ে প্রার্থনা কর। তিনি যেন আমাদের জন্য এমন বস্তুসামগ্রীর ব্যবস্থা করেন, যা জমিতে উৎপন্ন হয়। তরি-তরকারি, গম, মসুরি, পেঁয়াজ প্রভৃতি। মুসা বললেন : তোমরা কি উত্তম বস্তুর পরিবর্তে নিকৃষ্ট বস্তু নিতে চাও?’ (সুরা বাকারা: ৬১)।

এই বেয়াদবীর ফল দাঁড়াল-

মুনকাতে শুদ নান ও খানে আসেমান

মান্দ রাঞ্জে জার ও বীল ও দাসেমান

৮২. আসমান থেকে রুটি ও খাবার আসা বন্ধ হলো,

চাষবাস, কোদাল, কাস্তে তাদের জন্য রয়ে গেল।

বায ঈসা চোন শফায়াত কার্দ হাক

খান ফেরেস্তাদ ও গনীমত বার তাবাক

৮৩. পুনরায় ঈসা যখন সুপারিশ করলেন, আল্লাহ

খাঞ্চায় ভরে মুফ্ত গনীমত উপঢৌকন পাঠালেন।

ঈসা ইবন মরিয়ম বললেন : হে আল্লাহ, আমাদের পালনকর্তা। আমাদের প্রতি আকাশ থেকে খাদ্য-ভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করুন। তা আমাদের জন্য অর্থাৎ আমাদের প্রথম ও পরবর্তী সবার জন্য আনন্দোৎসব হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আপনি আমাদেরকে রুযি দিন। আপনিই শ্রেষ্ঠ রুযিদাতা। আল্লাহ বললেন, নিশ্চয়ই আমি সে খাঞ্চা তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করব।

অতঃপর যে ব্যক্তি এরপরেও অকৃতজ্ঞ হবে, আমি তাকে এমন শাস্তি দেব, যে শাস্তি জগতের আর কাউকে দেব না।’ (সুরা মায়েদা : ১১৪-১১৫)।

বায গুস্তাখান আদব বগুযাশতন্দ

চোন গেদায়ান যল্লাহা বরদাশতন্দ

৮৪. বেয়াদবরা আবারো ত্যাগ করল আদব লেহাজ,

ভিক্ষুকের মতো তুলে রাখা শুরু করল উদ্বৃত্ত খাবার।

তাদের প্রতি হুকুম ছিল, তৃপ্তি সহকারে আহার করার পর উদ্বৃত্ত খাদ্য গরিবদের বিলিয়ে দিতে হবে। আসমানি খাবার যেহেতু অব্যাহতভাবে আসতে থাকবে, সেহেতু লোভী ভিক্ষুকদের মতো আচরণ করতে পারবে না, সামনের বেলার জন্য জমা রাখতে পারবে না। কিন্তু তারা আল্লাহর নেয়ামত ও আশ্বাসের সম্মান বজায় রাখেনি।

লাবে কার্দে ঈসা ঈশানরা কে ঈন

দায়েমাস্ত ও কাম নাগার্দাদ আয্ যামিন

৮৫. ইসা (আ.) তাদের খুব নরম হয়ে বুঝালেন যে,

এটা আসতে থাকবে, পৃথিবীতে কমতি হবে না তাতে।

মওলানা এখানে একটি শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে বলছেন-

বাদগুমানী কার্দান ও হেরচ আওয়ারী

কুফ্র বাশাদ্ পীশে খানে মেহ্তারী

৮৬. খারাপ ধারণা পোষণ আর লোভের বশবর্তী হওয়া

বড়লোকের যিয়াফতে গিয়ে বড় অন্যায় কুফরী কথা।

বেয়াদবরা আল্লাহর নেয়ামত ও আশ্বাসের বেলায় এতটুকুন আস্থা, ভদ্রতা দেখাল না; বরং আল্লাহর নাফরমানী ও কুফরী করল।

যান গেদারূয়ানে না দীদে যে আয্

আন দারে রাহমাত বার ঈশান শুদ ফারায

৮৭. লোভে অন্ধ সেই ভিক্ষুক স্বভাবের লোকদের কারণে,

রহমতের সেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল তাদের জন্যে।

পৃথিবীতে যত বিপর্যয় ঘটে, তার পেছনে প্রাকৃতিক কারণ থাকে, আর প্রাকৃতিক কারণের পেছনে থাকে নৈতিক কারণ। মওলানা এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন :

আব্র বার নায়দ পেয়ে মানএ যাকাত

ওয্ যেনা ওফ্তদ্ ওয়াবা আন্দার জেহাত

৮৮. যাকাত দেয়া বন্ধ হলে মেঘ বাদল ওঠে না (আকাশে)

যিনা-ব্যভিচারের ফলে ছড়িয়ে পড়ে মহামারী চারদিকে।

হারচে বার তো আয়াদ আয্ যুলমাত ও গাম

আন যে বীবাকী ও গোস্তাখীস্ত হাম

৮৯. যা কিছু আপতিত হয় তোমার ওপর আঁধারি দুশ্চিন্তা,

তাও সেই বেয়াদবী ও ধৃষ্টতার সাক্ষাৎ ফলশ্রুতি।

এই বয়েতের প্রতিপাদ্য কোরআন মজিদের আয়াত : ‘তোমার ওপর যে কোনো মুসিবত আপতিত হয় তা তোমার কর্মফলের দরুণই হয়ে থাকে।’ (সুরা নিসা: ৭৯)।

হারকে বী বাকী কুনাদ দার রাহে দুস্ত

রাহ্যানে মারদান শুদ ও নামার্দ উস্ত

৯০. বন্ধুর পথে যে বেপরোয়া ধৃষ্টতা দেখায়

মানুষের জন্য সে ডাকাত আর নিজে কাপুরুষ।

আল্লাহর পথে বেপরোয়া আচরণ যারা করে, তারা ভণ্ড। আল্লাহর পথের পথিকদের জন্য এরা ডাকাত। ব্যক্তি-জীবনে এরা কাপুরুষ, গুমরাহ। বেয়াদবীর কুফল বর্ণনার পর এখন আদব ও বিনয়ী স্বভাবের সুফল আলোচনা করছেন মওলানা রুমি (রহ.)।

আয আদব পুরনূর গাশ্তাস্ত ঈন ফালাক

ওয়ায্ আদব মাসূম ও পা’ক আ’মাদ্ মালাক

৯১. আদবের কারণেই নূরে নূর আলোকময় এ নভোমণ্ডল,

আদবের কারণেই ফেরেশতারা পুতঃপবিত্র নিষ্পাপ।

‘অতপর তিনি আকাশের দিকে মনযোগ দিলেন, যা ছিল ধূম্রকুণ্ড, অতপর তিনি তাকে (আকাশকে) ও পৃথিবীকে বললেন : তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। তারা বলল : আমরা আসলাম স্বেচ্ছায় অনুগত হয়ে।’ (সুরা ফুসসিলাত: ১১)।

এরই পুরস্কার হিসেবে আল্লাহ তাআলা তাতে চন্দ্র-সূর্য ও নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করে আলোকময় ও সুশোভিত করেছেন। আদম (আ.)-কে সৃষ্টির পর আল্লাহ তাআলা আদমকে সিজদা করার জন্য হুকুম দিয়েছিলেন ফেরেশতাদের প্রতি। ফেরেশতারা সে হুকুমের সামনে মাথানত করে আদবের পরিচয় দিয়েছিলেন। ফলে তারা সম্মানিত, নিষ্পাপ, মাসুম।

বুদ যে গোস্তাখী কসুফে আফতাব

শুদ আযাযীলী যে জুরআত রাদ্দে বাব

৯২. বেয়াদবীর কারণে সূর্যের গ্রহণ হয়

বেয়াদবীর কারণে আযাযীল বিতাড়িত হয়।

আদমকে সেজদা করার হুকুম দেয়ার পর ফেরেশতাদের সর্দার আযাযীল আল্লাহ্র সাথে যুক্তিতর্কে লিপ্ত হলো। সে বলল, ‘আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তুমি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছ আর তাকে সৃষ্টি করেছ, মাটি দ্বারা।’ (সুরা আরাফ : ১২)।

এই যুক্তিতর্ক আর আদমকে সেজদা করার হুকুম অমান্য করে যে বেয়াদবী করেছে, তার শাস্তি স্বরূপ আল্লাহর দরবার হতে সে বিতাড়িত, শয়তানে রজীম হয়েছে।

প্রাচীন সৌরবিজ্ঞানে বিশ্বাস করা হতো যে, সূর্য যখনই তার স্বাভাবিক কক্ষপথ হতে বিচ্যুত হয়ে পড়ে, তখন গ্রহণের কবলে পড়ে যায়। মওলানা সূর্যের কক্ষপথ হতে বিচ্যুত হওয়াকে বেয়াদবীর সাথে তুলনা করেছেন। আদব বা শিষ্টাচার সম্পর্কে আলোচনার পর মওলানা আবার গল্পের ধারাবাহিকতায় ফিরে আসছেন।

(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে ছায়াপথ প্রকাশনী, মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ১৪৯/এ, এয়ারপোর্ট রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন- CHAYAPATH PROKASHONI)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত