প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬
মাজহাব এটি আরবি শব্দ। আরবি অভিধান ‘আলওয়াফি’ মতে যার অর্থ হলো, মত পথ ধর্মমত; মতবাদ, আদর্শ ও ধর্মবিশ্বাস। ইংরেজিতে ওপিনিয়িন- মত বা মতামত এবং আরবিতে যাকে বলা হয় মাজহাব। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো মত। কিংবা কোনো একটি পথ। অথবা কোনো একটি মতবাদ বা মতাদর্শ। যে পথ বা মতকে কিংবা মতার্দশকে অনুসরণ করেই মানুষ পথ চলে। দ্বীনি বিষয়ে অথবা জাগতিক বিষয়ে পথ চলে। জীবনযাপন করে ইত্যাদি।
কয়েকটি উদাহরণ লক্ষ্য করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট বুঝে আসবে বলে আশা করি। যেমন, ইংরেজি ইজম বা মতবাদ থেকে সোশ্যালিজম সমাজতন্ত্র। সেকুলারিজম ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ ইত্যাদি। গোটা বিশ্বের মানুষ যেমন এগুলোর কোনো না কোনোটির অনুসরণ করে। আনুগত্য প্রকাশ করে। এ জাতীয় মানব রচিত মতবাদকেই মেনে চলে। কাজেই এসব হলো, এক একটি মাজহাব বা মতবাদ কিংবা মতাদর্শ। শুধু উদাহরণ হিসেবে উপর্যুক্ত ইজমণ্ডমতবাদগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসবের বিশুদ্ধতা ও বৈধতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। এক কথায় মানব রচিত সবগুলো বর্জনীয়। কেননা, এগুলোর প্রত্যেকটিইগুলো ভুল ও অসঙ্গতিতে পরিপূর্ণ। এজন্যই এগুলো বিতর্কিত বিষয়। এসব থেকে বিরত থাকা জরুরি এবং আবশ্যক।
ইসলাম হচ্ছে আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত মনোনীত এক জীবন ব্যবস্থা। যার সঠিক অর্থ মর্ম ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সম্পর্কে কোরআন ও হাদিস পাঠের মাধ্যমেই আমরা শুধু জানতে পারি। সরাসরি ওহি তথা কোরআনে কোনো বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা উল্লেখ করা হলে, তার জন্য আর কোনো হাদিসের অনুসরণ করা জরুরি নয়। তবে হাদিসে রাসুল (সা.) কর্তৃক এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ বা অন্য কোনো বক্তব্য পাওয়া গেলে। সেটা ভিন্ন কথা। তখন কীভাবে সমাধান করা হবে? কোনটার ওপর আমল করা হবে? এই আমলযোগ্য ও অগ্রাধিকার যোগ্য আমল বা বিষয়টি স্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট করতে গিয়ে যখন একাধিক মত বা মতামত উঠে আসে। তখনই মাজহাব প্রসঙ্গ বা মতের আলোচনা এসেছে। যথা, এটি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাজহাব।
এটি ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মতামত। এই হয়ে গেল দুটি মাজহাব। একটি ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর। অপরটি ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর। সুতরাং এ কথা নিশ্চিত বলা যায় যে, কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তির মত বা মতামতই হচ্ছে মাজহাব। বাংলায় অমুকের মত। তমুকের মতামত। অমুক শায়েখের অভিমত ইত্যাদি। এভাবেই এক একজন বিজ্ঞ আলেম ও মুজতাহিদ ইমামের গবেষণালব্ধ, সঠিক ও সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতটিই মাজহাব হিসেবে গৃহীত হয়েছে। খইরুল কুরুন তথা সাহাবিদের যুগ থেকে বরং আরেকটু বাড়িয়ে বললেও ভুল হবে না যে, নবীজির সময় থেকেই এই একাধিক মত বা মাজহাবের সূচনা হয়েছিল। যা পরবর্তীকালে সাহাবি তাবেয়ি তাবে-তাবেয়ি ও মুজতাহিদ ইমাম (রহ.) সময় আরও ব্যাপক ও বিস্তৃতি লাভ করেছে। সাহাবিদের যুগে বা তাদের মধ্যেও মতভেদ ছিল এ বিষয়টি হাদিসের কিতাবে বোখারি ও তিরমজিসহ বহু কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। যা একাডেমিক শিক্ষা গ্রহণকারী আলেমদের কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার।
আমরা যদি লক্ষ্য করি, আমাদের বর্তমান সময়ে চিকিৎসাসেবার উন্নয়ন ও অগ্রগতির এই সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে এলোপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি। এ ছাড়াও রয়েছে, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা, ইউনানি চিকিৎসা এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতি। সকলের উদ্দেশ্য এক এবং একটি, তা হলো সুস্থতা অর্জন করা। এ ছাড়া রোগ নির্ণয় করা। রোগের ধরন নির্ধারণ করা। কারণ ও উপসর্গ খুঁজে বের করা। এগুলো এক একটি আলাদাবিষয়। আলাদা শাস্ত্র। ভিন্ন ভিন্ন পাঠের বিষয়। এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই বলে মনে করি। এখন আপনি কোন পদ্ধতি গ্রহণ করে কীভাবে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করবেন? কার কোন পদ্ধতি অবলম্বন করবেন? সেটা আপনার একান্ত বিষয়। কিন্তু আবারও বলছি, সকলের উদ্দেশ্য এক, তা হলো সুচিকিৎসা দেওয়া। সঠিকভাবে সুস্থতা নিশ্চিত করা।
চিকিৎসা পদ্ধতির আলোচনা শুধু তুলনার জন্য বলছি। উদাহরণ এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসাবে নয়! এখন আপনার অভিপ্রায়, সাধ্য ও সামর্থ্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আপনি যেকোনো একটি পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন। চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করা ও আরোগ্য লাভ করাই মূল কথা। কাজেই এখানে যেমন কাউকে বাধ্য করা অন্যায়। রুচি ও সাধ্যের বিষয়। একইভাবে ফিকহি মতপার্থক্যের কারণে দলিলভিত্তিক বিশুদ্ধ একাধিক ওপিনিয়ন বা মতামত কিংবা মাজহাবও সঠিক এবং সময়োপযোগী। কোনোটি স্থান কাল পাত্র উপযোগী। একাধিক বর্ণনা, স্থানের ভিন্নতা এবং ব্যক্তিবিশেষের কর্মের ভিন্নতাও ভিন্ন মত বা মাজহাবের উৎস এবং উৎপত্তি।
প্রত্যেক মুজতাহিদ ইমাম (রহ.) তাদের ইজতেহাদণ্ডগবেষণার আলোকে কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসের সমন্বয়েই সঠিক এবং সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতটি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রে প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট পুণ্যের অধিকারী। তবে উম্মাহর আমল শুধু চারজন মুজতাহিদ ইমাম (রহ.) আমলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়েছে। বাকি অনেক মুজতাহিদ ইমাম (রহ.) মতামত বা মত আর আমলযোগ্য হিসেবে গ্রহণ যোগ্যতা লাভ করতে পারেনি। এজন্যই চারটি মাজহাব প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। বাকিগুলো এখনও ফিকহের কিতাবাদিতে বিদ্যমান রয়েছে। ফিকহের শিক্ষার্থী, পাঠক, গবেষক ও চর্চাকারী মাত্রই তা অজানা নয়। এজন্য মাজহাব চারটি কেন? নবীজির মাজহাব কোনটা ছিল? সাহাবিগণ কোন্ পদ্ধতি বা মাজহাব মানতেন? এ জাতীয় প্রশ্ন করা অবান্তর।
বর্তমান সময়ে এখন যদি কোরআন-হাদিস ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানহীন একজনের কাছে বলা হয়, এটি অমুক শায়েখের মাজহাব। ওটা অমুক বক্তার মাজহাব। তবে এগুলোর অর্থ হবে, এসব তাদের মত বা মতামত। সুতরাং, আপনি এখন যাকে বা যাদের অনুসরণ করেন, করছেন নিয়মিত। কেমন যেন, আপনি তার বা তাদেরই মতের ওপর আমল করছেন। অর্থাৎ কোনো একজন শায়েখ আলেম বক্তা প্রমুখেরই মাজহাব মেনে চলছেন। নিজে সরাসরি কোরআন-হাদিস সুন্নাহর ওপর আমল করছেন না। এটা সম্ভবও নয়। কেননা, সব হাদিসই আমল যোগ্য নয়। এজন্য আপনাকে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে একজন নির্ভরযোগ্য আলেমের শরণাপন্ন হতে হবে। মানতে হবে তার দেখানো ও বাতলানো পদ্ধতি অনুযায়ী, তারই ধর্মীয় প্রেসক্রিপশন অনুপাতে।
কোনো একজন চিকিৎসক ছাড়া জ্বর ও ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল অথবা এ জাতীয় একটা অষুধ খাওয়া যেমন সঠিক হতে পারে না। অন্তত পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরি। তেমনি বিজ্ঞ কোনো একজন আলেম বা ফকিহের মতামত ছাড়াও দীনের কোনো বিষয়ে কথা বলা ও আমল করা সঠিক নয়। এতে ক্ষতির শঙ্কাই বরং অনেক বেশি। এজন্যই কোনো না কোনো একজন ইমাম, আলেম শায়েখের মত বা মাজহাব মেনে চলাই নিরাপদ। প্রসিদ্ধ জগদ্বিখ্যাত চার ইমামের সময়কাল যেহেতু কল্যাণ যুগের বা উত্তম সময়ের নিকটবর্তী। তাই তাদের কোনো একজনের পদাঙ্ক অনুসরণ করাই নিরাপদ এবং বিশুদ্ধ মাজহাব বা মতের নিকটবর্তী। এজন্যই ভুল-ত্রুটি থেকে বিরত থাকতে এবং নির্ভুল দ্বীন ইসলাম মানতে কোনো একটি মাজহাব মেনে চলাই জরুরি।
লেখক : খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর