ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির মসনবি শরিফ (কিস্তি- ০৫)

চিরঞ্জীব চিরন্তন সত্তার প্রেমে আসক্তির গল্প

ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
চিরঞ্জীব চিরন্তন সত্তার প্রেমে আসক্তির গল্প

প্রাচীনকালে এক বাদশাহ ছিলেন জাগতিক ও আধ্যাত্মিক উভয়বিধ ক্ষমতার অধিকারী। দ্বীন ও দুনিয়া, যাহেনি ও বাতেনি উভয় গুণের সমাবেশ ছিল তার চরিত্রে। তিনি একবার শিকারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। যাওয়ার সময় পথের ধারে দেখতে পেলেন এক যুবতী রূপসী দাসী। বাদশাহ সেই দাসীর প্রেমে পড়ে যান। অনেক অর্থ দিয়ে খরিদ করেন দাসীকে। মাওলানা রুমি এই রোমাঞ্চকর কাহিনির শুরুতে এখানে সংসার জীবনের একটি শাশ্বত সত্য তুলে ধরে বলেন যে, পূর্ণ আনন্দ বলতে যা বুঝায় তা জগতে কারও নসীব হয় না। একদিকে মন আনন্দে ভরে গেলে অন্যদিকে ভেঙে যায়। বাদশাহও সেই অবস্থার সম্মুখীন হন। ঘটনাক্রমে দাসী অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাদশাহর অন্তরজ্বালা ভীষণভাবে বেড়ে যায়। তিনি রাষ্ট্রের বড় বড় হেকিম জড়ো করেন বাঁদীর চিকিৎসার জন্য। তাদের মোটা অংকের সম্মানীর ওয়াদা দেন। ডাক্তাররা মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের অহমিকায় আক্রান্ত হন। রোগীর চিকিৎসার ব্যাপারে দর্পভরে তারা বলেন, আমরা অবশ্যই আপনার রোগীকে ভাল করে দেব। অহংকারে তারা ইনশাআল্লাহ ‘আল্লাহ যদি চান’- একথা বলেননি। মানুষের অক্ষমতা আর আল্লাহর কুদরতের মহিমা তারা বুঝতে পারেননি। এজন্যে আল্লাহ্্ মানুষের অক্ষমতা হাতেনাতে প্রমাণ করে দিলেন। তাদের চিকিৎসায় উল্টা ফল হতে থাকে। মওলানা রুমি (রহ.) এখানে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলার তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন : ইনশাআল্লাহ বা ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলার আসল তাৎপর্য মৌখিক উচ্চারণ নয়; বরং অন্তরের উপলব্ধিই মূল কথা।

মওলানা এখানে মৌখিক দোয়া-দরুদ নিয়ে যারা মনে মনে তুষ্ট, অন্তরের উন্নতি-অগ্রগতির খবর যাদের নেই, তাদের ভুল ধরিয়ে দিতে চান। বাদশাহ তার বাতেনী দৃষ্টিতে বুঝতে পারেন, গলদ কোথায়? হেকিমদের চিকিৎসা কেন উল্টা ফল দিচ্ছে? বাহ্যিক উপায়-অবলম্বন ব্যর্থ দেখে বাদশাহ আল্লাহ্র আশ্রয় গ্রহণ করেন। দৌড়ে চলে যান মসজিদে। মেহরাবের নিকটে সেজদায় লুটিয়ে পড়েন মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে। তিনিই তো নিরাশার আশা, মানুষের একমাত্র ভরসা। বুকফাটা কান্নায় বাদশাহ চোখের পানিতে সিজদার স্থান ভিজিয়ে দেন। আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন।

কঠিন সমস্যা ও সংকট থেকে উদ্ধার পেতে হলে আল্লাহ্র কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং বুক ভাসিয়ে কান্নাকাটি করলে আল্লাহ্র রহমতের দরিয়ায় জোয়ার আসে- এই চিরন্তন সত্যটি এখানে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী করে তুলে ধরেন মওলানা। মওলানা এ সূক্ষ্ম তত্ত্বটি ব্যক্ত করেন যে, দোয়া তখনই কবুল হয়, যখন মুখ ও অন্তরের ভাষা এক হয়, যখন ইখলাস ও অসহায়ত্ব মানুষের সমগ্র অস্তিত্বকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং তার ফলে বুকফাটা কান্না আসে।

বাদশাহ কাঁদতে কাঁদতে ঘুমে তলিয়ে যান। সুফিদের মতে স্বপ্নের জগতে অনেক আধ্যাত্মিক সত্য তথ্য প্রকাশিত হয়। এখানেও ঘুমের ঘোরে বাদশাহর সমস্যার জট খুলে যায়। এক বৃদ্ধ এসে তাকে আশ্বাস দেন আগামীকাল এক আগন্তুক রাজদরবারে আসবেন। যিনি ঐ রোগীর উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। আনন্দের আতিশয্যে বাদশাহর ঘুম ভেঙ্গে যায়। তিনি ভোর হওয়ার অপেক্ষা করতে থাকেন রাজপ্রাসাদের বৈঠকখানার বারান্দায় সেই আগন্তুক হেকিমের জন্যে। হেকিম আসছিলেন। কল্পনায় মনে হচ্ছিল আলো-ছায়ার মাঝখানে নতুন চাঁদ যেন ভেসে ভেসে আসছে। কল্পনা বা ‘খেয়াল’ শব্দটি উচ্চারিত হওয়ায় মওলানার চিন্তা চলে গেল দর্শনের জগতে। মানুষের কল্পনাশক্তি এবং মানব জীবনের সর্বত্র ধারণা ও কল্পনার আধিপত্যের ব্যাখ্যা দেন নানা উপমার সাহায্যে। এখানে আল্লাহর অলীদের কল্পনাশক্তির মহিমা ব্যাখ্যা করে বলেন, আল্লাহর গুণাবলির যে বাগান সেই বাগানের সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি পতিত হয় আউলিয়ায়ে কেরামের কল্পনায়।

বাদশাহ আগন্তুক মেহমান হেকিমকে অভ্যর্থনা জানান। তার প্রতি পূর্ণ আদব প্রদর্শন করেন। মওলানা এখানে ‘আদবের’ সুফল এবং মানব চরিত্রের জন্য ‘আদব’ যে এক মহা ভূষণ ও অলংকার, তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন এবং ‘বেয়াদবির’ শোচনীয় পরিণাম ও কুফল বর্ণনায় শয়তান, হজরত আদম (আ.) ও আসমান-যমীনের নানা উপমা পেশ করেন। হজরত মুসা (আ.)-এর কওম বেয়াদবির কারণে আসমানি খাবার থেকে মাহরূম হওয়ার কোরআনে বর্ণিত ঘটনাকে তিনি দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন।

আগন্তুক হেকিমের সঙ্গে বাদশাহর সাক্ষাতের দৃশ্যটি বড় চমৎকার। বাদশাহ বলছেন যে, আমি যেন আপনার জন্যই পাগল হয়েছিলাম। আমার প্রেমানন্দ দাসী নয়, আপনি। তবে আল্লাহ্্ একটার উসীলায় আরেকটা মিলায়। আপনাকে পেয়ে আজ আমি বড়ই ধন্য। মওলানা এখানে অলি-আল্লাহর গুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেন। বলেন যে, তাদের দর্শনই মানুষের হাজারো সমস্যার সমাধান।

বাদশাহ হেকিমকে রোগীর কাছে নিয়ে যান। হেকিম বলেন যে, বাড়ির ভেতর বাইরে থেকে সব লোককে সরে যেতে হবে। হেকিম বুঝতে পারেন, এই রোগী সাধারণ রোগী নয়; প্রেমের রোগে আক্রান্ত হয়েছে দাসী।

প্রেম ও ‘এশ্ক্’-এর প্রসঙ্গ আসতেই তা মওলানার চিন্তাকে আলোড়িত করে। তিনি প্রেমের পরিচয় বর্ণনায় কয়েকটি বয়েত রচনা করে বলেন, সেটিই আসল প্রেম যা মানুষের আত্মিক পূর্ণতা আনে এবং মানুষকে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। তবে আল্লাহ্র রহস্য দর্শনের অনুবীক্ষণযন্ত্ররূপী প্রেম এত ব্যাপক-বিশাল ও অবর্ণনীয় যে, তা ভাষা-বর্ণনা ও লিখনির আয়ত্তে আনা যায় না। কেননা, যে কোনো বর্ণনা ও সংজ্ঞা সেই অর্থ ও আকৃতিকেই প্রকাশ করে, যা মানুষের মনে বদ্ধমূল। কারণ মানব মনে আয়ত্তাধীন না হলে তা ভাষায় ও বর্ণনায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কেউ প্রকাশের চেষ্টা করার অর্থ হবে সেই বিষয়কে আরো অধিক অস্পষ্ট ও আচ্ছন্ন করা। কাজেই প্রেমকে দিয়েই প্রেমকে চেনা উচিত। ঠিক সূর্যের আলোর মত। আলো দিয়েই সূর্যকে চেনা যায়। অবশ্য ছায়া দিয়েও সূর্যকে চেনা যায়, কিন্তু ছায়া তো সেখানেই থাকে, যেখানে সূর্যের আলো থাকে না।

সূর্যের প্রসঙ্গ আসাতে মাওলানার মন চলে গেল আরেক সূর্যের দিকে। সূর্য ফারসিতে খুরশীদ আর আরবিতে শামস। এই শামস আসমানের নয়, মওলানার হৃদয়-আকাশের। শামসে তাবরিজি। তাবরিযের সূর্য। শামসে তাবরিযী হলেন নূরে হক। এখানে এসে মওলানা প্রেমের আতিশয্যে কোনো কথা বলতে অপারগ, নির্বাক। কাজেই সেই প্রেমের আলেখ্য অন্য সময়ে ন্যস্ত করেন। বন্ধুরা বার বার অনুরোধ করেন শামসে তাবরিযীর প্রেমের রহস্য বর্ণনার জন্য। কিন্তু মওলানা ফিতনা ও রক্তপাতের আশংকা করেন। তাই মুখ বন্ধ করে ফিরে আসেন আসল গল্পে।

আগন্তুক হেকিম দক্ষ মনোবিজ্ঞানীর মতো ধীরে ধীরে বিনম্র ভাষায় বাঁদীর সঙ্গে আলাপ জমান। মনে কোনো সন্দেহ জাগার সুযোগ না দিয়ে দাসীর অতীত জীবনের নানা কথা জিজ্ঞেস করেন : কোথায় তার বাড়ি, আত্মীয়-স্বজন, চেনা-জানা কারা? কোথায় কোথায় ছিল? একেক শহরের নাম নেন আর হাতের শিরার দিকে লক্ষ্য রাখেন। হেকিম যখন সমরকন্দ নামোল্লেখ করলেন, লক্ষ্য করলেন, দাসীর শিরার স্পন্দন দ্রুততর হয়েছে। হেকিম তখনই সমস্যার সূত্র ধরতে পারেন। হেকিম এসব প্রশ্ন এমনভাবে করেন, যাতে দাসী হেকিমের গোপন উদ্দেশ্য বুঝতে না পারে। মওলানা ব্যাপারটিকে পায়ের নিচ থেকে কাঁটা বের করার দক্ষতার সাথে তুলনা করেন। অদক্ষ চিকিৎসকদের তিনি এমন লোকের সাথে তুলনা করেন, যে গাধার লেজের নিচে কাঁটা গুঁজে দেয়। গাধা কাঁটা বের করবার জন্য যতই লাফায়, কাঁটা ততই আরো শক্তভাবে বিদ্ধ হয়। হেকিম এই পন্থায় এ তথ্য উদঘাটন করেন যে, দাসীর প্রেমাস্পদ হচ্ছে এক স্বর্ণকার। সমরকন্দে তার বসবাস। হেকিম তার ঠিকানা জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন, সারপোল মহল্লার গাতফার গলিতে তার বাড়ি। হেকিম দাসীকে নিশ্চয়তা দেন যে, তার মনের মানুষকে অবশ্যই তার কাছে আনার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হল, এর গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।

মওলানা এখানে মনের গোপন কথা গোপন রাখার সুফল বর্ণনা করেন। এ প্রসঙ্গে একটি তত্ত্বকথার উদ্ধৃতি দিয়ে কয়েকটি উপমা ও উদাহরণ পেশ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি সত্য ওয়াদা ও মিথ্যা ওয়াদার মধ্যকার তফাৎ নির্দেশ করে মানব মনে এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, সংক্ষেপে তা ব্যাখ্যা করেন।

হেকিম বাদশাহকে এসে বললেন, দাসীর চিকিৎসার একমাত্র পথ হচ্ছে, প্রথমে সমরকন্দ হতে স্বর্ণকারকে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। বাদশাহ সমরকন্দে কয়েকজন দূত প্রেরণ করেন। রাজকীয় সম্মান ও অঢেল সম্পদের প্রলোভন দেখিয়ে আত্মীয়-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বর্ণকারকে রাজদরবারে নিয়ে আসা হল। মওলানা এখানে সম্পদের লোভ কীভাবে মানুষকে মৃত্যুর দুয়ারে টেনে নিয়ে আসে তার হাকীকত বর্ণনা করেন।

স্বর্ণকার আসার পর হেকিমের পরামর্শে দাসীকে তার কাছে ফেরত দেয়া হয়। কিন্তু হেকিম গোপনে শরবতের মাধ্যমে স্বর্ণকারকে বিষপান করান। সেই স্লো-পয়জনে ধীরে ধীরে স্বর্ণকার দুর্বল ও শ্রীহীন হয়ে পড়ে। ওদিকে স্বর্ণকারের প্রতি দাসীর প্রেমেও ভাটা পড়ে। এক পর্যায়ে কৃত্রিম প্রেম নিঃশেষ হয়ে যায়। মাওলানা প্রমাণ করেন যে, যে প্রেম রং রূপ ও আকৃতির জন্য, তার পরিণতি এরূপই হয়।

শেষ পর্যন্ত স্বর্ণকার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তবে মৃত্যুর আগেই বুঝতে পারে যে, তার প্রাণের শত্রু কে এবং কেন তাকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। এ স্তরে এসে মাওলানা মানুষের কর্মের প্রতিফল সম্পর্কে স্বর্ণকারের যবানীতে অভাবনীয় বর্ণনা উপস্থাপন করেন। স্বর্ণকারের প্রতি দাসীর প্রেম লোপ পাওয়াকে মওলানা এ কথার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন যে, বস্তু ও দেহগত যে প্রেম, তা ক্ষণস্থায়ী। কেননা স্বয়ং মানুষেরই তো স্থায়িত্ব নেই; কাজেই মানুষের উচিত সেই চিরঞ্জীব চিরন্তন সত্তার প্রেমে আসক্ত হওয়া। কেননা, সেই প্রেম মানুষকে প্রতিমুহূর্তে নতুন জীবন দান করে। আল্লাহ্্ কারো প্রেমের, আসক্তির আদৌ মুখাপেক্ষী না হলেও তিনি দয়ার্দ্র-দয়ালু বিধায় তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা আমাদের পক্ষে সম্ভবপর। কারণ দয়ালু দাতার পক্ষে কোনো কাজই অসম্ভব নয়।

স্বর্ণকারকে হত্যার ঘটনায় এক জটিল প্রশ্ন জাগে, কীভাবে দ্বীন ও দুনিয়ার রাজত্বের অধিকারী একজন বাদশাহ একজন লোকের প্রাণহানিতে সন্তুষ্ট হতে পারলেন। এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে মওলানা কামিল (পরিপক্ক) লোক ও নাকেস (অপরিপক্ক) লোকদের কাজের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেন। এ আলোচনা অনেক দীর্ঘ ও মনমুগ্ধকর। মাওলানার মতে, কাজের সৌন্দর্য বা কদর্যতা ব্যক্তির নিয়ত ও উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভরশীল। যেখানে নিয়ত ও উদ্দেশ্য হয় কোনো কল্যাণ সাধন, সেখানে কাজটি সুন্দর বলে গণ্য হয়। আর যদি উদ্দেশ্য ও নিয়ত খারাপ হয় তাহলে কাজটিও মন্দ হয়ে যায়। এর প্রমাণ হিসেবে খিযির (আ.) কর্তৃক কয়েকজন দরিদ্র মানুষের মালিকানাধীন নৌকা ফুটো করে ডুবিয়ে দেয়া এবং আরেক ঘটনায় এক বালককে হত্যা করার ঘটনা উল্লেখ করেন, যা কুরআন মজীদে সূরা কাহফে (১৮) বর্ণিত। প্রথম ঘটনায় নিরীহ ইয়াতীমের সম্পদ ধ্বংস এবং পরের ঘটনায় নিরপরাধ বালকের হত্যাকাণ্ড ঘটান হয়। যা দৃশ্যত খুবই মন্দ।

কিন্তু খিজির (আ.)-এর উদ্দেশ্য সৎ, মহৎ ও কল্যাণময় ছিল বিধায় কাজগুলো পছন্দনীয় হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে, তিনি বাচ্চাদের সুন্নতে খাতনার কথা উল্লেখ করেন। হাজাম এসে ধারালো ক্ষুর দিয়ে বাচ্চার খতনা করাচ্ছে, রক্তপাতের আশংকায় বাচ্চা চিৎকার দিয়ে কাঁদছে; কিন্তু বাচ্চার ভবিষ্যত কল্যাণ চিন্তা করে মা আনন্দে আন্দোলিত।

মওলানা রুমি (রহ.) বলছেন যে, কামিল লোক আল্লাহর হুকুম ও ওহীর নির্দেশ মোতাবিক কাজ করেন, প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা বা ব্যক্তিগত মতলব নিয়ে নয়। এভাবে আল্লাহর নির্দেশে কেউ যদি হত্যাকাণ্ডও ঘটায়, তা আল্লাহর হুকুমেই ঘটায়। এই হত্যা হয় উন্নততর ও আনন্দময় জীবনের পটভূমি। অনুরূপভাবে পীরের নির্দেশ মতো সাধক যে কৃচ্ছসাধনায় রত হয়, দৃশ্যত তা মৃত্যুর মত। দুনিয়ার সুখ-সম্ভোগ তাকে ত্যাগ করতে হয়। আসলে কিন্তু তা নয়। কারণ উন্নত চরিত্র ও আত্মিক উন্নতি হচ্ছে সুন্দর-সুখী জীবনের পটভূমি। এসব দিক চিন্তা করে ভবিষ্যত কল্যাণ বিচার-বিবেচনায় রেখে তিনি স্বর্ণকারকে হত্যার ব্যাপারে সম্মতি দেন।

এখন নিজকে দায়মুক্ত করার মানসে বলছেন, বাদশাহ যদি নিজস্ব কুমতলব বা স্বার্থদুষ্ট হয়ে স্বর্ণকারকে হত্যার পরিকল্পনা করতেন, তাহলে তার নামও আমি মুখে আনতাম না, কারণ আল্লাহ্র বান্দা কোনো পাপিষ্ঠের প্রশংসা করতে পারে না। কাজেই আল্লাহ্র অলী আর নফসের অনুসারী মানুষকে এক পাল্লায় ওযন করা উচিত নয়। মওলানা বিষয়টি ব্যাখ্যার জন্য অসংখ্য উপমার আশ্রয় নিয়েছেন অপর একটি বিখ্যাত গল্পের সূত্রে। অর্থাৎ মুদির দোকানি ও তোতা পাখির গল্পে। আমরা এবার মনোনিবেশ করব বাদশাহ-বাঁদীর প্রেম কাহিনিতে মওলানা রুমির ধারাভাষ্যে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত