অনলাইন সংস্করণ
১০:৩৪, ২৩ মার্চ, ২০২৬
বাড়তি মানুষ ও যানবাহনের চাপে ন্যুজ হয়ে পড়া রাজধানী ঢাকা যেন একটু হাঁফ ছেড়েছে ঈদের ছুটিতে; কোলাহলবিহীন সড়ক ও অফিস-কারখানা বন্ধের সঙ্গে বৃষ্টির পরশে দূষণ কমে স্বস্তিতে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ মিলেছে।
প্রিয়জন ও পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে এবার ছুটির শুরুতে দৈনিক গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষের রাজধানী ছাড়ার তথ্য দিয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ঈদের দিন পর্যন্ত তা কোটি হয়ে যায় বলে ধারণা সংস্থাটির।
দীর্ঘ ছুটিতে বাড়ি ফেরা ও বিভিন্ন পর্যটন শহরগুলোতে ঈদ করতে যাওয়ায় দুই কোটির বেশি মানুষের এ নগরী এখন ফাঁকা।
এতে মানুষের সঙ্গে যান চলাচল সর্বনিম্নে চলে যাওয়ায় বায়ু দূষণের সঙ্গে কমেছে শব্দ দূষণও। স্বাভাবিক কোলাহলমুক্ত পরিবেশে ঢাকার সড়কগুলোতে চলাচলে নেই কান ঝালাপাড়া করা হর্নের শব্দ।
পরিবেশ দূষণ কম হওয়ায় উন্নীত হয়েছে ঢাকার বায়ুমানের। আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) বলছে, রোববার ঢাকার বাতাস ছিল ‘গ্রহণযোগ্য স্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে।
এদিন বেলা পৌনে ১২টায় একিউআই স্কোর ছিল ৮১। এ সময়ে পল্টনে ৮৩, সাভার ৮৪, আজিমপুর ৮৮ ও টুঙ্গিতে বায়ুমানের স্কোর ছিল ৯২।
আইকিউ এয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী, স্কোর ৫১ থেকে ১০০ হলে তাকে 'মাঝারি' বা 'গ্রহণযোগ্য' মানের বায়ু হিসেবে ধরা হয়।
তা বেড়ে ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর হলে 'সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর', ১৫১ থেকে ২০০ হলে তা 'অস্বাস্থ্যকর' এবং ২০১ থেকে ৩০০ হলে তাকে 'খুবই অস্বাস্থ্যকর' বলা হয়। ৩০১ এর চেয়ে বেশি স্কোর হলে তাকে 'বিপজ্জনক' বা 'দুর্যোগপূর্ণ' বলে বিবেচনা করা হয়।
দীর্ঘকাল ধরেই ঢাকার বায়ুমান বেশিরভাগ সময়ে দূষিত থাকে। আবহাওয়া অনুযায়ী, শীতকালে এই দূষণ চরম আকার ধারণ করে, তবে বর্ষাকালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়।
রোববার বিকেল বেলায় বিভিন্ন স্থানে দর্শনার্থীদের চলাচল বেড়ে যাওয়ায় একিউআইও খানিকটা বেড়ে যায়।
বায়ুমান তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করে বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তর। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, রোববার সন্ধ্যা ৭টায় তা ছিল ১১৭।
ঢাকার বাইরে যানবাহন বেশি চলাচল করায় সারাদেশে সবচেয়ে স্কোর বেশি ছিল রাজশাহীতে ১২৫। এছাড়া ওই সময়ে কুমিল্লায় ছিল ১১২, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ৭৫, সিলেটে ৭০, ময়মনসিংহে ৮১, নরসিংদি ৬৫ ও সাভারে ৩১।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের ছুটির আগের সপ্তাহে ঢাকার বায়ুর একিউআই স্কোর ছিল গড়ে ১০৯ থেকে ১৫৪।
বাতাসের মান নির্ভর করে ভাসমান সূক্ষ্ম ধূলিকণার পরিমাণ (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম-১০) এবং অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণার পরিমাণের (পিএম ২.৫) ওপর, যা পরিমাপ করা হয় প্রতি ঘনমিটারে মাইক্রোগ্রাম (পার্টস পার মিলিয়ন-পিপিএম) এককে।
দূষণের মাত্রা বুঝতে পিএম ২.৫, পিএম ১০ ছাড়াও সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ও গ্রাউন্ড লেভেল ওজোনে সৃষ্ট বায়ুদূষণ বিবেচনা করে তৈরি করা হয় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই।
বায়ুমান বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ অধিদপ্তারের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘বৃষ্টিতে বাতাসের মান ভালো হয়ে যায়। সুক্ষকণাগুলো বৃষ্টির পানিতে নিচে নেমে যায়। ইটভাটাগুলো তখন বন্ধ হযে যায়, ময়লা পোড়ানো যায় না, তাই বাতাসের মান ভালো হয়ে যায়। অন্য দেশ থেকেও দুষিত বাতাস আসে কম। দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর থেকে তখন বাতাস আসায় ভালো বাতাসটা আসে।
এখন তো ছুটির সময়ে কলকারখানা বন্ধ, গাড়ির সংখ্যা কমে গেছে ঢাকায়। বৃষ্টিও হয়েছে, সব মিলিয়ে বাতাসের মান ভালো আছে। ছুটি শেষে হয়ত পরিস্থিতি কিছুটা বদলাবে।’’
ফাঁকা সড়কে স্বস্তি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
একের পর এক মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা এবং গণ পরিবহন ও দূর পাল্লার যানের উপস্থিতিতে সর্বনিম্নে নামায় মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেও চাপ কমেছে।
রাজধানীর সবচেয়ে ব্যস্ত মোড়ের একটি পুরানা পল্টন, যেখানে অন্য সময় চার পুলিশ সদস্যকে চারটি স্থান থেকে একসঙ্গে যান নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হয়। সেখানে রোববার একজনই হাতের ইশারায় চাপমুক্তভাবে সামাল দিচ্ছেন যান চলাচল।
দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য ইসমাইল আলম সবুজ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘বাস চলছে অল্প কিছু। অনেক সময় সংকেত দেওয়াই লাগছে না। নিজেরাই দেখে শুনে যেতে পারছে। কোনো দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেদিকে নজর রাখছি। সেজন্য মাঝে মধ্যে হাত উঠাতে হয়।’’
একই চিত্র চোখে পড়ল আরেক ব্যস্ত এলাকায় মহাখালী বাস টার্মিনালে। টার্মিনাল থেকে বাস বের হতে আগে যেখানে সামনে-পেছনে দুইজনকে সহায়তা করতে হত, সেখানে এখন চালক নির্বিঘ্নে একাই বাস নিয়ে বের হতে পারছেন।
রাজত্ব ব্যাটারি রিকশার
ফাঁকা সড়কে এখন সবচেয়ে বেশি চলাচল করছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। অলিগলি ছাপিয়ে পুরো রাজপথে নির্বিঘ্নে চলছে এগুলো।
ঈদের সময়ে বেশি আয় করার সুযোগ থাকায় ঢাকায় থেকে যাওয়ার কথা বললেন রিকশাচালক হামিদুর রহমান। বলেন, ‘‘ঈদে গাড়ি চালন যায় ইচ্ছামত। মানুষ ঈদে বখসিসও দেয়। তাই বাড়ি যাই না।
দিনে ৪-৫ হাজার টাকা ভাড়া মারা যায়। তাই ঈদের কয়দিন কামাই দেই না।’’
অন্য সময়ে যেখানে দিনভর চালালে দুই হাজার থেকে কখনো কখনো আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়, সেখানে দিনে এখন ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় হওয়ার কথা বলছেন তারা।
‘ঈদে বখশিস মেলে, তাই পোষায়’
ফাঁকা সড়কে এক ঘণ্টায় রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা যেতে পারছেন বাসের চালকরা। সাধারণ সময়ে নিম্নে আড়াই ঘণ্টার মত সময় লাগে।
গাজীপুর পরিবহনের বাসচালক আব্দুর রহিম বলেন, ‘‘চালাইয়া আরাম আছে। তয়, মানুষ কমতো। ভাড়া কম উঠে। বইসা থাকলে তো লস, তাই চালাই। ঈদের সময় বখসিস দেয় প্যাসেঞ্জাররা, তাতে পোষায় যায়।’’
আগে দিনভর এ রুটে তিনটি রাউন্ড ট্রিপ দিতেই হিমশিম খেতেন চালকরা। এখন সেখানে ৪ থেকে ৬ বার যাওয়া আসা করছেন।
একই চিত্র যাত্রাবাড়ী থেকে ছেড়ে যাওয়া গাবতলী, সাভার, নরসিংদী, মিরপুর, নিউমার্কেট রুটে চলাচলকারী বাসের বেলাতেও।
তবে সোমবার বিকাল থেকে পাল্টাতে থাকবে চিত্র। মঙ্গলবার থেকে কাজে যোগ দিতে ফিরতে শুরু করবেন নগরবাসী।