ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ২৯ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বোমা, গুলি, মাইন ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশে সীমান্তে উদ্বেগ

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৫৭ সদস্য পুলিশ হেফাজতে
বোমা, গুলি, মাইন ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশে সীমান্তে উদ্বেগ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরে ত্রিমুখী সংঘাতের জের ধরে সীমান্ত জুড়ে এখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। বোমা, গুলি এপারে এসে পড়া, স্থল মাইন বিস্ফোরণে আহত এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যের অনুপ্রবেশ এই উদ্বেগকে বাড়িয়েছে বহুগুণ।

এর মধ্যে সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর আরও ৪ সদস্য পালিয়ে অনুপ্রবেশ করেছে। এ নিয়ে অনুপ্রবেশ করা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ জন। যে ৫৭ জন সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত টেকনাফ থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পয়েন্ট ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস।

তিনি জানান, রোববার ৫৩ জন এবং সোমবার সকালে আরও ৪ জন পালিয়ে এসেছে। যারা টেকনাফ থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। এর মধ্যে একজন আহত রয়েছেন। তাকে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে বিজিবির পক্ষে একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। এ মামলা দায়ের করা হলে ৫৭ জনের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

স্থল মাইনে পা হারানো যুবক চমেকে: সোমবার সকাল দশটায় কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তে ‘বাংলাদেশ অভ্যন্তরে’ মাইন বিস্ফোরণে আবু হানিফ নামের এক যুবকের বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল সীমান্তের নাফ নদীর শাহজাহানের দ্বীপ ও হাঁসের দ্বীপের মাঝামাঝি এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে।

আহত আবু হানিফ (২২) টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার ফজল করিমের ছেলে। সে পেশায় মৎস্যজীবী।

আহতের বাবা ফজল করিম বলেন, সকালে সীমান্তের নাফ নদীতে বাংলাদেশ অংশে জেগে উঠা ছোট দ্বীপ শাহজাহানের দ্বীপে তার ছেলে আবু হানিফ জাল ও নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যায়। এক পর্যায়ে নদীতে নামলে আকস্মিক বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আবু হানিফ গুরুতর আহত হন। বিস্ফোরণে তার বাম পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অন্য পা-টিও সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত হয়। আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে এ ঘটনা ঘটে বলে ধারণা তার।

তিনি জানান, ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন আহত অবস্থায় আবু হানিফকে উদ্ধার করে উখিয়ার কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চিকিৎসকরা তাকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে প্রেরণ করেন। ওখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

গুলিবিদ্ধ শিশু সংকটাপন্ন : হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় রোববার সকালে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে আহত বাংলাদেশি শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক। সে বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন আছে।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন জানান, সেখানে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।

সোমবার দুপুর ২টায় তিনি বলেন, “রবিবার রাতে শিশুটির অপারেশন করা হয়েছে। তবে, তার মাথায় লাগা গুলিটি বের করা যায়নি। এটা এমন এক জায়গায় বিদ্ধ হয়ে আছে সেটা বের করে নিলে রক্তক্ষরণে শিশুটির মৃত্যু হতে পারে।”

হাসপাতালের আইসিইউতে তাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। আশার কথা হচ্ছে, গতকাল থেকে আজ তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

রোববার (১১ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউপির তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় আহত হয় আফনান আরা (১২)। একই ঘটনায় আরও একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

আহত আফনান আরা (১২) তেচ্ছিব্রিজ গ্রামের জসিম উদ্দিনের মেয়ে। প্রথমে গুলিতে আফনান নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেও পরে জানা যায় শিশুটি বেঁচে আছে। গতকাল বিকেলে চমেক হাসপাতালে আনা হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়।

বোমা, গুলি এপারে এসে পড়া, স্থল মাইন বিস্ফোরণে আহত এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যের অনুপ্রবেশে উৎকণ্ঠায় সীমান্তবাসী টেকনাফে মানববন্ধন করেছে।

সোমবার বেলা ১১টার দিকে টেকনাফের হোয়াইক্যং তেচ্ছিব্রিজ হাইওয়ে সড়কে আয়োজিত এই মানববন্ধনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। মানববন্ধন চলাকালে অংশগ্রহণকারীরা মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় নির্বিচার গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা জানান এবং অবিলম্বে হামলা বন্ধের দাবি জানান।

মানববন্ধনে মো. আলম বলেন, একজন নিরীহ শিশু শিক্ষার্থীর ওপর সীমান্তের ওপার থেকে গুলি এসে লাগা চরম মানবতাবিরোধী কাজ। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এমন কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

আরেক বক্তা আলী হোসেন বলেন, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও নারী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, যাতে সীমান্তে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা যায়।

তিনি আরও বলেন, মানববন্ধনে আহত শিক্ষার্থী উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা, তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো নিরীহ মানুষ হামলার শিকার না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়।

উপস্থিত অন্যান্য বক্তারা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত যেন বাংলাদেশে এসে নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটাতে না পারে, সেজন্য আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

ঘটনার বিষয়ে আহত শিক্ষার্থীর পিতা জসিম উদ্দিন বলেন, গত রবিবার আমার মেয়ে খেলতে বের হওয়ার সময় মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ছোড়া গুলি এসে তার মাথায় লাগে। বর্তমানে সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি। তার সুচিকিৎসা এবং সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।

এ ব্যাপারে সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবির সংশ্লিষ্টদের সাথে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে সাড়া না দেওয়ায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।

সীমান্তবাসী বলছেন, দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির আস্তানা ঘীরে দেশটির সেনা বাহিনী বিমান ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা সেনাবাহিনীর পক্ষ হয়ে স্থলভাগে আরাকান আর্মির সাথে লড়াই করছে।

বোমা,গুলি,মাইন,সশস্ত্র গোষ্ঠী,অনুপ্রবেশ,সীমান্ত
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত