ঢাকা শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ভোটাধিকার থাকলেও বাধা অবকাঠামোতে, শঙ্কায় প্রতিবন্ধী ভোটাররা

ভোটাধিকার থাকলেও বাধা অবকাঠামোতে, শঙ্কায় প্রতিবন্ধী ভোটাররা

ভোট প্রদান বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। তবে বাস্তবে সেই অধিকার কি সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত হচ্ছে, এই প্রশ্নই এখন উঠছে রাজবাড়ীতে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ভোটারদের ক্ষেত্রে ভোটাধিকার যেন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজবাড়ী জেলার অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র এখনো প্রতিবন্ধীবান্ধব নয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

শারীরিক প্রতিবন্ধী, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সহায়ক ব্যবস্থা না থাকায় ভোট দিতে এসে চরম ভোগান্তির শঙ্কায় রয়েছেন তারা।

যদিও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এবার প্রতিবন্ধী ভোটাররাও নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবেন এবং তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, রাজবাড়ী জেলার অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ ভবনই বহুতল হওয়ায় ভোটকক্ষ দোতলায় অবস্থিত। ফলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য সেখানে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে নেই প্রবেশযোগ্য র‌্যাম্প, হ্যান্ডরেইল কিংবা লিফটের ব্যবস্থা। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও প্রতিবন্ধী ভোটারদের সহায়তায় অনীহার অভিযোগ রয়েছে। এতে বাধ্য হয়ে পরিবার বা অন্যের সহায়তায় ভোট দিতে হয়, যা গোপন ও স্বাধীনভাবে ভোট প্রদানের অধিকারের পরিপন্থী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শারীরিক প্রতিবন্ধী ভোটার আব্দুল খালেক শেখ বলেন, “আমার বাড়ি থেকে ভোটকেন্দ্র প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। অনেক কষ্ট করে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছালেও ভোট দিতে গেলেই শুরু হয় বিড়ম্বনা। এই পা নিয়ে দোতলায় ওঠা খুবই কষ্টসাধ্য। দায়িত্বে থাকা পুলিশ বা আনসার সদস্যদের কাছে সহযোগিতা চাইলে নানা কথা শুনতে হয়, যা আমাদের ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করে। অথচ আমরা দেশের নাগরিক, আমাদের ভোটেও সরকার নির্ধারিত হয়। দিন দিন ভোট দেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি।”

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, “নির্বাচন এলেই অনেক আশা নিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসি। কিন্তু এখানে এসে দেখি প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য আলাদা বুথ নেই, নিচতলায় ভোটকক্ষ নেই, নেই র‌্যাম্প বা প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক। সহযোগিতা চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকেই খারাপ আচরণ করেন। পরিস্থিতি বদলালেও প্রতিবন্ধীদের ভোটাধিকার নিয়ে বাস্তবতা একই রয়ে গেছে। আমরা সরকারের কাছে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাই।”

রাজবাড়ী জেলা প্রতিবন্ধী সমন্বয় পরিষদের সমন্বয়ক আরিফুল ইসলাম বলেন, “প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গোপনে ও স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। আইনের ১৬ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের কোনো কার্যকর প্রতিফলন ভোটকেন্দ্রগুলোতে দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচন এলেই কেবল আশ্বাস দেওয়া হয়, কার্যকর প্রস্তুতি নেই। ফলে অনেক প্রতিবন্ধী ভোটারের কাছে ভোটাধিকার কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।”

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, “এবার প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তারা যেন সহজেই ভোট দিতে পারেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে সহায়তাও নিশ্চিত করা হবে।”

জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, রাজবাড়ীর দুটি সংসদীয় আসনে প্রায় ১০ হাজার প্রতিবন্ধী ভোটার রয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধি, সচেতনতা এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। তা না হলে গণতন্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় প্রতিবছরই একটি বড় জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়বে।

শঙ্কায় প্রতিবন্ধী ভোটাররা,অবকাঠামো,ভোটাধিকার থাকলেও বাধা
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত