
ঠাকুরগাঁওয়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটকে পুঁজি করে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কালোবাজারি চক্র। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠা এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবার হার্ডলাইনে প্রশাসন।
চোরাকারবারি ও মজুদদারদের হাতেনাতে ধরতে অভিনব পথ বেছে নিয়েছেন সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. খাইরুল ইসলাম। কখনো সাধারণ পথচারী সেজে পায়ে হেঁটে, আবার কখনো সাধারণ মানুষের মতো মোটরসাইকেলে চড়ে ছদ্মবেশে হাট-বাজারে হানা দিচ্ছেন তিনি।
চাহিদার মাত্র এক-চতুর্থাংশ তেল মিলছে জেলায় তেলের বর্তমান চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ লিটার পেট্রোল এবং ৫০ হাজার লিটার অকটেনের চাহিদা থাকলেও মিলছে চাহিদার মাত্র চার ভাগের এক ভাগ। এই হাহাকারের সুযোগে একদল অসাধু ব্যবসায়ী পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে মজুদ করছে এবং খোলাবাজারে তা ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করছে।
উত্তর হরিহরপুর গ্রামের স্কুল শিক্ষক আবুল ফজল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দুই লিটার পেট্রোল যেন এখন সোনার হরিণ। স্কুলে যাওয়ার জন্য দুদিন পাম্পে ঘুরেও তেল পাইনি। হয়রানি যা হল, তাতে সোনার হরিণ কিনতে গেলেও বোধহয় এত কষ্ট হতো না।
মাঠ পর্যায়ে সাঁড়াশি অভিযান গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার বিকেলে ইউএনও খাইরুল ইসলাম ছদ্মবেশে সদর উপজেলার ফারাবাড়ি এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালান। সেখানে খোলাবাজারে চড়া দামে তেল বিক্রির অপরাধে এক বিক্রেতাকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ইউএনও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তেলের সিন্ডিকেট না ভাঙা পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, “কালোবাজারি ও মজুদদারদের দমনে ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় রয়েছে। জনস্বার্থে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
আতঙ্ক ও হামলার ঘটনা এদিকে, জগন্নাথপুর এলাকার হানিফ ফিলিং স্টেশনে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় পাম্প মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাক আলী নিরাপত্তার দাবিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন (এলজিআরডি) মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক অনুষ্ঠানে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সরকার কোনো ধরনের মব বা বিশৃঙ্খলা সহ্য করবে না। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সদর থানার ওসি মো. মনির হোসেন নিশ্চিত করেছেন, হামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সংকটের নেপথ্যে: যুদ্ধ ও নৈতিকতা পাম্প মালিকদের দাবি, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। পার্বতীপুর থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল আসায় চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
তবে সুরমা ফিলিং স্টেশনের মালিক মোস্তাক আলী মনে করেন, সংকটের পেছনে নৈতিকতার অভাবও দায়ী। তিনি বলেন, “অনেকে বারবার ট্যাঙ্ক ভর্তি করে তেল নিয়ে বাইরে জারে ভরছে এবং পরে তা চড়া দামে বিক্রি করছে। মানুষের মধ্যে নৈতিকতা না ফিরলে শুধু প্রশাসনের পক্ষে এটি ঠেকানো কঠিন।”