
চার বছরের শিশু সামিয়া আক্তার। পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা বোঝার আগেই থেমে গেল তার জীবন। মাটির নিচ থেকে মা জাহানারা বেগমের সাথে উদ্ধার হলো ছোট্ট সামিয়ার মরদেহ।
বৃহস্পতিবার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা ও ফরিদপুর সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের কালিতলা যতিনবদ্দি এলাকার একটি পুকুরপাড়ে মাটিচাপা অবস্থায় তাদের মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়।
নিহত জাহানারা বেগমের স্বামীর নাম আমজাদ শেখ। তাদের বাড়ি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের কর্ণসোনা গ্রামে।
জীবিকার তাগিদে স্বামী-স্ত্রী দুজনই ঢাকার একটি ইটভাটায় কাজ করতেন। আমজাদ শ্রমিক হিসেবে এবং জাহানারা রান্নার কাজ করতেন। ছোট্ট সামিয়াও বাবা-মায়ের সঙ্গে ইটভাটাতেই থাকত। প্রায় ২০ দিন আগে তারা গ্রামে ফিরে আসেন। গত ৪ মে পাশের গ্রামে আমজাদের ফুফাতো ভাই আলা খাঁয়ের চল্লিশার অনুষ্ঠানে যান জাহানারা ও সামিয়া। কিন্তু সেদিন রাতের পর আর বাড়ি ফেরেননি তারা। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তাদের সন্ধান পাননি। পরে গোয়ালন্দ থানায় অভিযোগ দিতে গেলে জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে না থাকায় অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়নি বলে দাবি পরিবারের সদস্যদের।
ঘটনার ১০ দিন পর বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেলে ফরিদপুর সদর উপজেলার চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের কালিতলা যতিনবদ্দি এলাকার একটি পুকুরপাড়ে মাটিচাপা অবস্থায় মরদেহের একটি পা টেনে বের করে কুকুর। পরে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ গিয়ে মাটি খুঁড়ে প্রথমে জাহানারা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে। তার বুকের নিচে চাপা অবস্থায় পাওয়া যায় শিশু সামিয়ার মরদেহ। মা মৃত্যুর পরও যেন বুকের নিচে আগলে রেখেছিলেন সন্তানকে। এমন দৃশ্য দেখে ঘটনাস্থলে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পরে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
নিহত জাহানারার স্বামী আমজাদ শেখ অভিযোগ করেন, ইটভাটায় কাজ করার সময় তার স্ত্রী এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এ নিয়ে কয়েকবার বিরোধও হয়েছিল। তার ধারণা, ওই ব্যক্তি এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
আমজাদের চাচাতো ভাই আজাদ শেখ বলেন, “সামিয়াকে আমি প্রায়ই কেক কিনে দিতাম। ওর ছোট্ট মুখটা বারবার চোখে ভাসছে। যারা এই নির্মম ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের বিচার চাই।”
নিহত সামিয়ার দাদি রাজিয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার নাতনিটা কত ছোট ছিল। মা-মেয়েকে যারা এভাবে হত্যা করেছে, তাদের কঠোর শাস্তি চাই।”
গোয়ালন্দ ঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সফিকুল ইসলাম জানান, নিখোঁজের বিষয়ে আমজাদ থানায় এসেছিলেন। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় তাকে পরে আসতে বলা হয়। এ ঘটনায় ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নিষ্পাপ শিশু সামিয়া ও তার মায়ের এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই সঙ্গে দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।