
গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার পতন হলেও এখনো আওয়ামী সিন্ডিকেটের দখলে রয়েছে খোলা বাজারে সরকারের চাল-আটা বিক্রয় কেন্দ্র ওএমএস সেক্টর। নগরীর ৩১ ডিলারের মধ্যে ২০ জনই জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদধারী নেতা-কর্মী ও দোসর। আবার একাধিক নেতার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনদের নামে রয়েছে একাধিক লাইসেন্স।
এভাবে সংখ্যায় বেশি থাকায় আওয়ামীপন্থিদের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে অবৈধ শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
সিন্ডিকেটের প্রভাব বিস্তার করেছে খোদ সরকারি খাদ্য অফিসেও। জনশ্রুতি রয়েছে, কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে অবৈধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত চাল-আটার অর্ধেক অংশ চলে যাচ্ছে কালোবাজারে। ফলে একদিকে যেমন সরকারের এই মহতী উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে স্বল্পমূল্যের খাদ্যপণ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হতদরিদ্র সাধারণ মানুষ।
এদিকে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগে সাংবাদিক নামধারী আওয়ামী লীগ নেতার নিজ নামীয় লাইসেন্সসহ তার নিয়ন্ত্রণাধীন ৫টি লাইসেন্স বাতিলের আদেশ বাস্তবায়ন না হলেও দীর্ঘ ৬ বছর পর একই অভিযোগে পুনরায় তদন্তে নেমেছে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের অফিস সূত্রে জানা যায়, ৫টি ওএমএস লাইসেন্সের মালিকানার অস্তিত্ব না থাকা এবং খাদ্যপণ্য কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগে ২০২০ সালের ৫ মে খুলনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গঠিত ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে মেসার্স সুলতানা এন্টারপ্রাইজ, এসএম এন্টারপ্রাইজ, রুবেল এন্টারপ্রাইজ, নির্মাণ এন্টারপ্রাইজ ও জোহরা এন্টারপ্রাইজ—এই ৫টি ওএমএস ডিলার লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওএমএস ডিলার সাঈয়েদুজ্জামান সম্রাটের বিরুদ্ধে ওএমএস পণ্য বিক্রিতে অনিয়মের প্রেক্ষিতে উল্লেখিত ৫টি লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইউসুব আলী। কমিটির সদস্যরা ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ, দুর্নীতি দমন কমিশন খুলনার উপ-পরিচালক নাজমুল হাসান, খুলনা প্রেস ক্লাব-এর প্রতিনিধি সুনীল দাস এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তানভীর আলম।
তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে বিভাগীয় কমিশনার ও ওএমএস কমিটির সভাপতি মো. মাহাবুবুর রহমান অভিযুক্ত ৫টি লাইসেন্স বাতিল ঘোষণা করে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে অবগত করেন।
তবে ২০২০ সালে অভিযুক্ত ৫টি ওএমএস লাইসেন্স বাতিল করা হলেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় আজও বহাল তবিয়তে ব্যবসা চলছে ওই লাইসেন্স দিয়ে। উচ্চ আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে লাইসেন্সগুলো পুনরায় বহাল করা হয় বলে জানা যায়।
এদিকে পুনরায় অভিযুক্ত ৫টি লাইসেন্সের বিরুদ্ধে আবারও তদন্তে নেমেছে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক। গত ১৮ জুন ২০২৬ জেলার সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক বনী আমিনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ২১ জুন তদন্ত কমিটি অভিযুক্ত ৫ লাইসেন্সধারীকে তদন্ত টিমের মুখোমুখি হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এবারও কি দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা সাঈয়েদুজ্জামান সম্রাট পার পেয়ে যাবেন—এমন প্রশ্ন উঠেছে ভুক্তভোগী মহলে।
সূত্রমতে, সরকার খুলনা মহানগরীর হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে স্বল্পমূল্যে চাল ও আটা বিক্রি করে। ৩০ টাকা কেজি দরে চাল এবং ২৪ টাকা কেজি দরে আটা বিক্রি করা হয়। জনপ্রতি সর্বোচ্চ ৫ কেজি চাল ও ৫ কেজি আটা কেনা যায়। নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে ৩১ জন ডিলারের মাধ্যমে চাল-আটা বিক্রি করা হয়। সরকার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ডিলার নিয়োগ ও মাঠপর্যায়ের বিক্রয় কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করে থাকে।
সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে মোট ডিলার ছিল ৭৩ জন। অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত ৭৩ জন ডিলারের লাইসেন্স বাতিল করে লটারির মাধ্যমে নতুন ডিলার নিয়োগের ঘোষণা দিয়ে পরিপত্র জারি করে। যদিও লটারির মাধ্যমে ১২ জন নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয় এবং আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগকৃত বাকি ১৯ জন উচ্চ আদালতের আদেশে তাদের লাইসেন্স কার্যক্রম বহাল রাখে। এই ১৯ জন ডিলারের প্রত্যেকেই আওয়ামী লীগের দলীয় পদধারী।
খুলনার ওএমএস সেক্টর বর্তমানে এই ১৯ জনের সিন্ডিকেট বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। এদের অধিকাংশ নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজের নামসহ পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে একাধিক লাইসেন্স পরিচালনা করছে। যদিও এটি নিয়মবহির্ভূত, তবুও খাদ্য দপ্তরের কতিপয় অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশে এ ধরনের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চলেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই সিন্ডিকেটের প্রধান খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক সাঈয়েদুজ্জামান মোল্লা সম্রাট। তার নিজ নামীয় প্রতিষ্ঠান মেসার্স সুলতানা এন্টারপ্রাইজ। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আরও ৫টি লাইসেন্স।
এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক সাঈয়েদুজ্জামান সম্রাট দলীয় পদ স্বীকার করে বলেন, “আমার নামে একাধিক লাইসেন্স থাকার সুযোগ নেই।” তিনি দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক বনী আমিন বলেন, “অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। এখন কিছু বলা যাবে না।”